যদি কোনো পরিবারের শিশুর অন্য বালকদের খারাপ সঙ্গ হইতে যৌনজ্ঞান শিক্ষার কোনো আশঙ্কা না থাকে তবে যতদিন সে স্বাভাবিক কৌতূহলের বশে এই সম্বন্ধে প্রশ্ন না করে ততদিন অপেক্ষা করা চলে। কিন্তু যৌবনাগমের পূর্বেই তাহাকে এ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান দিতে হইবে। ইহা অবশ্য করণীয়। যৌবনারম্ভে যে দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন আসে যে সম্বন্ধে বালক-বালিকাকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ করিয়া রাখিলে তাহাদের উপর এক রকম নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়। যৌবন-সূচনায় কিশোরী অকস্মাৎ যে দৈহিক পরিবর্তনের সম্মুখিন হয় সে সম্পর্কে আগে হইতে তাহাকে অবহিত না করিলে কোনো কঠিন রোগে আক্রান্ত হইয়াছে বলিয়া সে অত্যন্ত ভীত হইয়া পড়িতে পারে। ইহা ছাড়া যৌনবিষয়টি কিশোরদের কাছে এমন উন্মাদনাকর যে, শৈশবে এ বিষয়ে আলোচনা তাহারা যেরূপ বিজ্ঞানসম্মত মনোভাবের সহিত গ্রহণ করিত, যৌবনের রঙিন আবেশ দেহমনে ছড়াইয়া পড়িলে আর তেমনভাবে পারে না। কাজেই যৌনজীবন সম্বন্ধে কুৎসিত আলোচনা করার সম্ভাবনা বাদ দিলেও বালক বা বালিকাকে যৌবনারম্ভের পূর্বেই যৌন কাজের প্রকৃতি সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়া উচিত।
কখন শিক্ষা দিতে হইবে : যৌবনাগমের কতদিন পূর্বে এই শিক্ষা দেওয়া তাহা কতকগুলি বিষয়ের উপর নির্ভর করিবে। অনুসন্ধিৎসু এবং সক্রিয় বুদ্ধিসম্পন্ন শিশুকে জড়-প্রকৃতির শিশু অপেক্ষা পূর্বে এই শিক্ষা দিতে হইবে। কারণ সহজেই অনুমান করা যায়। অনুসন্ধিৎসু বালকের কৌতূহলের অন্ত নাই; কৌতূহলের বশবর্তী হইয়াই সে এইদিকে অল্পবুদ্ধি বালকের তুলনায় আগে আকৃষ্ট হইবে। কখনও কোনো অবস্থাতেই শিশুর কৌতূহল অপরিতৃপ্ত রাখা উচিত হইবে না। শিশু বয়সে যত ছোটই হউক, সে যদি জানিতে চায় তাহার কৌতূহল মিটাইতেই হইবে। কিন্তু সে যদি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া কোনো প্রশ্ন না করে তবু পাছে সে কুসংসর্গ হইতে খারাপভাবে কিছু জানিয়া ফেলে, সে দোষ নিবারণের জন্য দশ বৎসর বয়সের পূর্বেই তাহাকে যৌনজীবন সম্বন্ধে শিক্ষা দিতে হইবে। এইরূপ ক্ষেত্রে গাছপালার বংশ বৃদ্ধি ও প্রাণীর প্রজনন সম্বন্ধে আলোচনার ভিতর দিয়া স্বাভাবিকভাবে তাহার কৌতূহল উদ্দীপ্ত করা বাঞ্ছনীয়। এইজন্য কোনোরূপ আড়ষ্টভাব বা গুরুগম্ভীর ভূমিকার প্রয়োজন নাই, খানিক কাশিয়া গলা পরিষ্কার করিয়া লইয়া শোন খোকন, এ বয়সে তোমার যে বিষয়টি জানা বিশেষ প্রয়োজন তাই এখন বলছি এই ধরনের মুখবন্ধসহ প্রসঙ্গ উত্থাপনের আবশ্যকতা নাই। অতি সাধারণভাবে দৈনন্দিন ব্যাপারের প্রসঙ্গ তুলিতে হইবে। এই জন্যই প্রশ্নের উত্তর হিসাবে ইহার আলোচনা হইলেই ভালো হয়।
বালক ও বালিকাদের প্রতি যে একইরূপ আচরণ করা দরকার এবং তাহাদিগকে যে সমভাবে শিক্ষা দেওা উচিত সে সম্বন্ধে বর্তমান যুগে কোনো যুক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না। আমাদের বাল্যকালে ভালোভাবে লালিত-পালিত মেয়ের পক্ষে বিবাহ সম্বন্ধে কোনো কিছু না জানিয়াও বিবাহ দেওয়া রেওয়াজ ছিল; স্বামীর নিকট হইতে সে যৌন-জীবন সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করিত। কিন্তু অধুনাকালে এইরূপ ঘটিতে শুনি নাই। আমার মনে হয়, এখন অধিকাংশ লোকই মনে করে অজ্ঞতার উপর যে গুণের ভিত্তি, তাহার কোনো মূল্য নাই এবং বালিকাদেরও বালকের মতো জ্ঞানলাভের অধিকার আছে। যাহারা ইহা মানেন না তাহারা হয়তো এ পুস্তক পাঠ করিবেন না; কাজেই তাহাদের সঙ্গে কোনো যুক্তি-তর্কের অবতারণার প্রশ্ন উঠে না।
যৌননীতিজ্ঞানের শিক্ষা আমি সংকীর্ণ অর্থে আলোচনা করিতে চাহি না। এই সম্বন্ধে বিভিন্ন অভিমত আছে। খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের পার্থক্য, মধ্যযুগীয়দের সঙ্গে স্বাধীন চিন্তাবাদীদের পার্থক্য রহিয়াছে। পিতামাতা যে যৌননীতিবিজ্ঞানে বিশ্বাস করেন, নিজেদের সন্তানদিগকেও তাঁহারা সেইমতো শিক্ষা দিতে চান; এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করা আমি পছন্দ করি না। কিন্তু এ সব জটিল বিতর্কসংকুল প্রশ্ন বাদ দিলেও সকলের পক্ষেই প্রযোজ্য এমন বিষয় আছে।
যৌনবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যনীতি : প্রথমেই বলা যাইতে পারে স্বাস্থ্যনীতির কথা। যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার সম্মুখিন হওয়ার পূর্বেই যুবকদের এ সম্বন্ধে জানা উচিত। তাহাদিগকে এ সম্বন্ধে যথাযথ শিক্ষা দিতে হইবে; কতক লোক নীতি-উপদেশ দানের উদ্দেশ্যে যৌনব্যাধির কথা অতিরঞ্জিত করিয়া প্রচার করিয়া থাকে; এইরূপ করা অনাবশ্যক। কেমন করিয়া যৌনরোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং কেমন করিয়াই বা ইহা হইতে আরোগ্য লাভ করা যায় তাহাও শিখাইতে হইবে। কেবল সপ্রকৃতির সংযত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাদান করিয়া অন্য সকলের দুর্ভোগকে পাপের উপযুক্ত শাস্তি মনে করা ভুল। তাহা হইলে মোটর চালনায় যে ব্যক্তি আহত হইয়াছে তাহাকেও কোনো প্রকার সাহায্য না করিতে পারি এই বলিয়া যে, অসতর্ক অবস্থায় মোটর চালানো অন্যায়, অতএব পাপ। ইহা ছাড়া যৌনব্যাধির ক্ষেত্রে যেমন, মোটর চালানোর ক্ষেত্রেও তেমনি নিরপরাধ ব্যক্তির উপর শাস্তি পড়িতে পারে; একজন অসতর্ক মোটর চালক যদি কোনো লোককে চাপা দেয় তাহাতে যেমন আহত ব্যক্তির কোনও অপরাধ নাই, তেমনই কোনো শিশু যদি সিফিলিস রোগ লইয়াই জন্মগ্রহণ করে তবে তাহাকেও দোষী বা পাপী মনে করা উচিত নহে।
