পিতামাতার পক্ষে শিশুদিগকে মানুষ করার উপযুক্ত নূতন জ্ঞান ও কৌশল সম্বন্ধে জ্ঞান বা সেইগুলি প্রয়োগ করার অবসর নাও থাকিতে পারে। অশিক্ষিত পিতামাতার বেলায় এ প্রশ্ন উঠে না; প্রকৃত উপায় তাহারা জানেন না, বুঝাইয়া দিলেও বিশ্বাস করেন না। আমি সমুদ্রের ধারে একটি কৃষিপ্রধান জেলায় বাস করি; এইখানে টাটকা খাদ্যদ্রব্য সহজে মেলে, শীত বা গ্রীষ্মের আধিক্যও বেশি নয়। শিশুদের স্বাস্থ্যের পক্ষে চমৎকার বলিয়াই আমি এই স্থান পছন্দ করিয়াছিলাম। তথাপি এখানকার কৃষক এবং দোকানিদের প্রায় সব ছেলেমেয়েদের মুখ দেখি রোগা ফ্যাকাসে, কাজকর্মে তাহারা অলস, কেবল খেলাধুলায় পটু। সমুদ্রের তটে তাহারা কখনও যায় না কারণ তাহাদের ধারণা পা ভিজানো স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ানক খারাপ। গৃহের বাহির হইলেই তাহারা পশমের মোটা কোট পরিয়া থাকে, এমনকি গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের দিনেও ইহার ব্যতিক্রম নাই। খেলার সময় যদি হইচই করে তাহাদের আচরণ দ্র করার চেষ্টা করা হয়। অনেক রাত্রি পর্যন্ত তাহারা বাড়ির বাহিরে থাকিলে কোনো আপত্তি করা হয় না, খাদ্যের ব্যাপারে কোনো বাধা নিষেধ নাই; বয়স্ক ব্যক্তিদের উপযোগী ছোটদের পক্ষে অপকারী সব রকম খাদ্যই তাহারা গ্রহণ করে। তাহাদের পিতামাতারা বুঝিতে পারে না তাহাদের ছেলেমেয়েরা ঠাণ্ডায় এতদিন মরিয়া যায় নাই কেন। কিন্তু চোখের সম্মুখে উদাহরণ দেখিয়াও তাহারা বিশ্বাস করে না যে, তাহাদের সন্তান মানুষ-করার প্রণালীতে অনেক গলদ আছে। তাহারা দরিদ্র নয়, সন্তানের প্রতি স্নেহহীনও নয় কিন্তু কুশিক্ষার ফলে নিদারুণভাবে অজ্ঞ। শহরবাসী গরিব ও কর্মক্লান্ত পিতামাতার পক্ষে এইরূপ অশিক্ষার কুফল আরও বেশি। কিন্তু যে পিতামাতা উচ্চশিক্ষিত, সন্তানের প্রতি কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন এবং অতিরিক্ত কর্মব্যস্ত নন তাঁহারাও শিশুদের পক্ষে যে পরিমাণ যত্ন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করা দরকার এবং যে পরিমাণ শিক্ষা তাহারা নার্সারি স্কুলে পায় সেইরূপ বাড়িতে দিতে পারে না। শিশুদের ক্রমবিকাশের অনুকূল যে সর্বপ্রধান ব্যবস্থা অর্থাৎ সমবয়সী শিশুদের সঙ্গ, তাহা বাড়িতে দুর্লভ। পরিবার যদি ছোট হয় আজকাল ইহা হইয়াছে রীতি–তবে শিশুরা বয়স্কদের দৃষ্টি বেশি আকর্ষণ করে। প্রায় সর্বদা তাহাদের সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। ইহার ফলে শিশুরা ভেঁপো ও হঁচড়েপাকা হইয়া ওঠে। ইহা ছাড়া অনেক শিশুর সংস্পর্শে আসার ফলে শিশু যে বাস্তক শিক্ষা পায় পিতামাতা তাহা দিতে পারেন না। ধনী ব্যক্তিরাই কেবল-শিশুদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ফাঁকা জায়গা এবং খেলার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করিতে পারেন। কিন্তু ইহারও কুফল আছে। যে শিশুদের এইরূপ বিশেষ বন্দোবস্ত থাকে তাহাদের মনে ইহার জন্য গর্ববোধ হয় এবং তাহারা নিজদিগকে অন্যের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে। করে। নৈতিক শিক্ষা হিসাবে ইহা বড়ই ক্ষতিকর। এইসব কারণে আমার মনে হয়, কাছাকাছি নার্সারি স্কুল থাকিলে অবস্থাপন্ন এবং উচ্চশিক্ষিত পিতামাতাও দুই বৎসর বয়সের সময় হইতেই শিশুকে সেইখানে পাঠাইলে উপকারই পাইবেন।
বর্তমানে পিতামাতার অবস্থানুযায়ী সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিলাতে দুই রকম শিশু-বিদ্যালয় আছে : ফ্রয়বেল স্কুল এবং মন্তেসরি স্কুলে ধনী লোকদের ছেলেমেয়েদের জন্য; গরিব লোকদের সন্তান-সন্ততির জন্য আছে অল্প সংখ্যক নার্সারি স্কুল। নার্সারি স্কুলগুলির জন্য স্ত্রীমতী ম্যাকমিলানের বিবরণ সন্তানের মঙ্গলকামী প্রত্যেক ব্যক্তিরই পড়া উচিত। আমার মনে হয় ধনীব্যক্তির ছেলেমেয়েদের জন্য পরিচালিত কোনো-স্কুলই শ্ৰীমতী ম্যাকমিলানের স্কুলের মতো এত ভালো নয়, কারণ এইখানে ছাত্রসংখ্যা বেশি; তাহা ছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকগণ যেমন অল্পতেই হইচই করিয়া শিক্ষককে বিব্রত করিয়া তোলেন এইখানে সেইরূপ হয় না। শ্ৰীমতী ম্যাকমিলান সম্ভবপর হইলে শিশুকে এক বছর হইতে সাত বৎসর পর্যন্ত তাঁহার স্কুলে রাখেন যদিও শিক্ষাকর্তৃপক্ষ শিশুদিগকে পাঁচ বৎসর বয়সে সাধারণ প্রাথমিক স্কুলে পাঠাইবার পক্ষপাতী। শিশুরা সকাল আটটায় স্কুলে আসে এবং সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত থাকে; তাহারা সকলেই স্কুলের খাবার খায়। যতক্ষণ সম্ভব তাহারা ঘরের বাহিরেই কাটায়। ঘরেও প্রচুর মুক্ত বাতাসের বন্দোবস্ত আছে। শিশুকে ভর্তি করার পূর্বে তাহাকে ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়া দেখা এবং কোনো অসুখ থাকিলে চিকিৎসা করিয়া আরোগ্য করানো হয়। অতি অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হইলেও ভর্তির পর সাধারণত সুস্থ থাকে। স্কুলে একটি বড় মনোরম উদ্যান আছে; এইখানে অনেক সময় আনন্দে খেলাধুলায় অতিবাহিত হয়। মন্তেসরি প্রণালীতে শিক্ষাদান করা হইয়া থাকে। দুপুরে খাওয়ার পর সকল শিশু ঘুমাইয়া পড়ে। যদিও রাত্রিতে এবং রবিবারে শিশুদিগকে নিরানন্দ জীর্ণ বাসগৃহে অনেক সময় মাতাল পিতামাতার সঙ্গে একই কুঠুরিতে ঘুমাইতে হয় তবে দেহে এবং বুদ্ধিতে এই শিশুগণ মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের মতোই যোগ্যতা অর্জন করে। শ্রীমতী ম্যাকমিলান তাহার বিদ্যালয়ের সাত বৎসর বয়স্ক বালক-বালিকার কথা প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন :
তাহারা প্রায় সকলেই দীর্ঘ ও ঋজু। সকলেই দীর্ঘ না হইলেও ঋজু সবাই; বেশির ভাগেরই দেহ সুগঠিত, পরিষ্কার ত্বক, উজ্জ্বল চোখ এবং রেশম কোমল চুল। উচ্চ মধ্যবিত্তশ্রেণির সাধারণ ছেলেমেয়ে অপেক্ষা ইহারা প্রায় সকলেই উন্নত ধরনের। এই গেল দৈহিক আকৃতি ও গঠনের কথা। মানসিক দিক দিয়াও ইহারা তীক্ষ্ণ অনুভূতি-সম্পন্ন, অপরের সঙ্গে মিলিতে ইচ্ছুক, নানা কাজের ভিতর দিয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করিতে উৎসুক। ভালো লিখিতে পারে এবং অনায়াসে বলিতে পারে। এইরূপ যে-কোনো ছাত্র ভালো ইংরাজি এবং ফরাসি ভাষাও বলে। সে কেবল নিজের যত্ন নিজে লইতেই শেখে নাই, কয়েক বছর ধরিয়া অন্যান্য ছোট ছেলেমেয়েকে সাহায্য করিয়াছে; সে গণিত পারে, ওজন করিতে পারে, নকশা আঁকিতে পারে; বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি তাহার হইয়াছে। তাহার প্রথম কয়েক বৎসর শান্ত ও প্রীতিপূর্ণ পরিবেশে কৌতুক ও আমাদের ভিতর দিয়া অতিবাহিত হইয়াছে, শেষের দুই বৎসর হইয়াছে নানা গবেষণা এবং আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাপূর্ণ। বাগান সম্বন্ধে তার ধারণা হইয়াছে; সে নিজে চারগাছ পুঁতিয়াছে, জলসিঞ্চন করিয়াছে, গাছপালা এবং প্রাণীর যত্ন পরিচর্যা করিয়াছে। সাত বৎসর বয়সের বালক-বালিকা নাচিতে পারে, গান করিতে পারে এবং অনেক খেলা জানে। এই রকম হাজার হাজার ছেলেমেয়ে নিম্ন প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির জন্য উপস্থিত হইবে। ইহাদিগকে লইয়া কি করা যায়? আমি প্রথমেই উল্লেখ করিতে চাই যে, সমাজের নিম্নস্তর হইতে এইরূপ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সবল সুস্থ বালক বালিকা স্কুলে ভিড় করিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের কাজ বহুলাংশে পরিবর্তিত হইয়া যাইবে। হয় নার্সারি স্কুল ব্যর্থ হইয়া একটি বাজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইবে, আর না হয় ইহার প্রভাব শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও পড়িবে। ইহা নূতন ধরনের শিক্ষার্থীদল প্রস্তুত করিবে এবং দুই দিন পরেই হউক আর পরবর্তীকালেই হউক শুধু সব রকম স্কুলই নয় সামাজিক জীবন, শাসনব্যবস্থা, আইনকানুন এবং আমাদের সহিত অন্য জাতির সম্পর্কের উপর প্রভাব বিস্তার করিবে।
