শিশু মনোবিজ্ঞানের আধুনিক লেখকগণ সকলেই এই কথাটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন যে, খাওয়া বা ঘুমানোর জন্য শিশুকে পীড়াপীড়ি করা অনুচিত; শিশু স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইহা করিবে; এইজন্য তোষামোদ বা জোর করার কোনো প্রয়োজন নাই। আমার নিজের অভিজ্ঞতা এই অভিমতের সত্যতা প্রমাণ করিয়াছে। প্রথমে আমরা শিশু-শিক্ষার এই নূতন প্রণালী জানিতাম না বলিয়া প্রাচীন পন্থা অনুসরণ করিয়াছিলাম। এই প্রণালী সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়াছিল কিন্তু নূতন প্রণালীতে আশানুরূপ সাফল্য লাভ করি। কেহ যেন ইহা মনে না করেন যে, আধুনিক শিক্ষাপ্রণালী প্রয়োগ করিতে গিয়া আধুনিক পিতামাতা সন্তানের খাওয়া বা ঘুমানোর জন্য কিছুই করেন না; পক্ষান্তরে শিশু সদভ্যাস গঠনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হইয়া থাকে। নিয়মিত খাবার সময় আসে, শিশু ভোজন করুক বা না করুক খেলাধুলা বাদ দিয়া তখন তাহাকে অন্যের সঙ্গে একত্রে বসিতেই হইবে। নিয়মিত সময়ে তাহাকে ঘুমাইতে যাইতে হইবে। বিছানার মধ্যে সে কোনো খেলনা প্রাণী আদর করিবার জন্য কাছে রাখিতে পারে কিন্তু এমন কৈানো খেলনা রাখা চলিবে না যাহা টিপিলে শব্দ করে, স্প্রিং কষিয়া দিলে যাহা ছুটাছুটি করে কিংবা অন্য কোনো প্রকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে। শিশুকে বরং বলা যায়–পোষা প্রাণীটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তাকে ঘুম পাড়াও। তারপর তাহাকে একা থাকিতে দিন, শীঘ্রই সে ঘুমাইয়া পড়িবে। কিন্তু শিশুকে কখনোই বুঝিতে দিবেন না যে, তাহার খাওয়া বা ঘুমানোর জন্য আপনি উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িয়াছেন; ইহা বুঝিতে পারিলে সে মনে করিবে আপনি তাহার নিকট একটু অনুগ্রহ চাহিতেছেন; নিজের শক্তি সম্বন্ধে সে সচেতন হইয়া উঠিবে এবং ক্রমেই বেশি বেশি আদর-আপ্যায়ন বা শাস্তি দাবি করিতে থাকিবে। সে যেন বুঝিতে পারে যে আপনাকে খুশি করিবার জন্য নয়, তাহার নিজের তাগিদেই খাওয়া এবং ঘুমানো প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞানের এই নীতি শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা চলে। আপনি যদি শিশুকে জোর করিয়া শিখাইতে চান, সে মনে করিবে আপনাকে খুশি করিবার জন্য সে কিছু অপ্রীতিকর কাজ করিতে বাধ্য হইতেছে। এই মনোভাবের ফলে তাহার মনে একপ্রকার প্রতিরোধ দানা বাঁধিয়া উঠে। অন্যের তাগিদে কোনো কাজ করিতে গেলে তাহাতে তাহার স্বাভাবিক প্রাণের আবেগ থাকে না, মনের ভিতর বরং একটি বিরুদ্ধ ভাব জমিতে থাকে। শিশুর প্রথম জীবনে এইরূপ ভাব সঞ্চারিত হইলে, তাহা বরাবর থাকিবে; পরবর্তীকালে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বাসনায় সে পড়াশুনায় মন দিবে বটে কিন্তু জ্ঞানলাভের বাসনায় নহে। পক্ষান্তরে আপনি যদি প্রথমে শিশুর জ্ঞানলাভের স্পৃহা জাগ্রত করিতে পারেন এবং তাহার প্রতি অনুগ্রহ হিসাবে যে-শিক্ষা লাভ করিতে সে উন্মুখ তাহা দান করেন, তবে অবস্থা ভিন্নরূপ ধারণ করিবে। বাহিরে শাসনের বিশেষ প্রয়োজন হইবে না এবং শিশুর মনোযোগ আকর্ষণ করা সহজ হইবে। এই বিষয়ে কৃতকার্য হইতে হইলে কতকগুলি শর্ত আবশ্যক। শ্রীমতী মন্তেসরি ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই অবস্থা সাফল্যের সঙ্গে সৃষ্টি করিয়াছেন। শিশুর জন্য নির্দিষ্ট কাজগুলি সহজ এবং চিত্তাকর্ষক করিতে হইবে। প্রথম অবস্থায় অন্য শিশুদিগকে কাজ করিতে দেখিয়া সে উৎসাহিত হইবে। সে সময় যেন অন্যত্র শিশুর পক্ষে অধিকতর আকর্ষণের কোনো বস্তু না থাকে। শিশু কাজে লাগাইতে পারে এমন অনেকগুলি জিনিস থাকিবে; যেটি ইচ্ছা সেটি লইয়া সে কাজ করিতে পারিবে। এইরূপ অবস্থায় প্রায় সকল শিশুই আনন্দে থাকে এবং বাহিরের কোনো প্রকার চাপ না থাকাতেও পাঁচ বৎসর বয়সের পূর্বেই পড়িতে ও লিখিতে শেখে।
এই প্রণালী বয়স্ক শিশুদের উপর কতদূর প্রয়োগযোগ্য তাহা তর্কের বিষয়। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মনও অন্যান্য বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়; তখন শিক্ষার প্রত্যেকটি খুঁটিনাটি বিষযই যে আনন্দপ্রদ করিতে হইবে এমন কোনো আবশ্যকতা নাই। কিন্তু শিক্ষালাভের জন্য শিশুরাই আগ্রহান্বিত হইবে এই মূলনীতি শিশুর যে-কোনো বয়স পর্যন্ত চালু রাখা যায়। এমন পারিপার্শ্বিক অবস্থা সৃষ্টি করিতে হইবে যাহাতে শিশু নিজেই যেন শিক্ষার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ প্রকাশ করে। শিক্ষাগ্রহণ কাজে ব্যাপৃত না থাকিলে তাহাকে যেন নিঃসঙ্গ অবস্থায় অবসাদের মধ্যে সময় কাটাইতে হয়। শিক্ষা লাভ করিতে আনন্দ আছে, পরিশ্রমও আছে কিন্তু ইহার বিকল্প অবস্থায় শিশু যেন আনন্দ না পায়; তাহা হইলে সে নিঃসঙ্গভাবে অবসন্ন হইয়া সময় কাটানোর পরিবর্তে শিক্ষা গ্রহণের কাজই পছন্দ করিবে। কিন্তু কোনো শিশু যদি কখনও এই বিকল্প অবস্থাই পছন্দ করে তাহাকে নিষ্ক্রিয় হইয়া থাকিতে দিতে হইবে, পরে নিজের ভুল সে নিজেই বুঝিবে। শিশুর ব্যক্তিগতভাবে কাজ করার নীতি সম্প্রসারণ করা চলে যদিও প্রথম কয়েক বৎসর পর সমবেতভাবে কাজ করানো অত্যাবশ্যক। কোনো বালক বা বালিকাকে যদি শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য করার প্রয়োজন হয় অর্থাৎ সে যদি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইহাতে উৎসুক না হয় তবে তাহার দেহ বা মনের স্বাস্থ্যগত কোনো কারণ না থাকিলে, বুঝিতে হইবে যে, শিক্ষকের দোষই ইহার জন্য দায়ী কিংবা শিশুর বাল্যশিক্ষা খারাপ হইয়াছে। পাঁচ বা ছয় বৎসর পর্যন্ত শিশুর শিক্ষানুরাগ উদ্দীপ্ত করিতে পারেন।
