জাগতিক ব্যাপারে অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন, শিক্ষাক্ষেত্রেও তেমন উন্নতির একমাত্র পথই আছে; তাহা হইল প্রেম কর্তৃক বিধৃত বিজ্ঞান। বিজ্ঞান ব্যতীত প্রীতি শক্তিহীন; প্রীতিহীন বিজ্ঞান ধ্বংসকারী। শিশুদের শিক্ষাদান প্রণালীর যাহা কিছু উন্নতি হইয়াছে তাহা সম্ভব হইয়াছে এইরূপ ব্যক্তি সকলের চেষ্টায় যাহারা শিশুদিগকে ভালোবাসিতেন; উন্নততর প্রণালী উদ্ভাসিত হইয়াছে এইরূপ ব্যক্তিসকলের দ্বারা যাহারা শিশুর ক্রমবিকাশ ও মনঃপ্রকৃতি সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিক তথ্য অবগত ছিলেন। ইহা স্ত্রীলোকদিগের উচ্চ শিক্ষালাভের একটি সুফল। আগেকার দিনে শিশুপ্রীতি এবং বিজ্ঞানের একত্র মিলন ঘটে নাই। বর্তমান যুগে শিশুদের মন গড়িয়া তোলার মতো যে ক্ষমতা বিজ্ঞান আমাদের হাতে দিয়াছে তাহা বড়ই নিদারুণ; এই ক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহার সম্ভবপর। ভ্রান্ত লোকে ইহা প্রয়োগ। করিয়া পশুরাজ্য অপেক্ষাও নিষ্ঠুর নির্দয় মানব-সমাজ গড়িয়া তুলিতে পারে। শিশুদিগকে ধর্ম, স্বদেশপ্রীতি এবং সাহস কিংবা কমিউনিজম, শ্রমিকতন্ত্রবাদ এবং বিপ্লববাদ শিক্ষা দেওয়ার অজুহাতে সংকীর্ণমনা, যুদ্ধপ্রিয় এবং হৃদয়হীন পশুরূপে গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা দ্বারা তাহাদের শিক্ষাদানে অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত; শিশুদের অন্তরে প্রতিবোধ জাগানো ইহার উদ্দেশ্য হওয়া আবশ্যক। তাহা না হইলে বিজ্ঞানের উন্নতি শিশুদের অপকার করার ক্ষমতাই ক্রমে বাড়াইয়া দিবে।
শিশুর প্রতি ভালোবাসা কার্যকরি শক্তি হিসাবে মানবসমাজে বিদ্যমান রহিয়াছে; শিশু-মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস এবং শিশুর শিক্ষা-প্রণালীর উন্নতিই ইহার প্রমাণ। এই শিশুপ্রীতি এখনও পর্যন্ত দুর্বল বলিয়াই আমাদের রাজনীতিকগণ অত্যাচার ও রক্তপাতের পথে নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে অগণিত শিশুর জীবন বলি দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। তথাপি শিশুর প্রতি মানুষের প্রীতি আছে এবং ক্রমে বৃদ্ধি পাইতেছে। যে সকল ব্যক্তি শিশুদিগের প্রতি স্নেহশীল তাহারাই আবার এমন ভাব মনে পোষণ করেন যাহার ফলে শিশুরা পরবর্তীকালে যুদ্ধবিগ্রহে মৃত্যুবরণ করিতে অনুপ্রাণিত এবং বাধ্য হয়। যুদ্ধকে বলা যায় বহু লোকের সম্মিলিত পাগলামি। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ক্রমে বয়স্ক ব্যক্তির জীবন পর্যন্ত প্রসারিত হোক ইহা কি আশা করা চলে না? শিশুদিগকে যাহারা ভালোবাসেন তাহারা তাহাদের অপত্যস্নেহ ও অনুরাগ কি শিশুদের পরবর্তী বয়স্ক জীবনেও বিস্তৃত করিতে পারেন না? শিশুদিগকে সবল দেহ ও বলিষ্ঠ মনে ভূষিত করিয়া তুলিয়া আমরা কি তাহাদিগকে তাহাদের শক্তি ও উদ্যমকে নূতন উন্নততর জগৎ গড়িয়া তোলার কাজে নিয়োগ করিতে দিব, না তাহারা এইকাজে প্রবৃত্ত হইলে আমরা ভয়ে পিছাইয়া গিয়া তাহাদিগকে পুনরায় দাসত্ব ও গতানুগতিক অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করিব? শিশুদের মঙ্গল করা এবং অমঙ্গল করা দুই ব্যাপারেই বিজ্ঞান আমাদের প্রধান সহায়। কোন পথ আমরা অবলম্বন করিব তাহা নির্ভর করে আমরা শিশুদিগকে ভালোবাসি না ঘৃণা করি তাহার উপর। কিন্তু দেখা যায় নৈতিক আদর্শের ধ্বজাধারীগণ শিশুদের প্রতি ঘৃণাকেই নানা আপাতশোভন নামের আবরণে ডাকিয়া অনুরাগের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং কাম্য আদর্শ বলিয়া প্রচার করেন।
সাধারণ নীতি : আমরা এ পর্যন্ত শিশুর চরিত্রগঠনের শিক্ষা সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছি। এই শিক্ষা প্রধানত বাল্যের শিক্ষা। ঠিকমতো পরিচালিত হইলে শিশুর ছয় বৎসর বয়সের মধ্যেই ইহা সম্পূর্ণ হইবে। আমি এইকথা বলি না যে, ছয় বৎসর বয়সের পর বালকের চারিত্রিক গঠন আর পরিবর্তিত হইতে পারে না; এমন কোনও বয়স নাই যখন প্রতিকূল ঘটনা বা পরিবেশ শিক্ষা পাইলে ছয় বৎসর বয়সের মধ্যে বালক বা বালিকার এমন বাসনা ও অভ্যাস গঠিত হয় যে, তাহা ঠিক পথেই চালিত হয়, কেবল পরিবেশের প্রতি অভিভাবকের কিছুটা দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। ছয় বৎসর পর্যন্ত উপযুক্ত বাল্যশিক্ষাপ্রাপ্ত বালক-বালিকা যে বিদ্যালয়ে পড়ে তথাকার কর্তৃপক্ষ অবিবেচক না হইলে তবে সেইস্থানে নৈতিক উপদেশদানের বিশেষ কোনো প্রয়োজন হইবে না, কেননা ছাত্রদের নিকট হইতে আর যে সব গুণের বিকাশ আশা করা হইবে তাহা বুদ্ধিমূলক শিক্ষার ফলস্বরূপ আপনা হইতে বিকশিত হইবে। ইহাই যে একমাত্র নীতি এবং ইহার কোনো ব্যতিক্রম নাই এইকথা আমি বলিতেছি না; নৈতিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়ার কোনো আবশ্যকতা নাই। স্কুল কর্তৃপক্ষকে শুধু এই কথাটিই মনে রাখিতে হইবে। এই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নাই যে, ছয় বৎসর বয়স পর্যন্ত শিশু চরিত্রগঠনের শিক্ষা পাইলে স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত কেবল বুদ্ধিমূলক শিক্ষার সুব্যবস্থা করা; কারণ ইহার মাধ্যমেই শিশুর চরিত্রের অন্য বাঞ্ছিত গুণগুলি পরিপূর্ণতা লাভ করিবে।
অবাঞ্ছনীয় বিষয়ের প্রতি কৌতূহল : শিক্ষাদান যদি নৈতিক বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয় তবে তাহা বুদ্ধির পক্ষে এবং শেষ পর্যন্ত চরিত্রের পক্ষে হানিকর হইয়া দাঁড়ায়। ইহা মনে করা উচিত নয় যে, কতক জ্ঞান ক্ষতিকর এবং কতক বিষয়ে অজ্ঞতা ভালো। শিক্ষার জন্যই শিক্ষাদান করা উচিত, কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণ করার জন্য নহে। ছাত্রের তরফ হইতে বিবেচনা করিলে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাহার কৌতূহল নিবৃত্ত করা এবং এমন দক্ষতা আয়ত্ত করানো যাহার ফলে সে নিজেই কৌতূহল মিটাইতে সক্ষম হয়। শিক্ষকের তরফ হইতেও কতক ফলদায়ক কৌতূহল জাগ্রত করা উচিত। স্কুলের শিক্ষা বিষয়ের বহির্ভূত কোনো কিছুর প্রতি ছাত্রের কৌতূহল উদ্দীপ্ত হইলেও তাহাকে নিরুৎসাহ করা উচিত নহে। এই কৌতূহল পরিতৃপ্ত করার জন্য স্কুলের পাঠ্যবিষয়ে কোনোরূপ ব্যতিক্রম বা বিঘ্ন সৃষ্টি করার প্রয়োজন নাই; তাহাকে বরং প্রশংসনীয় কৌতূহলের জন্য উৎসাহিত করিয়া স্কুলের সময়ের পরে, অন্য উপায়ে–যেমন পাঠাগার হইতে বই লইয়া, কিভাবে যে কৌতূহল নিবৃত্ত করিতে পারিবে সে সম্বন্ধে উপদেশ ও নির্দেশ দান করা উচিত। এই বিষয়ে যেরূপ তর্ক উঠিতে পারে আগেই তাহার আলোচনা করা যাক। ছাত্রের কৌতূহলকে উৎসাহিত করিতে হইবে বলা হইয়াছে কিন্তু এ কৌতূহল যদি বিকৃত হয় তবে কি করা হইবে? বালক যদি অশ্লীলতা অথবা নিষ্ঠুরতার প্রতি কৌতূহলী হয় তবে কি করা হইবে? অন্যে কি করে কেবল তাহা জানিতেই যদি তাহার কৌতূহল হয় তবে কি করা হইবে? এইরূপ কৌতূহলেও কি তাহাকে উৎসাহ দিতে হইবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাদিগকে একটি পার্থক্যের কথা মনে রাখিতে হইবে। কখনই আমাদের এইরূপ আচরণ করা উচিত নহে যাহাতে বালকের কৌতূহল কেবল একই বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অবাঞ্ছনীয় বিষয়ের প্রতি কৌতূহলের উদ্রেক হইয়াছে বলিয়াই বালককে অপরাধী মনে করার কিংবা তাহার নিকট হইতে ওই সব বিষয়ের জ্ঞান লুকাইয়া রাখিবার কোনো প্রয়োজন নাই। প্রায় সকল ক্ষেত্রে দেখা যায়, এইসব বিষয় বালকের নিকট হইতে গোপন রাখার ফলেই ইহাদের প্রতি সে আকৃষ্ট হয়; কতক ক্ষেত্রে মানসিক রোগ এইজন্য দায়ী এবং এই রোগের চিকিৎসা করানো আবশ্যক। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই বাধা নিষেধ ও নৈতিক ভীতি প্রদর্শন ইহার নিরাময় করার উপযুক্ত উপায় নহে। অশ্লীলতার প্রতি কৌতূহলের উদাহরণটি লওয়া যাক; সাধারণভাবে এটি ব্যাপক আকারে দেখা যায়।
