নার্সারি স্কুলে সুফল স্বরূপ যাহা আশা করা হইয়াছে তাহার মধ্যে অতিরঞ্জন আছে বলিয়া আমি মনে করি না। নার্সারি স্কুল যদি সর্বজনীন করা যায় তবে ইহা এক প্রজন্মকালের মধ্যে [In one generation] অর্থাৎ পঁচিশ বৎসরের মধ্যে বর্তমান সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির ভিতর শিক্ষাগত যে গভীর পার্থক্য রহিয়াছে তাহা দূর করিতে সমর্থ হইবে। ইহা সকল নাগরিকের মানসিক ও দৈহিক উৎকর্ষ সাধনে সক্ষম হইবে, যাহা বর্তমানে কেবল অল্পসংখ্যক ভাগ্যবান এই সুবিধা ভোগ করিতেছেন। যে রোগ অপচিকীর্ষা এবং অজ্ঞতার গুরুভার মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে তাহা দূর করিতে পারিবে। ১৯১৮ সনের শিক্ষা আইন অনুসারে সরকারি অর্থে নার্সারি স্কুলের উন্নতি সাধনের কথা ছিল কিন্তু পরে জাপানের সঙ্গে যুদ্ধে সুবিধা লাভের আশায় যুদ্ধ জাহাজ এবং সিঙ্গাপুর জাহাজঘাট [Dock] নির্মাণ করাই অধিকতর প্রয়োজনীয় বলিয়া বিবেচিত হয়। সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য গভর্নমেন্ট বর্তমানে কেবল এই খাতেই বার্ষিক সাড়ে ছয় লক্ষ পাউন্ড ব্যয় করিতেছেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমাদের সন্তানদিগকে রোগ-দুর্দশা এবং অশিক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করা হইয়াছে অথচ সামাজ্য রক্ষার্থে যুদ্ধের আয়োজনে প্রতি বৎসর যে পরিমাণ টাকা খরচ করা হয় তাহা নার্সারি স্কুলের বাবদ ব্যয় করিলে জনসাধারণকে এই দুর্ভোগের কবল হইতে রক্ষা করা সম্ভব। মহিলাগণ এখন ভোটের অধিকার পাইয়াছে। তাহারা কি নিজেদের পুত্রকন্যার মঙ্গলকামনায় একদিন ইহা প্রয়োগ করিতে শিখিবেন?
নার্সারি শিক্ষার বৃহত্তম দিকটি ছাড়াও অন্য একটি বিষয় বিবেচনা করিবার আছে। শিশুদের উপযুক্ত যত্ন ও তত্ত্বাবধান বাবদ কাজ রীতিমত শিক্ষাসাপেক্ষ; পিতামাতার নিকট হইতে ইহা আশা করা যায় না এবং পরবর্তিকালের বিদ্যালয় শিক্ষা হইতেও ইহা পৃথক। শ্রীমতী ম্যাকমিলানের কথা আবার উদ্ধৃত করি :
নার্সারিতে প্রতিপালিত শিশুর স্বাস্থ্য ভালো। তুলনায় সে কেবল বস্তির ছেলেমেয়ে হইতেই উৎকৃষ্ট নয়, ভালো জেলার মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুও তাহার সমকক্ষ নয়। ইহা স্পষ্টই বোঝা যায় যে, শিশুকে মানুষ করিতে অপত্যস্নেহ এবং পিতামাতার দায়িত্ববোধ হইতেও বেশি কিছু আবশ্যক। শাসন এবং জোরজবরদস্তি ব্যর্থ হইয়াছে, জ্ঞানবিহীন অপত্যস্নেহ ব্যর্থ হইয়াছে কিন্তু শিশুর স্বভাব পরিবর্তিত হয় নাই। শিশুকে গড়িয়া তোলার চিন্তা বিশেষ শিক্ষা এবং কৌশলসাপেক্ষ।
তিনি আরও বলিয়াছেন :
নার্সারি স্কুলের একটি বড় সুফল হইল এই যে শিশুরা বর্তমানে প্রচলিত পাঠ্যক্রম দ্রুত শেষ করিতে পারিবে। প্রাথমিক বিদালয়ে ছাত্র-জীবনের অর্ধেক কিংবা দুই-তৃতীয়াংশ কাল শেষ হইতেই তাহারা উচ্চতর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্য হইয়া উঠিবে! … মোট কথা, পাঁচ বৎসর বয়স পর্যন্ত হওয়া শিশুকে কেবল তদারক করার আখড়া না হইয়া নার্সারি স্কুল যদি প্রকৃতই শিশুর দৈহিক ও মানসিক শিক্ষার নিকেতন হয় তবে অল্প দিনেই ইহা আমাদের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন আনয়ন করিবে। ইহা নিম্নপ্রাথমিক বিদ্যালয় হইতে শুরু করিয়া সকল প্রকার শিক্ষায়তন ছাত্রদের জ্ঞান ও সংস্কৃতির মান উন্নত করিবে। বর্তমানে যে রোগ ও দুঃখ-দুর্দশার প্রকোপের ফলে শিক্ষক অপেক্ষা চিকিৎসকের প্রয়োজন বেশি অনুভূত হয় তাহা দূর করা সম্ভবপর হইবে। বর্তমানের বিদ্যালয় ইহার বিরাট প্রাচীর, প্রকাণ্ড প্রবেশ পথ, শক্ত খেলার মাঠ, আলোহীন বড় বড় শ্রেণিকক্ষ তখন দানবীয় ভবন বলিয়া মনে হইবে। নার্সারি স্কুল শিক্ষকদের প্রতিভা বিকাশের এক নূতন সুযোগ আনিয়া দিবে।
বাল্যের চরিত্রগঠনের শিক্ষা এবং পরবর্তীকালে বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষাদানে এই দুই অবস্থার মধ্যবর্তীকালীন শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে নার্সারি স্কুল। নার্সারি স্কুল এই উভয় দায়িত্ব পালন করে। শিশুর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাদান কার্যে প্রাধান্য দেওয়া হয়; এইরূপ বিদ্যায়তনেই শ্রীমতী মন্তেসরি তাঁহার শিক্ষাপ্রণালীর সার্থক প্রয়োগ করিয়াছিলেন। রোমে একটি বিরাট বাড়ির একটি বড় কক্ষে তিনি তিন হইতে সাত বৎসর বয়সের শিশুদের এক শিশুনিকেতন পরিচালনা করেন। ডেপ্টফোর্ডে যেমন তেমনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরাই আসিত : ডেপ্টফোর্ডের মত এখানেও দেখা গিয়েছিল যে বাল্যকাল হইতে যত্ন লইলে শিশুদিগকে গৃহের কুফল এবং অসুবিধা হইতে রক্ষা করিয়া তাহাদের যথোপযুক্ত দৈহিক ও মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটানো সম্ভবপর।
ইহা বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, (সেগুই-এর পর হইতে), শিশুদের শিক্ষায় যাহা কিছু উন্নতি হইয়াছে তাহা সবই হইয়াছে বুদ্ধিহীন এবং দুর্বলচিত্ত লোকদের পরীক্ষার ফল হইতে। জড়প্রকৃতি, দুর্বল মানসিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদিগকেও মানসিক শক্তির বিষয়ে শিশু বলা যাইতে পারে। ইহাদের ক্ষীণ মননশক্তি বা বৃদ্ধিহীনতা দূষণীয় মনে করা হইত না বা শাস্তি দিয়া ইহা দূর করা যাইবে এমন ধারণাও করা হইত না। এই জন্যেই ইহাদের বৈশিষ্ট্য এবং প্রতিকারের উপায় চিন্তা করা হইয়াছিল। ডক্টর আর্নল্ড যেমন করিতেন যে, চাবুক মারাই কুঁড়েমি দূর করার একমাত্র ঔষধ; তাঁহার পরবর্তীকালের শিক্ষাবিদগণ সেইরূপ মনে করিতেন না। এইজন্য ক্রোধের বশবর্তী হইয়া নয়, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লইয়াই তাঁহারা এইরূপ ছাত্রদের অবস্থা পর্যালোচনা করিতেন; কেহ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারিলে ক্রুব্ধ শিক্ষক তাহাদিগকে বলিতেন না যে, বুদ্ধিহীনতার জন্য তাহাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। বয়স্ক ব্যক্তিরা যদি শিশুদের প্রতি ধমক ও উপদেশ বর্ষণের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করিতে পারিত তবে দুর্বল মননশক্তিসম্পন্ন লোকদিগকে পরীক্ষা না করিয়া তাহারা বুদ্ধিহীন শিশুদের শিক্ষার উপায় নির্ধারণ করিতে সক্ষম হইত। নৈতিক দায়িত্ব সম্বন্ধে ধারণাই বহু অন্যায়ের জন্য দায়ী। দুইটি বালকের কথা কল্পনা করুন–একজন সৌভাগ্যক্রমে নার্সারি স্কুলে শিক্ষা পাইয়াছে। অন্যজন বস্তিজীবনের মধ্যে লালিতপালিত হইয়াছে। দ্বিতীয় বালকের যদি দৈহিক এবং মানসিক বিকাশ প্রথম বালকের তুলনায় হীনতর হয় তবে সে কি নিজেই ইহার জন্য নৈতিক দিক দিয়া দায়ী? সেই অজ্ঞতা ও উদাসীনতার জন্য তাহার পিতামাতা তাহার যথোপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে পারিল না। সেই তাহার পিতামাতা কি সেই কারণে নৈতিকভাবে দায়ী? পাবলিক স্কুলে পড়িবার সময় ধনীব্যক্তিদের মনে স্বার্থপরতা এবং কতকগুলি ভ্রান্ত ধারণা সঞ্চারিত করা হয়। আর ইহার ফলেই তাহারা নিজেদের একটি পৃথক সমাজ সৃষ্টি করিয়া সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে ভোগবিলাসে মগ্ন হয়। এইজন্য ধনীরাই কি নৈতিকভাবে দায়ী? সকলেই অবস্থার দাস; বাল্যে তাহাদের চরিত্রের বুনন শুরু হইয়াছে, স্কুলে তাহাদের বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশ লাভ করে নাই। ইহার জন্যে নৈতিক দায়িত্ব তাহাদের ঘাড়ে চাপাইয়া কোনো লাভ নাই; তাহারা অন্যের মতো চরিত্রগঠনের পক্ষে অনুকূল বাল্যকাল এবং বুদ্ধি বিকাশের পক্ষে অনুকূল বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করিতে না পারিলে তাহাদের দুর্ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়া অথবা তাহাদিগকে তিরস্কারে লাঞ্ছিত করিয়া কোনো উপকার হইবে না।
