যৌন বিষয় সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর : প্রশ্নের উত্তরদান যৌন শিক্ষার একটি প্রধান অংশ। এই প্রসঙ্গে দুইটি নিয়ম মানিয়া চলিতে হইবে। প্রথমে সর্বদা সত্য উত্তর দিন; দ্বিতীয় যৌনজ্ঞানকে অন্য যে-কোনও জ্ঞানের মতো বিবেচনা করুন। যদি কোনও মিশু আপনাকে চন্দ্র, সূর্য, মেঘ, মোটরগাড়ি বা ইঞ্জিন সম্বন্ধে বুদ্ধির পরিচায়ক কোনও প্রশ্ন করে তবে আপনি খুশি হন এবং সে যতটুকু বুঝিতে পারে সেই অনুপাতে প্রশ্নের উত্তর দিয়া থাকেন। কিন্তু সে যদি যৌনবিষয় সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করে আপনি হয়তো বলিবেন, চুপ চুপ। আপনি যদি জানেন যে, এরূপ বলা উচিত নহে তবু হয়তো সংক্ষেপে এবং শুষ্কভাবে ইহার উত্তর দিবেন; আপনার আচরণে বিব্রত হওয়ার ভাব প্রকাশ পাইতে পারে, শিশু তৎক্ষণাৎ আপনার আচরণের সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ করিবে এবং বুঝিবে সে প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে কোনো কিছু গুপ্ত রহস্য জড়িত আছে। রহস্যাবৃত বিষয়ের প্রতিই শিশুর কৌতূহল বেশি জাগ্রত হয়। যৌন বাসনা ও যৌন-জীবন সম্পর্কেও এইভাবে শিশু আকৃষ্ট হইতে পারে। কখনও যেন মনে করিবেন না যে, যৌন আচরণে ভীতিকর অন্যায় এবং অপবিত্র কোনো ভাব আছে। আপনি যদি এইরূপ মনে করেন শিশু ইহা বুঝিতে পারিবে, সে তবে স্বভাবতই ভাবিবে যে, তাহার পিতামাতার সম্পর্কের মধ্যে গোপনীয়, নোংরা কোনো রকম আচরণ আছে। পরে সে সিদ্বান্ত করিবে যে, জনক-জননী তাহার জন্মদান ক্রিয়াকে অশোভন ও কুৎসিত বলিয়া মনে করেন। ইহার ফলে সে নিজেকে সর্বদা অপবিত্র এবং পাপকর্মের ফল বলিয়া বোধ করিতে থাকিবে। এইরূপ ভাব বিদ্যমান থাকিলে কিশোর-কিশোরীর, এমনকি যুবক-যুবতির পর্যন্ত প্রবৃত্তি এবং মানসিক আবেগগুলি সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশ প্রায় অসম্ভব হইয়া উঠে।
শিশুর যখন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার মতো বয়স হইয়াছে যেমন ধরুন তিন বৎসর বয়সের পর–তখন যদি তাহার ভাই বা বোন জন্মগ্রহণ করে তবে তাহাকে বলুন যে, শিশুটি তাহার মায়ের দেহের মধ্যে ধীরে ধীরে বাড়িয়া উঠিয়াছে, ঠিক এইভাবে সে নিজেও যে বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাও বলুন। বালককে ছোট্ট শিশুর মাতৃস্তন্য পান করা দেখিতে দিন; তাহাকে বলুন সে নিজেও এমনইভাবে স্তন্যপান করিয়াছিল। যৌনজীবন সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের মতো এ বিষয়ও শিশুকে সহজ সরলভাবে বুঝাইয়া দিবেন। ইহার মধ্যে গুরুগাম্ভীর্য আনিবার কোনো প্রয়োজন নাই। মাতৃত্বের পবিত্র এবং রহস্যঘন কর্তব্য সম্বন্ধে বড় বড় কথা বলিবার আবশ্যকতা নাই। সমস্ত বিষয়টি হওয়া উচিত সহজ এবং বস্তুনিষ্ঠ।
যে বয়সে শিশুর প্রথম যৌন কৌতূহল জাগ্রত হয় তখন যদি পরিবারে কোনো সন্তানের জন্ম না হয় তাহা হইলেও এ প্রশ্নের অবতারণা করা যায়। তখন বলিতে হয়–তোমার জন্মের পূর্বে এ ঘটনাটি ঘটিয়াছিল। ইহা হইতেই প্রশ্নোত্তর শুরু হইতে পারে। আমার ছেলের বেলায় দেখি সে যে এক সময় বর্তমান ছিল না তাহা বোঝাই তাহার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। কখন পিরামিড তৈয়ার করা হইয়াছিল বা এই জাতীয় প্রাচীন কোনও কাহিনী বলিতে গেলেই সে জিজ্ঞাসা করে তখন সে কি করিত। যদি বলি–তখন সে জন্মায় নাই, তাহার অস্তিত্ব ছিল না তবে সে বড়ই হতবুদ্ধি হইয়া পড়ে। দুইদিন আগে হউক আর পিছে হউক জন্মানো মানে কি তাহা সে জানিতে চাহিবে; তখন আমরা তাহাকে বলিব।
শিশু যদি পশুপালন ক্ষেত্রে বাস করে তবে সন্তানের জন্মদানের ব্যাপারে পিতার অংশ কি স্বাভাবিক অবস্থায় সে প্রশ্ন তাহার মনে উঠিবে না। কিন্তু শিশু যাহাতে এই জ্ঞান পিতামাতা বা শিক্ষকের নিকট হইতে পায় সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। তাহা না হইলে কুশিক্ষাপ্রাপ্ত কুৎসিত স্বভাবের ছেলেদের নিকট হইতেই সে ইহা শিখিবে। আমার বয়স যখন বারো বৎসর তখন অন্য একটি ছেলে আমাকে কি বুঝাইয়াছিল তাহা আমার স্পষ্ট মনে আছে; সমস্ত বিষয়টি অশ্লীলতাপূর্ণ এবং গোপন হাসিঠাট্টার উপকরণ বলিয়া মনে করা হইত। আমাদের সে যুগের ছেলেদের ইহাই ছিল স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। ইহার ফল হইত যে, অধিকাংশ লোক সারাজীবন ধরিয়া যৌন ব্যাপারটিকে নোংরা হাসিঠাট্টার বিষয় মনে করিত এবং যে স্ত্রীলোক যৌন সংস্পর্শে আসিত তাহারা তাহাদের সন্তানের জননী হইলেও তাহাদিগকে শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিত না। সন্তানের যৌন শিক্ষার ব্যাপারে পিতামাতা অদৃষ্টের উপর নির্ভর করিত, যদিও পুরুষগণ জানিত কিভাবে নিজেরা যৌন সম্পর্কিত প্রথম জ্ঞান লাভ করিয়াছিল! কুসঙ্গ হইতে বালকদের যৌনশিক্ষা লাভ করার ব্যবস্থা কিরূপে যে সুস্থ নীতিবোধ গঠনে সহায়তা করিত তাহা আমি কল্পনা করিতে পারি না। যৌনজীবন স্বাভাবিক, শোভন এবং প্রীতিপদ প্রথম হইতেই শিশুর মনে এই বোধ জন্মাইতে হইবে। ইহার অন্যথা করিলে স্ত্রী এবং পুরুষের সম্পর্ক, পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্ক বিষময় করিয়া তোলা হইবে। পিতামাতা যখন পরস্পরকে ভালোবাসেন এবং সন্তানদিগকে ভালোবাসেন তখন তাঁহাদের মধ্যে যৌনজীবনের মধুর প্রকাশ। পিতামাতার পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের বিষয় বালককে অশ্লীল কিশোরদের নোংরা হাবভাব ও কুৎসিত ইঙ্গিত হইতে শিক্ষা করিতে না দিয়া পিতামাতার নিজেদেরই এ ভার গ্রহণ করা উচিত। ছেলেমেয়ের মনে যদি এই ধারণা জন্মে যে, তাহাদের পিতামাতার যৌনজীবনের সম্পর্ক দূষণীয় গোপন ব্যাপার তবে তাহার ফলও ভাল হয় না।
