যৌনভাব ও ফ্রয়েডির মতবাদ : নানারূপ বাধানিষেধ আরোপ ও ঢাকঢাক-গুড়গুড় ছাড়াও যৌনভাবের একটি বিশেষত্ব এই যে, এই প্রবৃত্তি দেরিতে পরিপক্ক হয়। মনঃসমীক্ষকগণ সত্যই দেখাইয়াছেন যে, শৈশবেও যৌনপ্রবৃত্তি বিদ্যমান থাকে; তবে ইহাদের অভিমতের মধ্যে অনেকখানি অতিরঞ্জন আছে।
যৌন প্রবৃত্তির শিশুসুলভ প্রকাশ বয়স্ক ব্যক্তিদের আচরণ হইতে পৃথক, ইহার বেগও যথেষ্ট কম। বয়স্ক ব্যক্তির মতো যৌন ব্যাপারে লিপ্ত হওয়া শিশুর পক্ষে দৈহিক দিক দিয়াই অসম্ভব। প্রথম যৌবনাগম কিশোর-কিশোরীর মনে এক প্রক্ষোভময় বিষয় আলোড়ন সৃষ্টি করে; পাঠ্য-জীবনের মাঝখানে বয়ঃসন্ধিক্ষণের রঙিন উন্মাদনা স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণের পথে বিঘ্ন উপস্থিত করে; এইগুলি অপসারণ করিয়া সুস্থ স্বাভাবিক জীবন বিকাশের পথে কিশোরকে পরিচালিত করা শিক্ষাব্রতীর বড় সমস্যা হইয়া দাঁড়ায়; এইরূপ সমস্যার অধিকাংশ সম্বন্ধেই কোনো আলোচনার চেষ্টা করিব না; কেবল যৌবনাগমের পূর্বে কি করা কর্তব্য তাহাই হইবে আমার আলোচ্য বিষয়। এই সম্পর্কে শিক্ষা সংস্কারের আবশ্যকতা অত্যন্ত বেশি, বিশেষত বাল্যকালের শিক্ষায়। যদিও ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমার মতের অনৈক্য ঘটিয়াছে তবু আমার মনে হয় একটি বিষয়ে তাঁহারা বিশেষ উপকার সাধন করিয়াছে। তাহারা দেখাইয়াছেন যে, বাল্যে যৌন-সংক্রান্ত ব্যাপারে শিশুদের প্রতি যথাযথ আচরণ না হওয়ার ফলে পরিবর্তীকালে স্নায়বিক বিকলতার উদ্ভব হইয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে তাঁহাদের কাজে যথেষ্ট সুফল প্রদান করিয়াছে কিন্তু এখনও বহু পুঞ্জিভূত কুসংস্কার দূর করা প্রয়োজন। শিশুর যৌনভাব সংক্রান্ত কুসংস্কারগুলি দূর করার একটি প্রধান অন্তরায় হইল তাহার জীবনের প্রথম কয়েক বৎসর তাহার লালন-পালনের ভার সম্পূর্ণ অশিক্ষিত স্ত্রীলোকদের উপর ন্যস্ত করা। ইহার ফলে অনেক ক্ষেত্রে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যাহা সোজাসুজি বর্ণনা করিলে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হইতে হইবে বলিয়া বিশেষত পর্যবেক্ষক পণ্ডিতগণ ঘুরাইয়া ফিরাইয়া তাহার বিবরণ দিয়া থাকেন। মূর্খ পরিচারিকাগণ এই সম্বন্ধে কিছুই জানে না, তাহাদের পক্ষে বিশেষজ্ঞগণের সিদ্ধান্ত বিশ্বাস করার কোনো প্রশ্নই উঠে না।
করমৈথুনঃ শিশুর যৌন সমস্যাগুলির ক্রম অনুসারে আলোচনা করিতে গেলে জননী ও পরিচারিকাকে বিব্রত করে যে সমস্যা তাহা হইল শিশুর করমৈথুন। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণ বলেন যে, দুই হইতে তিন বৎসর বয়সের সকল বালক-বালিকাই এইরূপ করিয়া থাকে এবং কিছুদিন পরে আপনা হইতেই ইহা বন্ধ হইয়া যায়। কখনও কখনও দৈহিক কয়নের ফলে এই বিব্রতকর কাজটি বেশি হয় কিন্তু ঔষধ প্রয়োগ করিয়া ইহার কারণ দূর করা যায়। (কি ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত তাহা আমার বিবেচ্য বিষয় নহে)। কিন্তু এইরূপ কারণ ব্যতিরেকেই সাধারণত শিশুরা করমৈথুন করিয়া থাকে। এই ব্যাপারে অভিভাবকগণ শঙ্কাৰিত হইয়া উঠেন এবং ইহা বন্ধ করিবার জন্য ভীতি প্রদর্শন করিতে থাকেন। কার্যত ভীতি প্রদর্শনে কোনো উপকার হয় না কিন্তু ফল হয় এই যে, ভয় শিশুর মানস স্তরে প্রবেশ করে এবং দমিত হইয়া তাহাই পরে শিশুর জীবনে দুঃস্বপ্ন, স্নায়বিক দুর্বলতা, ভ্রান্ত এবং অহেতুক ভীতিরূপে আত্মপ্রকাশ করে। শিশুর করমৈথুন দূর করার চেষ্টা না করিলেও কোনও ক্ষতি নাই; তাহার স্বাস্থ্য এবং চরিত্রের উপর ইহার কোনও কুফল দেখা যায় না। খুব কম ক্ষেত্রে ইহা সামান্য অনিষ্ট করে কিন্তু ইহা সহজেই নিরাময় করা সম্ভব; এই অভ্যাসটি আঙ্গুল চোষা অপেক্ষা বেশি গুরুতর বা অপকারী নয়। স্বাস্থ্য ও চরিত্রের উপর করমৈথুনের যে কুফল লক্ষ্য করা গিয়াছে এই অভ্যাস বন্ধ করার চেষ্টা হইতেই তাহার উদ্ভব। করমৈথুন শিশুর পক্ষে ক্ষতিকর হইলেও ভয় দেখাইয়া এই কুৎসিত অভ্যাস ত্যাগ করানো না গেলে শুধু নিষেধ করা বিজ্ঞোচিত কাজ হইবে না। কেননা নিষেধ করিলেই যে শিশু এই অভ্যাস হইতে বিরত হইবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। আপনি যদি বন্ধ করার কোনো চেষ্টা না করেন তবে সম্ভবত ইহা আপনা আপনি বন্ধ হইয়া যাইবে কিন্তু এ বিষয়ে চেষ্টা করিলেই বরং নানা মানসিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা। কাজেই প্রতিক্রিয়ার ফলাফল বিবেচনা করিয়া শিশুকে এ সম্বন্ধে স্বাধীনতা দেওয়াই ভালো। অবশ্য আমি এইকথা বলিতেছি না যে, নিষেধ করা ব্যতীত অন্য কোনো সম্ভাব্য উপায় গ্রহণ করা হইতেও বিরত থাকিতে হইবে। যাহাতে শিশু বেশিক্ষণ বিছানায় জাগিয়া না থাকে সেই জন্য ঘুম ধরিলে তাহাকে শুইতে দিবেন। যাহাতে তাহার মন অন্য কোনও দিকে আকৃষ্ট হয় সেইজন্য তাহার প্রিয় কতকগুলি খেলনা বিছানায় রাখিতে দিবেন; এইরূপ প্রক্রিয়ায় কোনো অপকার হয় না। ইহাতে যদি কোনো উপকার না হয় তবে শিশুকে বাধা দিবেন না, বা একটি খারাপ অভ্যাস করিতেছে বলিয়া সেইদিকে তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করিবেন না, স্বাভাবিকভাবে শিশুকে অন্য বিষয়ে মনোযোগী করিতে পারিলে আপনা হইতেই সে ইহাতে ক্ষান্ত হইবে। এই চেষ্টা হইলেও দুশ্চিন্তার কারণ নাই; শিশুর করমৈথুন অভ্যাস বেশিদিন থাকে না।
সাধারণ শিশুর তৃতীয় বৎসরে যৌন কৌতূহল শুরু হয়। পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীলোকের, বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর দৈহিক পার্থক্য প্রথমে তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শৈশবে এই কৌতূহলের আর কোনো বিশেষত্ব নাই, ইহা তাহার সাধারণ কৌতূহলের অন্তর্গত। শুধু যেখানে ব্যাপারটিকে রহস্যাবৃত করিয়া রাখিবার রীতি, সেখানেই শিশুদের মধ্যে ভেঁপোমির ভাব দেখা যায়। যেখানে কোনো রহস্য নাই সেখানে কৌতূহল তৃপ্ত হইলেই আগ্ৰহ কমিয়া যায়। প্রথম হইতেই শিশুকে তাহার মাতা-পিতা-ভ্রাতা-ভগিনীকে মাঝে মাঝে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখিতে দিতে হইবে। বস্ত্র পরিবর্তনের সময় বা অন্য কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় শিশুর সম্মুখে ক্ষণিকের জন্য নগ্নদেহ হইলেও আচরণে কোনোরূপ ভাবান্তর দেখানো উচিত নহে; বয়স্ক ব্যক্তি বা শিশু কাহারই ইহাতে কিছু মনে করিবার নাই; নগ্নতা সম্বন্ধে বয়স্ক ব্যক্তিদের যে বিশেষ কোনো মনোভাব আছে তাহা শিশু না জানিলেই হইল। (পরে অবশ্য তাহাকে জানিতে হইবে।) দেখা যাইবে শিশু অতি সহজেই তাহার পিতা ও মাতার দৈহিক পার্থক্য লক্ষ্য করিবে এবং তাহার মাতা ও ভগিনীর দৈহিক পার্থক্যও যে অনুরূপ ধরনের তাহা বুঝিতে পারিবে। এতটুকু পর্যন্ত বুঝিতে পারিলে দৈহিক পার্থক্য সম্বন্ধে আগ্রহ যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়া যাইবে আলমারি বা টেবিলের দেরাজ মাঝে মাঝে ভোলা থাকিলে তাহার সম্বন্ধে শিশুর কৌতূহল যেমন বিশেষ থাকে না তেমনই এই সময়ে শিশু যৌন বিষয় সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করিলে অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নের মতোই তাহারও উত্তর দিতে হইবে।
