অশ্লীলতার প্রতি কৌতূহল : যে বালক বা বালিকার কাছে যৌন বিষয়ের জ্ঞান অন্যান্য বিষয়ের মতোই অতি সাধারণ, অর্থাৎ কোনোরূপ বাধা নিষেধ বা গোপনতার অবলম্বনের ফলে ইহার প্রতি যাহার কোনো আকর্ষণ সৃষ্টি হয় নাই তাহার নিকট ইহার কোনো মোহ বা কৌতূহল থাকিতে পারে না। যে বালক কোনো অশ্লীল ছবি সংগ্রহ করে সে ইহা সংগ্রহ করার কৌশলের জন্য এবং ছবির বিষয়বস্তু সম্বন্ধে তাহার অন্য সঙ্গীদের তুলনায় বেশি কিছু জানে ইহা ভাবিয়া গর্ব বোধ করে। তাহাকে যদি যৌন বিষয় সম্বন্ধে খোলাখুলিভাবে আগেই বলা হইত তবে সে এইরূপ ছবিতে বিশেষ কোনো কৌতূহল বোধ করিত না। ইহা সত্ত্বেও যদি কোনো বালক এইরূপ ছবির প্রতি এবং যৌনজীবনের প্রতি কৌতূহল দেখাইতে থাকে তবে আমি বিশেষজ্ঞের দ্বারা তাহার চিকিৎসার ব্যবস্থা করিব। চিকিৎসার পদ্ধতি হইবে এইরূপ : প্রথমে বালককে তাহার মনের সব চিন্তা ও বাসনা তাহা যতই অশ্রাব্য বা অকথ্য হউক না কেন প্রকাশ করিয়া চলিতে উৎসাহ দিতে হইবে; এই সম্বন্ধে তাহাকে আরও অনেক বেশি বিষয় জানানো হইবে, এইভাবে তাহাকে যৌনজীবনের বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলি জানাইলে ইহার প্রতি তাহার কৌতূহল নিভিয়া আসিবে। সে যখন বুঝিবে যে, এই সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু জানিবার নাই এবং যাহা জানা হইয়াছে তাহাও চমকপ্রদ নয় তখন সে এই মানসিক ব্যাধি হইতে আরোগ্য লাভ করিবে। এই বিষয়ে বিশেষভাবে মনে রাখিতে হইবে যে, যৌনজ্ঞান দোষের কিছু নয়, কেবল কোনো কিছু সম্বন্ধে সর্বদা চিন্তায় তন্ময় হইয়া থাকাই ক্ষতিকর। জোর করিয়া মনকে অন্য কোনো বিষয়ে নিবদ্ধ করিলে এইরূপ তন্ময়তার ঝোঁক নিবারণ করা যায় না, মানসিক ব্যাধিও নিরাময় হয় না, ইহার জন্য বরং দরকার সেই বিষয়েই তাহাকে আরও বেশি করিয়া ভাবিবার এবং জানিবার সুযোগ দেওয়া। এই উপায়ে তাহার অস্বাভাবিক এবং অসুস্থ মনের পরিচয়ক বাসনাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা চলে। ইহা করা হইলে তখন সে-কৌতূহল আর অপকারক হয় না বা মনকে কেবল একই দিকে সর্বক্ষণ নিবদ্ধ করিয়া রাখে না। আমার বিশ্বাস, ইহাই কোনো সংকীর্ণ এবং অস্বাভাবিক কৌতূহল দমন করিবার প্রকৃষ্ট উপায়। নিষেধ করিয়া বা নৈতিক শাস্তির ভয় দেখাইয়া ইহা নিবৃত্ত করিতে গেলে বিপরীত ফলের সম্ভাবনাই বেশি।
চরিত্রের উন্নতিসাধন শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য নয়, তবু মানব-চরিত্রের কতকগুলি বাঞ্ছিত গুণ আছে, জ্ঞান অর্জনের জন্য যেগুলি বিশেষ প্রয়োজনীয়। ইহাদিগকে বুদ্ধিমূলক গুণ বলা যাইতে পারে। বুদ্ধিমূলক শিক্ষার ফলস্বরূপ ইহাদের বিকাশ সাধিত হওয়া উচিত, গুণ হিসাবে পৃথকভাবে ইহাদিগকে আয়ত্ত করার প্রশ্ন ওঠে না, জ্ঞান অর্জনের সাধনায় স্বাভাবিকভাবেই এইগুলি আয়ত্ত হওয়া প্রয়োজন। এইরূপ গুণগুলির মধ্যে আমার কাছে প্রধান মনে হয় : কৌতূহল, মুক্ত মনোভাব, জ্ঞান অর্জন কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয় এই ধারণা, ধৈর্য, অধ্যবসায়, একাগ্রতা এবং যথার্থতা [Exactness]। ইহাদের মধ্যে কৌতূহলই মূল; যথায় কৌতূহল খুব প্রবল এবং ঠিক পথে পরিচালিত হয় তথায় অন্যগুলি আপনা হইতেই আসিবে। কিন্তু কৌতূহল হয়তো এত সক্রিয় নয় যে সমগ্র বুদ্ধিমূলক জীবনের ভিত্তিস্বরূপ হইতে পারে। কোনো কঠিন কিছু কাজ করিবার বাসনাও থাকা উচিত; যে জ্ঞান অর্জন করা হইবে তাহা শিক্ষার্থীর নিকট কৌশল বলিয়া বোধ হইবে, যেমন কৌশল আয়ত্ত হয় খেলার বা দৈহিক ক্রীড়া প্রদর্শনে। প্রথমদিকে স্কুলে, কৃত্রিম কাজ আয়ত্ত করার ভিতর দিয়াই কৌশল অর্জন করিতে হইবে, ইহার ব্যতিক্রম করা কঠিন; কিন্তু স্কুলের কাজের বাহিরের কোনো কাজে কৌশল আয়ত্ত করার বাসনা ছাত্রের মনে জাগাইতে পারিলে প্রকৃত উপকার করা হইবে। শিক্ষাকে জীবনের সহিত সম্পর্ক শূন্য করা শোচনীয় ব্যাপার; কিন্তু স্কুল জীবনে ইহা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা যায় না। যেখানে পরিহার করা একান্তই অসম্ভব সেখানে জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন যে জ্ঞান আয়ত্ত করার প্রশ্ন ওঠে, ব্যাপক অর্থে তাহার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে আলোচনা করা দরকার; ছাত্র যেন বুঝিতে পারে তাহার বর্তমান জীবনের সঙ্গে সেরূপ জ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সংযোগ না থাকিলেও তাহারও প্রয়োজনীয়তা আছে এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে তাহা কাজে লাগিতে পারে। ইহা ছাড়াও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ কৌতূহলের জন্য আমি অনেকটা স্থান-দিব; ইহা ব্যতীত অনেক মূল্যবান জ্ঞান কখনই মানুষের আয়ত্ত হইত না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়–বিশুদ্ধ গণিতের কথা [Pure Mathematics]। এমন অনেক শিক্ষণীয় বিষয় যাহা অন্য কোনো প্রয়োজনে না লাগিলেও কেবল জ্ঞানের জন্যই আমার কাছে মূল্যবান মনে হয়। যে-কোনো রকম জ্ঞান অর্জন করিতে হইলেই ছাত্রগণ তাহা হইতে কিছু লাভের আশা করুক অথবা কোনো উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখিয়া অগ্রসর হউক ইহা আমি চাই না। উদ্দেশ্য বা লাভ নিরপেক্ষ কৌতূহল উদ্দীপ্ত করা যায় না তথায়ই কেবল দক্ষতা অর্জনের বাসনা জাগাইবার চেষ্টা করিব যে দক্ষতা কাজে প্রকাশ করা যায়। শিক্ষার্থীর জীবনে প্রত্যেকটি উদ্দেশ্যেরই প্রয়োজনীয়তা আছে–জীবনের সঙ্গে সম্বন্ধ যুক্ত বিষয়ের প্রতি কৌতূহলের যেমন আবশ্যকতা আছে, উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ কৌতূহলেরও তেমনই মূল্য আছে। ইহাদের একটির প্রতি বেশি জোর দিতে গিয়া অন্যটিকে উপেক্ষা করা উচিত হইবে না।
