অনেক প্রকার নিখুঁততা আছে; ইহাদের প্রত্যেকটিই প্রয়োজনীয়। প্রধান কয়েকটি হইল–মাংসপেশি সঞ্চালনে নিপুণতা, সৌন্দর্য ও রসসৃষ্টিতে সূক্ষ্ম নিপুণতা, কোনো বিষয় সম্পর্কে যথার্থ, যুক্তিতর্কে নিখুঁততা। প্রত্যেক বালক বালিকাই চলা-ফেরা করিতে মাংসপেশির শোভনভাবে সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা বুঝিতে পারে; দেহের ভারসাম্য ও সুষ্ঠু গতিভঙ্গির জন্য ইহা আবশ্যক। স্বাস্থ্যবান শিশু দেহের এই স্বচ্ছন্দগতির জন্য নিজের অজ্ঞাতে প্রস্তুত হইতে থাকে। বিভিন্ন ভঙ্গিতে দৌড়ানো, লাফানো, মই বাহিয়া উপরে ওঠা-নামা প্রভৃতির ভিতর দিয়া সে দেহ সঞ্চালনের কৌশল আয়ত্ত করে; এইভাবে সে পরবর্তীকালের খেলাধুলার জন্য প্রস্তুত হয়। খেলাধুলা সংক্রান্ত দৈহিক উৎসুক এবং মাংসপেশির সুষ্ঠু সঞ্চালন ছাড়াও স্কুল-জীবনে শিক্ষণীয় অন্য প্রকার নিপুণতা আছে, যেমন স্পষ্ট উচ্চারণ, সুন্দর হস্তাক্ষর, বাদ্যযন্ত্র বাদনে দক্ষতা ইত্যাদি। এই বিষয়গুলি শিশু প্রয়োজনীয় মনে করিবে কি না তাহা নির্ভর করিবে তাহার পরিবেশের উপর।
সৌন্দর্য বা রসসৃষ্টির নিখুঁততা ব্যাখ্যা করিয়া বুঝানো মুশকিল; ইহার উদ্দেশ্য আনন্দের অনুভূতি সঞ্চার করা। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য প্রভৃতিতে খুঁত থাকিলে তাহা যে রসভঙ্গ করে এবং পরিপূর্ণ আনন্দ দান করে না তাহা ছাত্রদিগকে বুঝানো সহজ। শেকসপিয়রের অথবা রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতা মুখস্থ করান; আবৃত্ত করিবার সময় কোথাও ভুল করিলে সে স্থান তাহাকে নিজেকে কথায় পূরণ করিতে বলুন এবং মূলের সঙ্গে পার্থক্য দেখাইয়া দিন। সে নিজেই বুঝিতে পারিবে মূল রচনার সহিত তুলনায় তাহার নিজের দেওয়া কথাগুলি কবিতার অঙ্গহানি করিয়াছে। এইভাবে সংগীত ও নৃত্যে কোথাও ভুল হইলে তাহা অশোভন হয় এবং তাহার ফলে মানুষেরা সূক্ষ্ম রসবোধ তৃপ্তি লাভ করে না। আবৃত্তি, সংগীত এবং নৃত্য ছাত্রদিগকে নিখুঁততা শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে বিশেষ উপযোগী। অঙ্কনও শিশুদিগকে নিখুঁত কাজের উৎসাহ দেয় কিন্তু রসোপলব্ধির উপাদান হিসাবে ইহার মূল্য খুব বেশি নহে।
মডেল দেখিয়া অংকন, ছাত্রের নিখুঁততা শিক্ষার উপাদান হিসাবে কাজে লাগানো চলে কিন্তু ইহার মূল্য খুব বেশি নহে; কারণ সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য প্রভৃতি যেমন নিখুঁত হইলে আনন্দদান করে এবং ছাত্র ইহার মাধ্যমে নূতন সৃষ্টির আনন্দ বোধ করে, অঙ্কনের ক্ষেত্রে তেমন নয়; একটি নির্দিষ্ট বস্তু দেখিয়া ঠিক অনুরূপ করিয়া আঁকায় নূতন সৃষ্টির আনন্দ নাই। এই হিসাবে সংগীত, নৃত্য আবৃত্তি অঙ্কনের অপেক্ষা ছাত্রকে নিখুঁততা অর্জনে বেশি আনন্দ দেয়। ইহা সত্য যে, কোনো মডেল দেখিয়া আঁকিতে গেলে মামুলি এবং বাঁধাধরা উপায়ই গ্রহণ করিতে হয়, নূতন সৃষ্টির উন্মাদনা। মডেল ভালো বলিয়াই ইহার নকল আঁকা হয়, যে কোনো জিনিসের নকল করাই যে ভালো তাহা নহে।
ইতিহাসের সন তারিখ এবং ভূগোলে উল্লিখিত স্থানের নাম প্রভৃতি যথাযথ মনে রাখা অত্যন্ত বিরক্তিকর ব্যাপার। ইংল্যাণ্ডের রাজাদের রাজত্বের তারিখ এবং প্রধান জেলাগুলির নাম মুখস্থ করা বিলাতের ছেলেমেয়েদের কাছে এক ভয়াবহ বিষয় ছিল। আমি অন্তরীপগুলির নাম মনে রাখিতে পারিতাম না কিন্তু আট বৎসর বয়সে আমি ভূগর্ভস্থ রেল লাইনের প্রায় সবগুলি স্টেশনের নাম বলিতে পারিতাম। পুত্র কন্যাদিগকে যদি সিনেমার ছবিতে দেশের উপকূল দিয়া জাহাজ চালানো ছবি দেখানো যায় তবে তাহারা শীঘ্রই অন্তরীপগুলি চিনিয়া ফেলিবে। এইগুলি শেখা যে একান্তই কর্তব্য তাহা আমি বলি না; আমি বলিতে চাই যে, ইহা শিখানোর প্রকৃষ্ট পন্থা হইল চলচ্চিত্রে ইহা দেখানো। সিনেমার মারফত সমগ্র ভূগোল শিক্ষা দেওয়া উচিত; ইতিহাসও প্রথমে এইভাবে শিকানো উচিত। ইহার জন্য প্রাথমিক খরচ পড়িবে খুব বেশি কিন্তু গভর্নমেন্টের পক্ষে ইহা খুব বেশি নয়। ইহার ফলে এ বিষয়গুলি শিখানো সহজ হইয়া আসিবে।
যুক্তিতর্কের নিখুঁততা এবং বিচারবুদ্ধি কিঞ্চিৎ বেশি বয়সে অধিগত হয়; শিশুদের নিকট হইতে ইহা আশা করা উচিত হইবে না। নামতার ছক মুখস্ত করিয়া গুণফল মুখে মুখে বলার নিখুঁততা আছে বটে কিন্তু প্রথমে শিশু ইহা না বুঝিয়াই মুখস্থ করে এবং পরে সে ইহার ভিতরকার যুক্তি বুঝিতে পারে। যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির উন্মেষের জন্য অঙ্কশাস্ত্রই স্বাভাবিক পন্থা কিন্তু ইহা যদি কতকগুলি নীরস এবং পূর্ব নির্দিষ্ট কানুন বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় অর্থাৎ ইহার মধ্যে যে যুক্তির প্রয়োগ রহিয়াছে তাহা লক্ষ্য করা না হয় তবে এই শিক্ষা ব্যর্থ। নিয়মকানুনগুলি অবশ্যই শিখিতে হইবে কিন্তু এক সময়ে শিশুর কাজে ইহার মূলে যে যুক্তি রহিয়াছে তাহা বুঝাইয়া দিতে হইবে, নতুবা অঙ্কের কোনো শিক্ষা-মূল্য নাই।
এখানে একটি প্রশ্ন আলোচনা করা যাক : শিক্ষাদান সকল অবস্থাতে আনন্দপ্রদ করা সম্ভব কি না কিংবা বাঞ্ছনীয় কি না। পূর্বে ধারণা ছিল ইহার বেশিরভাগই নীরস, কেবল কর্তৃপক্ষের কঠোর শাসনে শিশু ইহা গ্রহণ করিত। (বেশিরভাগ মেয়েই অজ্ঞ থাকিত) আধুনিক শিক্ষাবিদগণের অভিমত এই যে, শিক্ষা আগাগোড়া আনন্দদায়ক করা চলে। আধুনিকদের অভিমতের প্রতিই আমার সহানুভূতি বেশি, তথাপি আমার মনে হয়, শিক্ষা সকল স্তরেই বিশেষ করিয়া উচ্চশিক্ষায় ইহা সর্বদা সম্ভবপর হয় না।
