শিশুর ভিতর সহানুভূতির সহজাত বীজ (সুপ্ত) রহিয়াছে; এই প্রবৃত্তিটির যথাযথ বিকাশ ঘটাইয়া ব্যাপক সমবেদনা বোধ জাগ্রত করা প্রধানত বুদ্ধিসুলভ ব্যাপার; ইহা করিতে হইলে যথার্থ দিকে শিশুর মনোযোগে চালিত করা আবশ্যক এবং যুদ্ধলিপ্ত ব্যক্তিগণ ও কর্তৃপক্ষ যে সকল ঘটনা গোপন করিতে চাহেন তাহা শিশুকে উপলব্ধি করানো দরকার। যেমন ধরুন, অস্টারলিজের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর নেপোলিয়ন যুদ্ধক্ষেত্রে সকল দিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া যে বীভৎস দৃশ্য দেখিয়াছিলেন টলস্টয় তাহার বর্ণনা দিয়াছেন। যুদ্ধের ফলে উভয় পক্ষের লোক যে চরম দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হয় তাহার বিবরণ পাঠক ও শ্রোতার মনে বেদনাবোধ জাগ্রত করে। অধিকাংশ ইতিহাসেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থার বর্ণনা থাকে না; যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী বারো ঘণ্টায় যুদ্ধক্ষেত্রের কি শোচনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহা যদি ঐতিহাসিক বর্ণনা করেন তবে যুদ্ধ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অভিনব চিত্র পাঠকের চোখের সামনে ফুটিয়া ওঠে। ইহার জন্য ঘটনা গোপন করার প্রয়োজন নাই, বরং বেশি করিয়া প্রকাশ করা দরকার। যুদ্ধক্ষেত্র সম্বন্ধে যাহা খাটে, অন্য যে-কোনো নিষ্ঠুরতা সম্পর্কেই তাহা প্রযোজ্য। এই সকল ক্ষেত্রে নীতি-উপদেশ প্রদান করা অনাবশ্যক; যথাযথভাবে গল্প বর্ণনাই যথেষ্ট। আপনি নিজে কোনো উপদেশ দিয়া শিশুকে তাহা পালন করিতে বলিবেন না, ঘটনাগুলিকেই শিশুর মনে উপযুক্ত ভাব ও নীতিবোধ উন্মেষ করিতে সুযোগ দিন।
স্নেহ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা আবশ্যক। স্নেহ ও সহানুভূতির মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে; সহানুভূতি-বোধ ব্যাপক, ইহার ক্ষেত্র বিস্তৃত। বহুজনের প্রতি ইহার প্রয়োগ হইতে পারে কিন্তু স্নেহ সকলের জন্য নয়। নির্বাচিত কতকের জন্যই কেবল শিশুর মনে স্নেহ বিদ্যমান সে সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে; এখন সমবয়সীদের মধ্যে স্নেহ সম্বন্ধে কেমন তাহাই বলা হইতেছে।
স্নেহ সৃষ্টি করা যায় না; হৃদয়ের অন্তস্থল হইতে ইহাকে কেবল যুক্ত করা যায়। এক প্রকার স্নেহ আছে যাহার মূল অংশত ভয়ের মধ্যে নিহিত। পিতামাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসায় এই ধরনের স্নেহের কিছু মিশ্রণ আছে। পিতামাতা সন্তানকে পালন করেন, বিপদ হইতে রক্ষা করেন। জনক-জননীর স্নেহচ্ছায়া হইতে বঞ্চিত হইলে সন্তান নিশ্চয়ই সুখি হয় না; কাজেই পিতামাতার প্রতি ভালোবাসার মধ্যে কিছু পরিমাণে ভয় মিশ্রিত থাকে। শৈশবেও অন্য শিশুর প্রতি ভালোবাসায় কিন্তু এই ধরনের ভীতির মিশ্রণ দেখিতে পাওয়া যায় না। আমার ছোট মেয়ে তার ভাইয়ের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত, যদিও তাহার জগতে সেই একমাত্র ব্যক্তি যে তাহার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করে না। সমান বয়সীদের মধ্যে ভালোবাসাই সবচেয়ে ভালো; যেখানে সুখ এবং ভীতিশূন্যতা আছে সেখানেই ইহা থাকা সম্ভব। ভয়–তাহা সংজ্ঞাত [Conscious] হউক কিংবা অজ্ঞাতই।
[Unconscious] হউক-ভীত ব্যক্তির মনে তীব্র ঘৃণা ও শত্রু তাহার উদ্রেক করে, কারণ যাহাকে ভয় করা যায়, সর্বদা মনে হয় সে কোনোরূপ ক্ষতি-সাধন করিতে পারে। নিজের ক্ষতির আশঙ্কা ভীত ব্যক্তির মনে আত্মরক্ষার উপায়স্বরূপ ঘৃণা ও শত্রুতা জাগাইয়া রাখে। অধিকাংশ লোকের জীবনে দেখা যায় ঈর্ষা স্নেহ বিস্তারের পক্ষে বাধা হইয়া দাঁড়ায়। সুখভোগ ব্যতীত ঈর্ষা দমন করার অন্য কোনো উপায় আছে বলিয়া আমি মনে করি না; নৈতিক শৃঙ্খলা ঈর্ষা বোধের অন্তঃপ্রবাহিত ফল্গুধারা রোধ করিতে পারে না। আবার যে সুখ ও স্বস্তিবোধ ঈর্ষাকে প্রতিরোধ করে তাহাই প্রধানত ভয় কর্তৃক দমিত হয়। ভয় অনেক সময় অনেকের উৎফুল্ল জীবনকেও বিষময় করিয়া তোলে। পিতামাতা ও তথাকথিত বন্ধুগণ আনন্দোজ্জ্বল কিশোর-কিশোরীর মনে ভয় সঞ্চার করিয়া বিষাদের ছয়াপাত করেন; নৈতিক কারণেই তাঁহারা এরূপ করেন, মনে ভাবেন; কিন্তু আসলে ঈর্ষা তাহাদিগকে এ কাজে প্ররোচিত করে। বলিতে পারেন–কিসের ঈর্ষা? করিবেই বা কেন? মানব-মনের গহনে নিত্যই নানা ভাবের আলোড়ন চলিতেছে। সকরেই সুখি হইতে চায়, আত্মসুখই প্রধান কাম্য। কিন্তু ইহা যখন সহজলভ্য হয় না তখন অন্যে যে ইহা পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করিবে তাহাও মনে সহ্য করিতে পারে না। অপরকে যে নিজের অপেক্ষা বেশি ভাগ্যবান মনে করে তাহার প্রতি ঈর্ষা জাগ্রত হয়, তা সে ব্যক্তি শিশুই হোক কিংবা কিশোরই হউক। ঈর্ষা কিন্তু তখন খাঁটি ঈর্ষার আকারে আত্মপ্রকাশ করে না; ভদ্রতার মুখোেশ পরিয়া, নৈতিক উপদেশের শুভ্র পোশাকে সাজিয়া ইহা ছলনা করিতে বাহির হয়। তরুণ কিশোরগণ যদি যথেষ্ট পরিমাণে নির্ভীক হয় তবে এই আশঙ্কাবাদীদের কথায় কর্ণপাত করিবে না, নচেৎ তাহাদিগকে ঈর্ষান্বিত নীতি-উপদেষ্টার দলভুক্ত হইয়া দুঃখময় জীবন বরণ করিতে হইবে।
আমরা যে চরিত্রে শিক্ষাদানের পরিকল্পনা করিতেছি তাহার উদ্দেশ্য হইল শিশুর জীবনে সুখ এবং সাহস উৎপাদন করা; এই শিক্ষা শিশুর হৃদয়স্থিত স্নেহের উৎস-মুখ খুলিয়া দেয়। ইহার তুলনায় বেশি কিছু করা সম্ভবপর নয়। প্রথমেই বলা হইয়াছে স্নেহ সৃষ্টি করা যায় না, শুধু ইহার বহির্গমনের পথ করিয়া দেওয়া যায় মাত্র। আপনি যদি শিশুদিগকে স্নেহশীল হইতে উপদেশ দেন, তবে কতকগুলি ভণ্ড ও প্রতারক সৃষ্টি করিতে পারেন কিন্তু তাহাদিগকে যদি মুক্ত পরিবেশে সুখি রাখিতে পারেন, যদি তাহাদিগকে সদয় আচরণে ঘিরিয়া রাখিতে পারেন তবে দেখিতে পাইবেন স্বতঃপ্রবৃত্তভাবেই তাহারা সকলের প্রতি বন্ধুর মতো ব্যবহার করিতেছে। ইহার ফলস্বরূপ প্রায় সকলেই তাহাদের প্রতি প্রীতিপূর্ণ আচরণ করিয়া সদ্ব্যবহারের প্রতিদান দিবে। বিশ্বস্ত এবং প্রীতিস্নিগ্ধ স্বভাবের বিশেষ সার্থকতা আছে; ইহা কিশোর-কিশোরীর চরিত্রে কমনীয় মাধুর্য দান করে এবং অপরের নিকট হইতে যেরূপ স্নেহ-মধুর আচরণ ও সাড়া কামনা করা হয় তাহাই সৃষ্টি করে। যথার্থ চরিত্রগঠনের শিক্ষার ইহা একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় সুফল।
১২. যৌন শিক্ষা
যৌন সম্পর্কিত বিষয় এত কুসংস্কার এবং নিষেধের বেড়াজালে ঘেরা যে, অত্যন্ত শঙ্কার সঙ্গে এই সম্পর্কে আলোচনা করিতে অগ্রসর হইতেছি। ভয় হয়, পাছে যে সমস্ত পাঠক এই পর্যন্ত আমার শিক্ষানীতি গ্রহণ করিয়াছেন তাহারাও এই ক্ষেত্রে প্রয়োগের সময় তাহাতে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁহারা হয়তো বিনা দ্বিধায় স্বীকার করিয়াছেন যে, নির্ভীকতা এবং স্বাধীনতা শিশুর পক্ষে মঙ্গলজনক; তথাপি যৌন ব্যাপারে তাহারাই হয়তো এ নীতির বিরোধিতা করিয়া শিশুদের উপর অকারণ ভীতি ও দাসত্ব প্রয়োগ করার পক্ষপাতী হইতে পারেন। যে-নীতি দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া আমি বিশ্বাস করি, তাহা আমি কোনোক্রমেই সংকুচিত করিতে রাজি হইব না; মানব চরিত্রের অন্যান্য আবেগ, যেমন খেলা, নূতন কিছু গঠন করা, ভয়, স্নেহ প্রভৃতির বিকাশ বা নিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে যেরূপ অবলম্বন করিয়াছি, যৌন ব্যাপারেও আমি ঠিক সেইরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করার পক্ষপাতী।
