ধৈর্য ও অধ্যবসায় সুশিক্ষার ফলস্বরূপ বিকশিত হয়। পূর্বে মনে করা হইত যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাহিরেই কর্তৃপক্ষের শাসনের ফলে যে সদভ্যাস গঠিত হয় কেবল তাহা দ্বারাই এই-গুণগুলি অর্জন করা সম্ভব। কঠোর শাসনের ভিতর দিয়া প্রথমে ঘোড়াকে বাগ মানাইতে হয়; ইহা দেখিয়া মনে হয় এইরূপ শাসনে সংযত করার ও সদভ্যাস গঠন করানোর প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু ইহার জন্য জোরজবরদস্তি না করিয়া ছাত্রকে প্রথমে সহজ একটি কাজে সাফল্য লাভ করিতে দিয়া তাহাকে ক্রমে কঠিনতর বিষয়ে কৃতকার্যতা অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় উৎসাহিত করা যায়। ধৈর্য ও নিষ্ঠার ফলে সাফল্য অর্জিত হইলে তাহা ছাত্রকে পুরস্কার লাভের আনন্দময় অভিজ্ঞতা দান করে; পরে ক্রমে ধৈর্য ও চেষ্টার পরিমাণ বৃদ্ধি করা চলে। জ্ঞান অর্জন কঠিন হইলেও অসম্ভব নয়–এই বিশ্বাসও ঠিক অনুরূপভাবে শিক্ষার্থীদের মনে সঞ্চার করা যায়। এইজন্য তাহার দ্বারা প্রথমে সহজ হইতে শুরু করিয়া ক্রমে কঠিন সমস্যা সমাধান করাইয়া তাহার আত্মবিশ্বাস জন্মাইয়া লইতে হয়।
ইচ্ছামতো যে কোনো নীরস বিষয়েও মনোনিবেশের শক্তির মতোই নির্ভুলতার প্রতিও শিক্ষা-সংস্কারকগণ বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন না। ডক্টর ব্যালার্ডের মতে বিলাতের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি অনেক বিষয়ে পূর্বের অপেক্ষা যথেষ্ট উন্নত হইয়াছে কিন্তু ছাত্রদের লিখিত উত্তরের নির্ভুলতা আগের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পাইয়াছে। তিনি বলেন :
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুই শতকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে বার্ষিক পরীক্ষায় যে প্রশ্ন দেওয়া হইত তাহার উত্তর বিবেচনা করিয়া বিদ্যালয়ের আর্থিক সাহায্য বরাদ্দ করা হইত। এইরূপ বহু প্রশ্ন এখনও রক্ষিত আছে। বর্তমানের ছাত্রছাত্রীদিগকে এই একই প্রশ্ন উত্তর করিতে দিলে ফল হয় পূর্বের অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্ট। ইহার কারণ যাহাই বলি না কেন, এই বিষয়ে যে অবনতি ঘটিয়াছে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। সমগ্রভাবে ধরিলে আমাদের বিদ্যালয়ের কাজ অন্ততঃপক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজ, পঁচিশ বৎসর পূর্বে যেমন ছিল এখন তাহা অপেক্ষা অনেক কম নির্ভুল হয়।
এই বিষয়ে ডক্টর ব্যালার্ডের আলোচনা এমন চমৎকার যে, ইহার উপর আমার আর বিশেষ কিছু বলিবার নাই। তাহার উপসংহারের কথা কয়েকটি উদ্ধৃত করি :
যত কিছুই বলা হউক না কেন, নির্ভুলতা বা কোনো কাজ যথার্থভাবে করার অভ্যাস এখনও একটি মহৎ এবং প্রেরণাদায়ক আদর্শ বলিয়া পরিগণিত। ইহাকে বুদ্ধির সততা বলা যায়। আমাদের চিন্তায়, বাক্যে এবং কর্মে আমরা কি পরিমাণ যথার্থ তাহা দ্বারাই আমাদের সত্যনিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।
আধুনিক শিক্ষাপ্রণালীর সমর্থকগণ মনে করেন শিক্ষা শিশুর নিকট আনন্দপ্রদ করিতে পারাই মস্ত বড় লাভ; কোনো বিষয় নিখুঁতভাবে শিক্ষা দিতে গেলে যে পরিশ্রম ও অধ্যবসায় স্বীকার করিতে হয় তাহার ফলে ছাত্রের মনে অবসাদ আসিতে পারে। এইজন্য আধুনিক প্রণালী সমর্থনকারীগণ জ্ঞানে পূর্ণাঙ্গতার উপর বেশি জোর দেন নাই। এইস্থানে ছাত্রের মানসিক অবসাদ কি ধরনের হইতে পারে তাহা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। শিক্ষক যদি জোর করিয়া কোনো কিছু ছাত্রের উপর আরোপ করেন এবং তাহার ফলে যদি সে অবসাদ বোধ করে তবে তাহা নিশ্চয়ই অপকারী। কিন্তু নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিবার জন্য ছাত্র স্বেচ্ছায় যে কঠোর পরিশ্রমের কাজে আত্মনিয়োগ করে তাহা মাত্রা অতিক্রম না করিলে সত্যই বিশেষ মূল্যবান। যে সকল বাসনা পূরণ করা রীতিমত কষ্টসাধ্য তাহা সাধন করিতে ছাত্রদিগকে উৎসাহিত করা শিক্ষার অঙ্গ হওয়া উচিত। যেমন, বীজগণিতের জটিল অঙ্ক কষা, হোমারের কাব্য পাঠ করা, ভালো বেহালা বাজানো এইরকম নানা ধরনের কাজ ছাত্রদিগকে দেওয়া চলে। ইহার প্রত্যেকটি কাজে উৎকর্ষ অর্জন করিতে নিখুঁতভাবে তাহা জানা প্রয়োজন। যোগ্য বালক বালিকা উৎসাহিত হইলে এইরূপ কাজে নিপুণতা অর্জনের জন্য অপরিসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখাইতে পারে। কাজে দক্ষতা অর্জনের যোগ্য স্বাভাবিক ক্ষমতা না থাকিলেও কতক ছাত্র শিক্ষকের নিকট হইতে অনুপ্রেরণা লাভ করিয়া উৎসাহের সঙ্গে প্রবৃত্ত হইতে পারে। শিক্ষার ব্যাপারে শিক্ষার্থীর নিষ্ঠা, অনুরাগ এবং শেখার বাসনাই প্রধান শক্তি জোগায়, শিক্ষকের কর্তৃত্ব অনিচ্ছুক ছাত্রকে জোর করিয়া শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য করিতে পারে না; পিপাসা না থাকিলে যেমন ঘোড়াকে জল পান করানো যায় না তেমনই। কিন্তু তাই বলিয়া এইরূপ মনে করিবার কোনো কারণ নাই যে, প্রত্যেক স্তরেই শিক্ষা হইবে কোমল, সহজ এবং সুখদায়ক। কোনো বিষয়ে সঠিকতা অর্জনের প্রশ্নে একথা বলা চলে। নিখুঁতভাবে কিছু শিক্ষা করিতে গেলে যতেষ্ট পরিশ্রম ও ধৈর্য দরকার কিন্তু ইহা ছাড়া জ্ঞানে বা বিদ্যায় উৎকর্ষ লাভ করা সম্ভবপর নয়। শিশুদিগকে ইহা বুঝাইয়া দেওয়া যায়। আধুনিক প্রণালী এই বিষয়ে অনেকটা অকৃতকার্য হইয়াছে। কারণ প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালীর কঠোরতার বিরুদ্ধে যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অতিরিক্ত শিথিলতা দেখা দিয়াছে, ইহার স্থানে নূতন শাসন বিধান গড়িয়া তুলিতে হইবে এবং এই শৃঙ্খলা বাহিরের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চাপানো শাসন হইবে না, মনোবিজ্ঞানকে ভিত্তি করিয়া শিক্ষার্থীর মনের দিক হইতে ইহা গড়িয়া তুলিতে হইবে। প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালীতে বাহিরের কর্তৃপক্ষ শাসন ও শৃঙ্খলা আরোপ করিয়া শিক্ষার্থীকে সংযত রাখিতেন, কাজে নিযুক্ত থাকিতে বাধ্য করিতেন। তাহাতে শিক্ষার্থীর মনে স্বাভাবিক স্ফূর্তি থাকিত না, আধুনিক প্রণালীর শিক্ষার্থীর উপর এরূপ জবরদস্তি করার পক্ষপাতী নয় কিন্তু শৃঙ্খলা ব্যতীত শিক্ষা কখনই সম্ভব হইতে পারে না; এ শৃঙ্খলাবোধ শিশুর মনে জাগ্রত করিতে হইবে এবং আচরণে ইহার প্রকাশ দেখা যাইবে। কাজ নিখুঁততা অর্জন হইবে এইরূপ নূতন শৃঙ্খলার পরিচায়ক।
