বয়স্ক ব্যক্তিদের পক্ষে কি জানা উচিত তাহা বিবেচনা করিলে বোঝা যায় এমন কতক বিষয় আছে যাহা প্রত্যেকের জানা প্রয়োজন এবং কতক অল্পসংখ্যক লোকের ভালো করিয়া শেখা দরকার, সকলের জানা না থাকিলেও চলে। কতক লোককে ভালো করিয়া চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা করিতে হইবে কিন্তু বেশিরভাগ লোকের পক্ষেই শারীরবিদ্যা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মোটামুটি বিষয় ও নিয়মগুলি জানা থাকিলেই যথেষ্ট। কতককে উচ্চ গণিত শিক্ষা করিতে হইবে কিন্তু যাহাদের নিকট ইহা মোটেই প্রীতিপদ নয় তাহারা গণিতের সাধারণ মৌলিক বিষয় জানিলেই চলে। কতককে ট্ৰমবোন (জয়ঢাকের মতো বাদ্যযন্ত্র) বাজানো শিখিতে হইবে কিন্তু সকল ছাত্রেরই ইহা অভ্যাস করিবার আবশ্যকতা নাই। চৌদ্দ বৎসর বয়সের পূর্বে প্রধানত এমন জিনিসই শিক্ষা দেওয়া উচিত যাহা সকলেরই শিক্ষা করা প্রয়োজন। অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্রের কথা বাদ দিলে, কোনো বিষয়ে বিশেষ শিক্ষা সাধারণত পরবর্তীকালে দিতে হইবে। তবে এই সময়েই অর্থাৎ চৌদ্দ বৎসরের পূর্বেই বালক বা বালিকার কোন বিষয় শিক্ষার দিকে বেশি প্রবণতা আছে তাহা লক্ষ্য করিতে হইবে যাহাতে পরবর্তীকালে তাহার বিকাশ সাধন সম্ভবপর হয়। এইজন্য প্রথম অবস্থায় প্রত্যেকের পক্ষেই শিক্ষণীয় বিষয়গুলি সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা উচিত, কোনো বিষয় কাহারও ভালো লাগিলে পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার স্তরে তাহার জের টানিবার প্রয়োজন নাই।
প্রত্যেক বয়স্ক ব্যক্তির কে কোন বিষয় শিক্ষা করা উচিত তাহা নির্ধারিত হইলে প্রথমে ঠিক করিতে হইবে কোনটি আগে এবং কোনটি তাহার পর শিখাইতে হইবে। এইস্থানে নীতি হইবে, সহজটি আগে শিখাইতে হইবে এবং কঠিন বিষয়গুলি পরে ক্রমে ক্রমে আসিবে। ছাত্রদের বিদ্যালয় জীবনের প্রথমদিকে এই নীতিই শিক্ষাক্ষেত্রে অবলম্বিত হয়।
আমি ধরিয়া লইব যে, শিশুর পাঁচ বৎসর বয়স হইতে হইতেই সে পড়িতে এবং লিখিতে শিখিয়াছে। মন্তেসরি স্কুল কিংবা ইহার অপেক্ষা অন্য উন্নত ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠিত হইলে তথায় শিশুর এই প্রাথমিক শিক্ষার গোড়াপত্তন হইবে। মন্তেসরি স্কুলে বিভিন্ন খেলনা লইয়া নাড়াচাড়া করিতে করিতে শিশুর নানা জিনিসের আকৃতি, আয়তন, পরিমাণ, ওজন প্রভৃতি সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা জন্মে। অঙ্কন, সংগীত ও নৃত্যশিক্ষারও সূত্রপাত হয়। অপর শিশুর মধ্যে থাকিয়াও শিক্ষামূলক কোনো বিষয় মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাসও এই সময় গঠিত হয়। অবশ্য পাঁচ বৎসর বয়সে শিশুর এই গুণগুলি পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হইবে না; পরে আরও কিছুদিন তাহাকে এই সকল বিষয়ে শিক্ষা লাভ করিতে হইবে। আমার মনে হয় শিশুকে সাত বৎসর বয়সের পূর্বে কোনোরূপ গুরুতর মানসিক পরিশ্রমের কাজে নিযুক্ত করা উচিত নহে। তবে বিশেষ দক্ষতা প্রয়োগ করিলে শিশুর অসুবিধাগুলি অনেক পরিমাণে লাঘব করা যায়। ছেলেবেলায় গণিত একটি ভয়ের বিষয়; মনে পড়ে গুণনের নামতা মনে রাখিতে না পারিয়া বাল্যকালে আমি বহুদিন কাদিয়াছি। গুণনের ছক ধীরে ধীরে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় শিশুকে আয়ত্ত না করাইলে ইহা দুরূহ রহস্য বলিয়া বোধ হয় এবং তাহার মনে গভীর নৈরাশ্যের সৃষ্টি করে। কিন্তু মন্তেসরি স্কুলে যেমন সরঞ্জামের সাহায্যে ক্রমে ক্রমে এবং যত্নের সঙ্গে ইহা শিক্ষা দেওয়া হয় তাহাতে এইরূপ ভীতি বা নৈরাশ্যের কোনো কারণ ঘটে না। তবে অঙ্ক কষা ভালো করিয়া শিখিতে হইলে শিশুকে নিয়ম মুখস্থ করার অপ্রীতিকর ও নীরস কাজটি করিতেই হইবে। শৈশবের শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম যখন শিশুদের নিকট আনন্দদায়ক করার চেষ্টা হয় তখন এই বিষয়টি সেখানে স্থান দিলে কিছুটা বিসদৃশ হয় বটে কিন্তু প্রয়োজনের খাতিরেই ইহা করিতে হয়। ইহা ছাড়া গণিত শিশুর মনকে স্বাভাবিকভাবেই যথার্থতার জন্য প্রস্তুত করে; কোনো অঙ্কের উত্তর শুধু ঠিক কিংবা ভুল হইতে পারে; ইহা বলা চলে না যে, উত্তরটি খুব আনন্দদায়ক কিংবা ভাবপূর্ণ হইয়াছে। গণিতের ব্যবহারিক উপযোগিতা তো আছেই, তাহা ছাড়া যথার্থতা শিক্ষার সহায়ক বলিয়া বাল্যশিক্ষায় ইহার গুরুত্ব অনেকখানি। প্রথম হইতেই অঙ্ক যাহাতে শিশুর কাছে ভীতিজনক বলিয়া মনে হইতে না পারে সেইজন্য কঠিনতা অনুসারে ইহার ক্রম নির্ধারণ করিয়া ধীরে ধীরে সহজ হইতে কঠিনের দিকে আগাইয়া যাইতে হয়; একসঙ্গে খুব বেশি সময় শিশুকে এ বিষয়ে নিয়োজিত রাখা উচিত নহে।
আমাদের বাল্যকালে ভূগোল ও ইতিহাস পড়ানো হইত সর্বাপেক্ষা খারাপ। ভূগোলের প্রতি আমার বিশেষ ভীতি ছিল; ইতিহাসের প্রতি আমার গভীর অনুরাগ ছিল বলিয়া ইহার পাঠ কোনো রকম সহ্য করিয়াছি। এই দুটি বিষয়ই শিশুদের নিকট আনন্দদায়ক করা যায়। আমার পুত্রটি এখনও ভূগোলের পাঠ গ্রহণ করে নাই, তবু সে তাহার পরিচারিকার অপেক্ষা ভূগোলের বিবরণ বেশি জানে। অন্যান্য বালকের মতোই তাহার যে রেলগাড়ি ও স্টিমারের প্রতি আকর্ষণ আছে তাহারই ভিতর দিয়া সে জ্ঞান অর্জন করিয়াছে। তাহার কল্পনার জাহাজ কোন পথে চলিবে সে তাহা জানিতে চায় এবং আমি যখন চীনদেশে যাওয়ার পথের বর্ণনা দিই তখন সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাহা শোনে। তখন সে যদি দেখিতে চায় তবে আমি তাহাকে পথে বিভিন্ন দেশের ছবি দেখাই। সময় সময় সে বড় ভূচিত্রাবলিখানা টানিয়া লইয়া তাহাতে দেশ ভ্রমণের পথ দেখিতে চায়। আমরা প্রতি বৎসর দুইবার করিয়া লন্ডন যাই। লন্ডন ও কর্নওয়ালের মধ্যে ট্রেনে ভ্রমণে খোকা যারপর নাই আনন্দিত হয় এবং যেখানে যেখানে ট্রেন থামে অথবা যেখানে গাড়ি জুড়িয়া দেওয়া হয় সেই সব স্থানের নাম তাহার মুখস্থ। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু তাহাকে মুগ্ধ করে কিন্তু সে ভাবিয়া পায় না পূর্ব মেরু ও পশ্চিম মেরু নাই কেন! কোন দিকে ফ্রান্স ও স্পেন দেশ এবং কোন্ দিকে আমেরিকা তাহা সে জানে; ওই সব দেশে কি কি দেখিতে পাওয়া যায় তাহাও মোটামুটিভাবে অনেক কিছু জানে। এইসব বিষয় তাহাকে শিক্ষা দিবার জন্য শিখানো হয় নাই, কৌতূহলের বসে প্রশ্ন করিয়া করিয়া সে এইসব শিখিয়াছে। ভ্রমণের সঙ্গে সংযুক্ত হইলে ভূগোল শেখার আগ্রহ প্রায় সকল শিশুরই হয়। শিশুকে ভূগোল শিখানোর উপায় স্বরূপ ছবি এবং ভ্রমণকারীদের গল্প বলা চলে কিন্তু প্রধান উপায় হইল বিভিন্ন দেশে ভ্রমণকারী কি। দেখিতে পায় তাহা চলচ্চিত্রে ছাত্রদিগকে দেখানো। এমনই কতকগুলি ভৌগোলিক বিষয়ের জ্ঞান কাজে লাগিতে পারে কিন্তু ইহার বুদ্ধিমূলক কোনো মূল্য নাই। কিন্তু ছবির সাহায্যে ইহা যখন শিশুর মনে স্পষ্ট ও জীবন্ত হইয়া উঠে তখন ইহা শিশুকে কল্পনার খোরাক জোগায়। পৃথিবীতে যে গরম দেশ ও শীতল দেশ আছে, শ্বেতকায় লোকের ন্যায় কৃষ্ণকায় লোক, পীত লোক, বাদামি বর্ণের লোক এবং লোহিত বর্ণের লোকও যে আছে শিশুর পক্ষে তাহা জানা ভালো। ইহা জানা থাকায় পরিচিত ভৌগোলিক পরিবেশ শিশুর মন ও কল্পনার উপর চাপিয়া বসিয়া তাহার মনের সতেজটা নষ্ট করিয়া ফেলিতে পারে না এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য দেশ সে সত্য সত্যই আছে–এই বোধ জন্মাইতে সাহায্য করে। নতুবা দেশভ্রমণ ব্যতীত অন্যান্য দেশের অস্তিত্ব সম্বন্ধে স্পষ্ট বিশ্বাস বা অনুভূতি লাভ করা বড় কঠিন। এই সব কারণে অতি অল্প বয়সেই শিশুদিগকে আমি ভূগোল শিখাইবার পক্ষপাতী; তাহারা ইহাতে আনন্দবোধ না করিলে আমি বিস্মিত হইব। কিছুদিন পরে আমি শিশুদিগকে ছবিযুক্ত বই, মানচিত্র দিব এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সম্বন্ধে মোটামুটি বিবরণ জানাইব। এই প্রসঙ্গে আমি তাহাদিগকে বিভিন্ন দেশের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ছোট ছোট প্রবন্ধ রচনা করিতে বলিব।
