নৃত্য ও সংগীত : বিদ্যালয়ে প্রথম কয়েক বৎসরে নৃত্য অভ্যাস করার জন্য কিছু সময় নির্দিষ্ট করিয়া রাখিতে হইবে। নৃত্য শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সৌষ্ঠব বৃদ্ধি করে, তাহাদিগকে প্রচুর আনন্দ তো দেয়ই, তাহা ছাড়া সুরুচিবোধ জাগ্রত করে। নৃত্যের প্রথম পাঠ শিক্ষা করা হইলে শিশুদিগকে সমবেত নৃত্য শিখাইতে হইবে। এই ধরনের সহযোগিতামূলক আনন্দদায়ক কাজ শিশুরা ভালোবাসে। সংগীত সম্বন্ধে ঠিক এইরূপ ব্যবস্থা করা চলে, তবে নৃত্যের কিছু পরে ইহা আরম্ভ করিতে হইবে, কারণ নৃত্যে যেমন দেহের আন্দোলনজনিত আনন্দ আছে সংগীতে তেমন সুযোগ নাই। তাহা ছাড়া সংগীত নৃত্যের অপেক্ষা কঠিনও। সকলে না হইলেও অনেক শিশুই গান গাহিতে আনন্দ পাইবে এবং শিশুর ছড়া শেখার পর ভালো গান গাহিতে শিখিবে। প্রথমেই শিশুদের রুচি বিকৃত করিয়া পরে সংশোধনের কোনো লাভ নাই। ইহার ফলে তাহাদিগকে হঁচড়ে-পাকা করা হয় মাত্র। বয়স্ক ব্যক্তিদের ন্যায় সকল শিশুর গান গাহিবার সমান যোগ্যতা থাকে না। কাজেই কঠিন সুরের গানগুলি শিখিবার জন্য কতক ছেলেমেয়েকে বাছাই করিয়া লইতে হইবে। এইরূপ বালক-বালিকার পক্ষেও গান স্বেচ্ছাধীন বিষয় রাখিতে হইবে। গান গাহিতে পারে বলিয়াই তাহাদের উপর জোর করিয়া ইহা চাপাইবার প্রয়োজন নাই।
সাহিত্য শিক্ষার ব্যাপারে সহজেই ভুল হইতে পারে। কি শিশু, কি বৃদ্ধ কাহারও পক্ষেই সাহিত্য সম্বন্ধে কেবল কতকগুলি বিষয়, যেমন কবিদের সময়কাল, তাহাদের রচনাবলির নাম বা এই ধরনের বিষয় জানিয়া কোনো লাভ নাই। এইরূপ নোটবুকে টুকিয়া রাখার যোগ্য যে জ্ঞান তাহা শুধু পল্লবগ্রহিতারই পরিচায়ক; ইহার প্রকৃত মূল্য কিছু নাই। সৎ সাহিত্য যদি পাঠকের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করিতে পারে তবেই ইহার পাঠে সার্থকতা। সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের প্রভাব পাঠকের কেবল রচনাশৈলির [Style] উপর নয়, চিন্তার প্রকৃতির উপরও পড়া চাই। কয়েক শতাব্দী আগে বাইবেল ইংরাজ শিশুদের উপর এইরূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। ইংরাজি গদ্যরচনায় ইহার সুফল দেখা গিয়াছে কিন্তু আধুনিককালের খুব কম বালক-বালিকারই বাইবেলের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় আছে। আমার মনে হয় মুখস্থ না করিলে সাহিত্য হইতে সম্পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। স্মৃতিশক্তি বেশি করার উপায়স্বরূপ পূর্বে মুখস্থ করানোর রীতি ছিল কিন্তু মনোবিজ্ঞানীগণ প্রমাণ করিয়াছেন যে, ইহা এক রকম নিষ্ফল। আধুনিক শিক্ষাবিদগণ ইহাকে শিক্ষাক্ষেত্রে খুব কম স্থান দিতেছেন কিন্তু আমার মনে হয় ইহাতে ভুল করা হইতেছে। মুখস্থ করার ফলে যে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তাহা নয়, কথায় এবং লেখার সুন্দর ভাষা প্রয়োগ করার সে সুফল পাওয়া যায় তাহার জন্য মুখস্থ করা দরকার। কষ্ট করিয়া ভাষার মাধুর্য অর্জন করিতে হইবে না; চিন্তার স্বতঃস্ফূর্ত বাহন হিসাবে যদি সাবলীল ভাষা স্বাভাবিকভাবে আসে তবেই ইহার সার্থকতা প্রমাণিত হইবে। বর্তমান সমাজে প্রাচীন যুগের তুলনায় সৌন্দর্য ও রুচিবোধের আবেগ কমিয়া গিয়াছে। সৎ সাহিত্যের সঙ্গে ভালরকম পরিচয়ের ফলেই চিন্তার পরিচ্ছন্নতা ও ভাষার সৌষ্ঠব আয়ত্ত করা সম্ভবপর। এইজন্যই মুখস্থ করা আমার কাছে এত প্রয়োজনীয় মনে হয়।
কিন্তু এইজন্য কতকগুলি বাঁধাধরা গদ্য ও পদ্যের অংশ মুখস্থ করাইলে তাহা শিশুদের নিকট বিরক্তিকর ও অকৃত্রিম বলিয়া মনে হয়; কাজেই ইহাতে সুফল পাওয়া যায় না। অভিনয় করানোর সুযোগে মুখস্থ করাইলে বরং উপকার হয়, কেননা অভিনয় করিতে শিশুরা খুবই ভালবাসে। তিন বৎসর বয়স হইতেই শিশুরা ইহাতে আনন্দ পায়। নিজেরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া এইরূপ করে, ইহার জন্য যখন নানারূপ সাজসজ্জা করা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য আয়োজন হয় তখন তাহাদের উল্লাস ধরে না। বাল্যকালে জুলিয়াস সিজার নাটক অভিনয় করিতে ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াসের মধ্যে বিষাদের দৃশ্য অভিনয়ে আমি কিরূপ তীব্র আনন্দ অনুভব করিয়াছিলাম তাহা আমার স্পষ্ট মনে আছে।
যে সকল শিশু অভিনয়ে অংশগ্রহণ করে তাহারা যে কেবল নিজেদের অংশই মুখস্থ করে তাহা নহে, অপর অংশগুলিরও প্রায় সবটাই মুখস্থ করিয়া ফেলে। নাটকটি বহুদিন তাহাদের চিন্তায় স্পষ্ট হইয়া থাকে এবং আনন্দ দান করে। ভালো সাহিত্যের উদ্দেশ্যই হইল আনন্দদান করা; শিশুরা যদি সাহিত্য হইতে আনন্দ আহরণ করিতে না পারে তবে ইহা হইতে কোনো উপকারও পাইবে না। এই কারণের জন্য আমি বাল্যকালে কেবল অভিনয়োপযোগী অংশগুলি মুখস্থ করানোর পক্ষপাতী। ইহা ছাড়া শিশুরা ইচ্ছামতো স্কুলের লাইব্রেরি হইতে সুলিখিত গল্পের বই লইয়া পড়িতে পাইবে।
আজকাল অনেক লেখক শিশুদের জন্য বাজে এবং তরল ভাবোদ্দীপক বই লেখেন; ইহাতে শিশুদের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। এইগুলি শিশুদের ছেলেমিকে বাড়াইয়া তুলিয়া তাহাদিগকে অপমান করে। ইহার বিপরীত অবস্থা লক্ষ করুন রবিনসন ক্রুসো পুস্তকে। শিশুদের জন্য লিখিত হইলেও তাহাতে কোথাও ছেলেমি বা ন্যাকামির স্থান নাই। কি শিশুর সঙ্গে আচরণে কি অন্যত্র তার ভাবপ্রবণতার আকর্ষণ কখনই বেশি নয়। কোনো শিশুই ছেলেমির প্রতি আকৃষ্ট হয় না, সে চায় যতশীঘ্র সম্ভব বয়স্ক ব্যক্তির মতো আচরণ অভ্যাস করিতে। কাজেই শিশুদের জন্য বই লিখিতে তাহাদের ছেলেমি অবলম্বন করিয়া কাহিনী গড়িয়া তোলার কোনো আবশ্যকতা নাই। শিশুদের জন্য রচিত আধুনিক বইতে এইরূপ কৃত্রিম ন্যাকামি বড়ই বিরক্তিকর। শিশুরা ইহা পড়িয়া আনন্দ পায় না, তাহাদের মানসিক বৃদ্ধির পক্ষে অনুকূল স্বাভাবিক ভাবাবেশও ইহা দ্বারা ব্যাহত হয়। শিশুদের মন বিকাশোনুখ এবং সম্প্রসারণের জন্য অধীর। শিশুরা চিরকাল শিশু হইয়া থাকিতে চায় না, তাহারা চায় শক্তিমান কর্মক্ষম বয়স্ক ব্যক্তিতে পরিণত হইতে। গল্পের বইতেও তাহারা এই বিকাশের পরিচয় দেখিতে পাইলে আনন্দিত হয়; কাজেই বইতে ইহার বিপরীত অবস্থা দেখিলে শিশুর ছেলেমিতে তাহাদের মন সায় দেয় না। এইজন্যই যে সব ভালো বই বয়স্কদের জন্য লিখিত অথচ তাহাদের পক্ষেও উপযোগী সেইগুলিই শিশুদের জন্য শ্রেষ্ঠ। ইংরাজি সাহিত্যে ইহার ব্যতিক্রম কয়েকখানি মাত্র বই আছে; যেমন লিয়ার [Lear] ও লুই ক্যারোল কর্তৃক [Lawis Carol] শিশুদের জন্য লিখিত বই; এগুলি পড়িয়া বয়স্ক ব্যক্তিরাও প্রচুর আনন্দ পায়।
