শিক্ষার্থীর জ্ঞান লাভের বাসনা যদি অকৃত্রিম হয় তবে তাহার মনও থাকে উন্মুক্ত। যাহা কিছু জ্ঞাতব্য তা সবই জানিয়াছি এই বিশ্বাসের সঙ্গে যখন আরও অন্য কামনা একত্রে তালগোল পাকাইয়া যায় তখনই আমাদের ভোলা মন আর থাকে না, কোনো নির্দিষ্ট অভিমত আমাদের মনে স্পষ্ট হইয়া ওঠে। এইজন্য বাল্যে এবং প্রথম যৌবনে আমাদের মন যতখানি উন্মুক্ত এবং অন্যের নিকট হইতে ভাব গ্রহণের জন্য বা বিচার করিয়া দেখিবার জন্য প্রস্তুত থাকে শেষ বয়সে ততখানি থাকে না। কোনো বিষয় সম্বন্ধে বয়স্ক ব্যক্তিরা যে অভিমত পোষণ করেন তাহার সহিত তাহাদের কার্যকলাপ ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। ধর্মযাজক ধর্মের অনুশাসন সম্বন্ধে অথবা সৈনিক যুদ্ধ সম্পর্কে উদাসীন হইতে পারেন না। আইনজীবী বলিবেন অপরাধীর শাস্তি হওয়া উচিত, তবে আসামিপক্ষে নিযুক্ত হইলে তিনি তাহার শাস্তি না দেওয়ার পক্ষেই যুক্তি প্রর্দশন করিবেন। স্কুল শিক্ষক যেরূপ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ট্রেনিং লইয়াছেন এবং যাহার ভিতর কাজ করিয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছেন তাহাই সমর্থন করিবেন। যে রাজনৈতিক দলে থাকিলে উচ্চপদ প্রাপ্তির সম্ভাবনা রাজনীতিক সে-দলের মতবাদ না মানিয়া পারেন না। উপজীবিকা হিসাবে একজন যখন কোনো কাজ নির্বাচন করিয়া লয় তখন ইহা আশা করা যায় না যে, সে সর্বদা এই চিন্তা করিবে সে অন্য কোনো পেশা গ্রহণ করিলেই ভাল হইত। অতএব দেখা যায়, পরবর্তী জীবনে ভোলা মনে কোনো বিষয়ে অভিমত প্রকাশ বা পোষণ করায় নানা প্রতিবন্ধক আছে কিন্তু শিশু ও কিশোরের জীবনে উইলিয়াম জেমসের কথায় জোর করিয়া চাপানো মত গ্রহণ করার অবস্থা বেশি ঘটে না। এইজন্যই সহজে কোনো কিছু বিশ্বাস করার প্রবণতাও কম থাকে। বয়স্ক ব্যক্তিরা কর্মজীবনে শিশুদের মতো ভোলা মন রাখিতে পারে না। ইহা স্বাভাবিক; কেননা চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক ঘটনা এবং অবস্থার চাপে তাহাদিগকে কোনো বিষয় সম্বন্ধে অভিমত গ্রহণ করিতে হয়। তাহাদিগকে অনেক সময় নিজেদের বিবেকের নির্দেশসম্মত না হইলেও স্বার্থের যাহা অনুকূল এমনভাবেই মতামত গড়িয়া তুলিতে হয়। তরুণদিগকে উৎসাহ দেওয়া উচিত যাহাতে তাহারা প্রত্যেকটি প্রশ্ন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করিয়া নিজেদের বিচার বুদ্ধিমতো অভিমত প্রদান করিতে পারে। এই চিন্তার স্বাধীনতার অর্থ এই নহে যে, স্বেচ্ছামত যে-কোনোরূপ আচরণ করার অধিকারও তাহাদের থাকিবে। কোনো লোকের সমুদ্রে বীরত্ব প্রদর্শনের কাহিনী শুনিয়াই যে বালকগণ সমুদ্রে ঝাপাইতে যাইবে তাহাদিগকে এতখানি স্বেচ্ছাচারী হইতে দেওয়া ঠিক হইবে না। তবে তাহাদের ছাত্রাবস্থায় তাহারা যদি এইরূপ রোমাঞ্চকর অভিযানের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মনে করে যে অধ্যাপক হওয়া অপেক্ষা জলদস্যু হওয়া বেশি বাঞ্ছনীয়। তবে তাহাকে এইরূপ চিন্তার স্বাধীনতা দিতে কোনোরূপ আপত্তি করা উচিত নয়।
একাগ্রতা : মনোবিকাশের ক্ষমতা বা একাগ্রতা একটি অতি মূল্যবান মানসিক গুণ কিন্তু শিক্ষা ব্যতীত ইহা অর্জন করা যায় না। ইহা অবশ্য সত্য যে, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে একাগ্রতা স্বভাবতই বাড়িতে থাকে; শিশুরা কোনো বিষয়েই কয়েক মিনিটের বেশি মনোনিবেশ করিতে পারে না কিন্তু বয়স যত বাড়িতে থাকে তাহাদের চঞ্চলমতিত্ব তত কমিতে থাকে। তথাপি বহুদিনব্যাপী বুদ্ধিগত শিক্ষা ব্যতীত তাহারা যথোপযুক্ত পরিমাণে মানসিক একাগ্রতা অর্জন করিতে পারে না। পূর্ণাঙ্গ একাগ্রতার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে : ইহা হইবে তীব্র, দীর্ঘদিন স্থায়ী এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। একাগ্রতা কতখানি নিবিড় এবং গম্ভীর হইতে পারে আর্কিমিডিসের কাহিনীই তার প্রমাণ। একটি অঙ্কের সমস্যায় তিনি এমন তন্ময় হইয়াছিরেন যে, রোমান সৈন্যগণ কখন সায়রাকিউজ দখল করিয়া তাহাকে হত্যা করিতে তাহার গৃহে প্রবেশ করিয়াছিল তিনি তাহা কিছুই জানিতে পারেন নাই। কোনো কঠিন কাজ সম্পন্ন করিতে এবং এমন জটিল ও সূক্ষ্ম সমস্যার সমাধান বাহির করিতে একই কাজে গভীর একাগ্রতার প্রয়োজন। কোনো বিষয়ের প্রতি অনুরাগ থাকিলে স্বাভাবিকভাবেই এইরূপ তন্ময়তা আসে। অনেকেই কোনো যান্ত্রিক হেঁয়ালি বা ধাঁধার মধ্যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত মনোনিবেশ করিতে পারে কিন্তু ইহার বিশেষ মূল্য নাই। একাগ্রতা যখন ইচ্ছা দ্বারা চালিত হইবে তখনই বলা যায় যথার্থ মূল্যবান। ইহা বলার উদ্দেশ্য এই যে, কতক জ্ঞানের বিষয় স্বভাবতই নীরস, তবু ইচ্ছাশক্তির বলে লোকে তাহাতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে মনোনিবেশ করিতে পারে। আমার মনে হয় উক্ত শিক্ষার ফলেই লোকে ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিয়া এইরূপ একাগ্রতা লাভ করিতে পারে। এই একটি ব্যাপারে প্রাচীন প্রণালীর শিক্ষা প্রশংসনীয়; স্বেচ্ছায় কোনও নীরস কাজে আগ্রহের সঙ্গে মনোনিবেশ করাইতে বর্তমান শিক্ষাপ্রণালী প্রাচীনের মতো এতখানি সফলতা লাভ করে কি না সন্দেহ। যাহাই হউক বর্তমান শিক্ষাপ্রণালীর মধ্যে এই দোষ বিদ্যমান থাকিলেও তাহা অসংশোধনীয় নহে। প্রাচীন শিক্ষাপ্রণালী শিক্ষার্থীর মনঃপ্রবৃত্তির উপর কোনো গুরুত্ব আরোপ করিত না। কোনো শিক্ষণীয় বিষয় শিক্ষার্থীর নিকট সরস কি নীরস মনে হইবে তাহার বিচার না করিয়া তাহার উপর চাপাইয়া দেওয়া হইত। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক ছাত্রকে তাহা শিক্ষা করিতেই হইত। ইহার ফলে অনেক নীরস বিষয়বস্তুর প্রতিও নিবিষ্টভাবে মনোনিবেশ করিতে হইত। এই বিষয়ে পরে আলোচনা করা হইবে।
