ইহা সম্ভব হইলে সুবিধার অন্ত নাই। শিক্ষক তখন ছাত্রের শত্রু নন। তিনি তাহার বন্ধু। শিক্ষক তাহার সহযোগিতা করেন বলিয়া সে দ্রুত শিখিতে থাকে; সে পরিশ্রান্ত হয় কম, কারণ অনিচ্ছুক মনকে জোর করিয়া কোনো অপ্রীতিকর কাজে আটকাইয়া রাখার কোনো প্রশ্ন এখানে নাই। ছাত্র স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া কাজ করার আনন্দ বোধ করে, শিক্ষকের পক্ষ হইতে তাহাকে শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য করার প্রয়োজন হয় না। অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে যদি ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় তবে সেইরূপ ছাত্রদিগকে পৃথক করিয়া তাহাদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করিতে হয়। তবে আমার মনে হয়, শিশুর বুদ্ধি অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষাপ্রণালী অনুসরণ করিলে এরূপ ছাত্রের সংখ্যা খুবই কম হইবে।
শিক্ষায় বিশেষ নিপুণতা অর্জন করিতে হইলে শিক্ষার সকল স্তরই আনন্দদায়ক করা সম্ভব হয় না। কোনো বিষয় ভালো করিয়া শিখিতে গেলে ইহার কতক অংশ নীরস মনে হইবেই। কিন্তু আমার মনে হয়, এইরূপ নীরস অংশও আয়ত্ত করার প্রয়োজনীয়তা বুঝাইয়া দিলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশে বালক-বালিকা আগ্রহের সঙ্গেই ইহাতে ব্রতী হইবে। নির্দিষ্ট কাজের উৎকর্ষ ও অপকর্ষ দেখিয়া কাজের প্রশংসা করিয়া বা তাহার দোষ দেখাইয়া দিয়া ছাত্রকে উৎসাহিত করিতে হইবে। এই নীরস অংশের গুরুত্ব শিক্ষক ছাত্রের নিকট সুস্পষ্টরূপে বুঝাইয়া দিবেন। এই প্রণালী ব্যর্থ হইলে ছাত্রকে কমবুদ্ধিসম্পন্ন বলিয়া বুঝিতে হইবে। তখন তাহাকে অন্যান্য সাধারণ ছাত্রের শ্রেণি হইতে পৃথক করিয়া পৃথকভাবে শিক্ষাদানের বন্দোবস্ত করিতে হইবে কিন্তু লক্ষ্য রাখিতে হইবে এ ব্যবস্থাকে সে যেন শাস্তি বলিয়া গ্রহণ না করে।
শিশুর চারি বৎসর বয়সের পর পিতা বা মাতার পক্ষে তাহার শিক্ষার ভার নিজ হাতে রাখা উচিত নহে (অবশ্য খুব কর্মক্ষেত্রে ইহার ব্যতিক্রম সমর্থন করা চলে!) শিক্ষাদানের কৌশল বিশেষ শিক্ষাসাপেক্ষ কিন্তু বেশিরভাগ পিতামাতাই শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া বা কৌশল সম্বন্ধে কিছু শিখিবার সুযোগ পান না। শিশুর বয়স যত কম থাকে, তাকে শিখাইবার কৌশলও তত বেশি দরকার। ইহা ছাড়া শিশু সর্বদা পিতামাতার সঙ্গ লাভ করে; কাজেই তাহাদের আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে তাহার মনে কতকগুলি ধারণা স্পষ্ট হইয়া থাকে। কিন্তু মামুলি শিক্ষার কাজ আরম্ভ হইলে শিক্ষার প্রতি সে যেইরূপ আচরণ করিত পিতামাতার প্রতি সেইরূপ করে না। অধিকন্তু পিতা হয়তো নিজের সন্তানের পাঠোন্নতির জন্য অতিরিক্ত আগ্রহশীল হন। শিশু বুদ্ধির পরিচয় দিলে তাঁহার আনন্দের অবধি থাকে না। আবার বোকামির পরিচয় দিলে ক্রোধে কাণ্ডজ্ঞানহীন হইয়া পড়েন। চিকিৎসক যে কারণে নিজের পরিবারের লোকজনের চিকিৎসা করেন না, পিতামাতার পক্ষেও নিজ সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ না করার অনুরূপ যুক্তি আছে। কিন্তু আমি এ-কথা বলি না যে, তাঁহাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে যাহা সম্ভব সন্তানকে সেইরূপ শিক্ষাও দেওয়া উচিত নয়; আমার বক্তব্য এই যে, অন্যের ছেলেমেয়ের পক্ষে ভালো শিক্ষক হইলেও পিতামাতা সাধারণত নিজেদের সন্তানের বিদ্যালয়ের পাঠ শিখানোর পক্ষে সর্বোত্তম নন।
শিক্ষার প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত সমগ্র শিক্ষাকাল ব্যাপিয়া ছাত্রের মনে এই ধারণা জাগাইয়া রাখিতে হইবে যে, সে যেন বুদ্ধিমূলক রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রবৃত্ত হইয়াছে। ইহার উদ্দেশ্য, জানিবার ভিতর দিয়া অজানাকে জয় করা। এই বিশ্বজগতে বহু জটিল বিষয় আছে, যেইগুলি একনিষ্ঠ চেষ্টার দ্বারা বুঝিতে পারা যায়; জটিল এবং কঠিন বিষয় বুঝিতে পারায় মানসিক উল্লাস আছে। প্রত্যেক যোগ্য শিক্ষক ছাত্রকে ইহা উপলব্ধি করাইতে পারেন। মন্তেসরি বিদ্যালয়ের শিশুরা যখন প্রথম দেখে যে, তাহারা লিখিতে শিখিয়াছে তখন তাহাদের যে কিরূপ বিপুল উল্লাস হয় তাহা শ্রীমতী মন্তেসরি বর্ণনা করিয়াছেন : আমি যখন প্রথম মাধ্যাকর্ষণ সংক্রান্ত নিউটন-লিখিত কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র [Keplers Second Law] পাঠ করি তখন আনন্দে আত্মহারা হইয়াছিলাম। এইরূপ বিশুদ্ধ এবং প্রয়োজনীয় আনন্দ খুব কমই আছে। নিজের চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত উদ্যম ছাত্রকে নূতন আবিষ্কারের আনন্দ দান করে এবং এইভাবেই তাহার বুদ্ধিগত রোমাঞ্চকর অভিযান সার্থক এবং জয়যুক্ত হয়। সেখানে সব কিছুই কেবল ক্লাসে শিখানো হয়, ছাত্রকে স্বচেষ্টায় কোনো বিষয় অধিগত করিতে উৎসাহিত করা হয় না; সেইখানে এই মানসিক আনন্দ বোধের সুযোগও কম। যে স্থানেই সুযোগ পাওয়া যায় তথায়ই ছাত্রকে এই বুদ্ধি অভিযানে উৎসাহিত করুন; ইহাতে সে নিষ্ক্রিয় না থাকিয়া সক্রিয় হইয়া উঠিবে। ইহাই শিক্ষাকে শিশুর কাছে কষ্টদায়ক না করিয়া আনন্দময় করিবার অন্যতম উপায়।
চৌদ্দ বৎসরের পূর্বে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম : কি শিক্ষা দেওয়া হইবে? এবং কেমন করিয়া শিক্ষা দেওয়া হইবে? এই প্রশ্ন দুইটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও যোগসূত্র বিদ্যমান রহিয়াছে, কারণ শিক্ষার জন্য উন্নত ধরনের প্রণালী অবলম্বন করিলে বেশি শিক্ষা করা সহজসাধ্য। শিক্ষণীয় বিষয় যদি ছাত্রের নিকট নীরস মনে না হয় এবং সে যদি স্বেচ্ছায় শিক্ষার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে তবে বেশি পরিমাণ শিখানো সম্ভবপর হয়। শিক্ষার প্রণালী সম্বন্ধে পূর্বে মোটামুটি বলা হইয়াছে, পরবর্তী অধ্যায়ে আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হইবে। এখন ধরিয়া লওয়া হইতেছে যে, উন্নত শিক্ষাপ্রণালী অবলম্বন করা। হইয়াছে। কি শিক্ষা দেওয়া উচিত তাহাই এই অধ্যায়ে আলোচিত হইতেছে।
