যুবক-যুবতিদিগকে বুঝানো দরকার যে, শিশুর জন্মদান একটি গুরুতর ব্যাপার এবং সন্তানের স্বাস্থ্য ও সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিধানের সম্ভাবনা আছে কিনা তাহা বিবেচনা করিয়া সন্তানোৎপাদন সর্বদাই সমর্থনযোগ্য; এমনকি ঘন ঘন বেশিসংখ্যক সন্তান হওয়ার ফলে প্রসূতির স্বাস্থ্য যদি নষ্ট হইয়া যায়, সন্তানগণ যদি রুগ্ন এবং বিকৃত মস্তিষ্ক হয়, সকলের যদি যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যের সংস্থান না-ও হয় তবু ইহাতে দোষ নাই। হৃদয়হীন অদৃষ্টবাদীরাই কেবল এই অভিমত পোষণ করে; তাহাদের ধারণা মানুষের দুঃখদৈন্য অসম্মান ভগবানের মহিমার পরিচালক। শিশুদের প্রতি যাহাদের প্রীতি আছে, অসহায়ের উপর দুঃখের বোঝা যাহারা চাপাইয়া দিতে চান না তাঁহারাই এই নিষ্ঠুর নীতির বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হন। ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিশুদের জীবনের প্রতি মমত্ববোধ নৈতিক মিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ বলিয়া বিবেচিত হওয়া উচিত।
মেয়েদিগকে একদিন সন্তানের জননী হইতে হইবে; এইজন্য তাহাদের পক্ষে তকালে প্রয়োজন লাগিতে পারে এমন কতক জ্ঞান মোটামুটি অর্জন করা উচিত। অবশ্য বালক ও বালিকা উভয়কেই শারীরবিদ্রা ও স্বাস্থ্যনীতি কিছু কিছু শিখিতে হইবে। কিশোর-কিশোরীকে ইহা স্পষ্টভাবে বুঝাইতে হইবে যে অপত্যস্নেহ ব্যতীত কেহ ভালো পিতামাতা হইতে পারে না; শুধু তাহাই নহে, অপত্যস্নেহের সঙ্গে অনেকখানি জ্ঞানের প্রয়োজন। শিশুর সহিত আচরণের প্রবৃত্তি ব্যতীত জ্ঞান এবং জ্ঞান ব্যতীত প্রবৃত্তি উভয়ই সমান অকেজো। জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা যতই অনুভূত হইবে ততই বেশিসংখ্যক বুদ্ধিমতী স্ত্রীলোক মাতৃত্বের প্রতি আকৃষ্ট হইবে। বর্তমানে অনেক উচ্চশিক্ষিত মহিলা ইহাকে অবজ্ঞা করেন; তাঁহাদের ধারণা বুদ্ধি প্রয়োগের সুযোগ ইহার ভিতর নাই। বুদ্ধিমতী উচ্চশিক্ষিতা মহিলাদের পক্ষে মাতৃত্ব লাভ হইতে বিরত থাকা সমাজের পক্ষে বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। কারণ এ দিকে তাঁহাদের চিন্তা নিয়োজিত হইলে তাহারা উৎকৃষ্ট জননী হইতে পারেন। যৌনপ্রেম ও হিংসা : যৌন ভালোবাসা সম্বন্ধে শিক্ষা-প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয়ে বিশেষ অবহিত হওয়া প্রয়োজন। প্রেমের ব্যাপারে জোর জবরদস্তি বা হিংসা সুখবহ হয় না; বরং দুঃখ ও অশান্তি সৃষ্টি করে। স্থূলপ্রেম যখন মূর্ত হইয়া ওঠে অর্থাৎ প্রেমের বস্তুর উপর যখন অধিকার বিস্তারের বাসনা জাগে তখনই প্রেমের স্বাধীনতা লোপ পায়, ব্যক্তিত্বের অবসান ঘটে; যেখানে এইরূপ কড়াকাড়ি নাই, সেইখানে আছে নিবিড় আনন্দের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। পূর্ববর্তী যুগে পিতামাতা সন্তানদের নিকট হইতে কর্তব্য হিসাবে ভালোবাসা আদায় করিতে চেষ্টা করিয়া সন্তান-সন্ততির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক তিক্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন। এখনও অনেক স্বামী-স্ত্রী এই একই প্রকার ভুল পন্থা অবলম্বন করিয়া পরস্পরের মধ্যেকার প্রীতির সম্পর্ক ধ্বংস করিয়া ফেলেন। ভালোবাসাকে কর্তব্য বলিয়া গণ্য করা যায় না, কেননা ইহা ইচ্ছার বশ নহে। ইহা একটি শ্রেষ্ঠ স্বর্গীয় দান। ইহা মুক্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত হইলে সৌন্দর্য ও আনন্দের শতদল বিকশিত করিয়া তোলে কিন্তু খাঁচায় ভরিয়া রাখিলে প্রেমের অপমৃত্যু ঘটে। এখানেও ভয় শত্রু। জীবনে আনন্দের উপাদান হারাইবার ভয়ে যে ব্যক্তি ভীত হয় এবং ইহাকে আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়াইয়া ধরিতে চেষ্টা করে তাহার ভাগ্যে কখনও সুখ প্রাপ্তি ঘটে না। অন্যান্য ব্যাপারে যেমন, যৌনপ্রেমের ব্যাপারেও তেমনই নির্ভীকতাই বুদ্ধি ও বিজ্ঞতার মূল।
১৩. নার্সারি স্কুল
কিরূপ অভ্যাস গঠিত হইলে তাহা শিশুর পক্ষে সুখদায়ক এবং তাহার পরবর্তী জীবনে প্রয়োজনীয় হইতে পারে সে সম্বন্ধে আগের অধ্যায়গুলিতে আলোচনা করা হইয়াছে। কিন্তু এই সদভ্যাস গঠনের শিক্ষা পিতামাতা দিবেন কিংবা ইহার জন্য নির্ধারিত কোনো বিদ্যালয় থাকিবে সেই প্রশ্ন আলোচিত হয় নাই। আমার মনে হয় কেবলমাত্র দরিদ্র, অশিক্ষিত এবং অতিরিক্ত কর্মভার প্রপীড়িত জনক-জননীর সন্তানদের জন্যই নয়, সকল শিশুদের জন্যই বিশেষ করিয়া শহরের শিশুদের জন্য নার্সারি স্কুল বা শিশুপালনাগার একান্ত আবশ্যক। আমি বিশ্বাস করি যে, যে কোনো অবস্থাপন্ন লোকের পুত্রকন্যা অপেক্ষা ডেপ্টফোর্ডে [Deptford] শ্রীমতী ম্যাকমিলান কর্তৃক পরিচালিত নার্সারি স্কুলের শিশুরা ভালো শিক্ষা পাইতেছে। এইরূপ সুশিক্ষার ব্যবস্থা ধনী-দরিদ্র সকল শিশুর জন্যই প্রসারিত হউক, ইহাই আমি কামনা করি। কোনো একটি বিশেষ নার্সারি স্কুলের বিষয় বর্ণনা করার পূর্বে কি কি কারণে এরূপ বিদ্যালয় বাঞ্ছনীয় তাহা আলোচনা করা যাক।
প্রথমেই বলা যায়–শিশুর দৈহিক স্বাস্থ্য ও মানসিক গুণগুলি বিকাশের পক্ষে শৈশবকাল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর দেহ ও মনের বিকাশ পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত। উদাহরণস্বরূপ উল্লখ করা যায় : ভয় শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের ত্রুটির কারণ হইয়া দাঁড়ায় এবং দোষপূর্ণ শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস নানাপ্রকার রোগ সৃষ্টি করে। ভয় মানসিক ব্যাপার কিন্তু শিশুর দেহের উপরও ইহার প্রক্রিয়া রহিয়াছে। এইরূপ পরস্পরাবদ্ধ সম্বন্ধ এত বেশি যে, চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছুটা জ্ঞান ব্যতীত শিশুর চরিত্রগঠনে আশানুরূপ ফললাভ সম্ভবপর নয়। তেমনই শিশুর মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান না থাকিলে কেহ শিশুকে স্বাস্থ্যবান করিয়া গড়িয়া তোলার আশাও করিতে পারেন না। শিশুর দেহ ও মন উভয়দিকের পুষ্টিসাধনের জন্য যেরূপ জ্ঞান প্রয়োজনীয় তাহার অধিকাংশই নূতন; প্রাচীন চিরাচরিত প্রথার সহিত ইহাদের মিল নাই। উদাহরণস্বরূপ শিশুকে শৃঙ্খলা মানিয়া চলিতে অভ্যাস করানোর প্রশ্নটি ধরুন, শিশুর সহিত কোনো দ্বন্দ্বে অর্থাৎ আপনি তাহাকে যেরূপভাবে চলিতে, যেরূপ আচরণ করিতে বলেন তাহা যদি সে না মানিয়া চলে এইরূপ অবস্থার প্রধান নীতি হইল : আপনি নত হইবেন না বা পরাজয় স্বীকার করিবেন না কিন্তু শিশুকে শাস্তি দিয়া বাধ্য করিতে বা জোরজবরদস্তি করিতে চেষ্টাও করিবেন না। সাধারণ পিতামাতা ইহার। বিপরীত পন্থাই গ্রহণ করেন; নির্ঝঞ্ঝাট ও শান্ত জীবন কামনা করিয়া অনেক পিতামাতা পুত্রকন্যার সঙ্গে এরূপ কোনো দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হন না, আবার কখনও বা শিশুদের ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হইয়া শাস্তি দিয়া তাকেন। এইরূপ ক্ষেত্রে কৃতকার্য হইতে হইলে পিতামাতার চরিত্রেও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার। তাহা হইল ধৈর্য এবং নীরবে প্রভাব বিস্তার করার মতো চারিত্রিক শক্তি। এই তো গেল শিশুর ক্রমবিকাশ ব্যাপারে অভিভাবকের মনস্তত্ত্বসম্মত আচরণের কথা। এইবার ধরুন শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষে মুক্ত বায়ুর প্রভাবের কথা। বুদ্ধি প্রয়োগ এবং সতর্কতা অবলম্বন করিলে দিবারাত্রি সর্বদাই মুক্ত বাতাস এবং কম পোশাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত থাকা শিশুর স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী কিন্তু সতর্কতা এবং বুদ্ধির অভাবে হঠাৎ ঠাণ্ডা লাগার ফলে শিশুর অপকার হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
