শিশুকে নিষ্ঠুরতার সহিত পরিচিত করাইবার উপায় : এ সম্বন্ধে যে কতকগুলি সাধারণ নীতি আছে তাহা পালন করা উচিত। অবাস্তব কাহিনী যেমন, ব্লু বিয়ার্ড ও দানবহত্যাকারী জ্যাকের গল্প, শিশুর মনে সত্যিকারের নিষ্ঠুরতা সম্বন্ধে কোনো ভাব জাগায় না। সে এগুলিকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক উদ্ভট মনে করে, বাস্তব জীবনে যে ইহাদের অস্তি আছে তাহা সে মনে করে না। শিশুর ভিতরকার আদিম বন্য-প্রবৃত্তি নিষ্ঠুরতার কাহিনী শুনিয়া পরিতৃপ্ত হয় বলিয়াই সে আনন্দ লাভ করে; এই প্রবৃত্তি নিষ্ঠুরতার কাহিনী শুনিয়া খেলার আবেগরূপে প্রকাশ পায় বলিয়া ইহা দ্বারা কোনো ক্ষতি সাধিত হয় না। শিশুর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ প্রবৃত্তিও কমিয়া আসে।
শিশুকে যখন বাস্তব নিষ্ঠুরতার সহিত প্রথম পরিচিত করানো হয় তখন বিশেষ যত্নসহকারে এমন সমস্ত ঘটনার কাহিনী নির্বাচন করা উচিত যাহাতে সে অত্যাচারীর পক্ষ সমর্থন না করিয়া নিজেকে নির্যাতিতের দলে মনে করিবে। কোনো গল্পে বর্ণিত অত্যাচারীর সঙ্গে নিজেকে মনে মনে মিশাইয়া দিতে পারিলে শিশুর ভিতরকার বর্বর মানুষটি উল্লসিত হয়। এই ধরনের গল্প শিশুকে সাম্রাজ্যবাদীরূপে গড়িয়া উঠিতে সাহায্য করে। কিন্তু আব্রাহাম কেমন করিয়া আইজ্যাককে বলি দেওয়ার আয়োজন করিয়াছিল অথবা এলিসা কর্তৃক অভিশপ্ত শিশুদিগকে স্ত্রী-ভালুক কেমন করিয়া হত্যা করিয়াছিল এই কাহিনী স্বাভাবিকভাবেই শিশুর মনে নির্যাতিত শিশুর প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক করে। এইসব গল্প যদি বলা হয়, তবে এমনভাবে বলিতে হইবে যেন শিশুরা বুঝিতে পারে বহু যুগ আগে মানুষ কতখানি নিষ্ঠুরতার কাজ করিতে পারিত। বাল্যকালে একবার আমি এক ধর্মযাজককে প্রায় একঘণ্টা ধরিয়া বক্তৃতা করিতে শুনিয়াছিলাম। তিনি প্রমাণ করিতে চাহিয়াছিলেন যে এলিসা শিশুদিগকে অভিসম্পাত করিয়া ঠিক কাজই করিয়াছিলেন। সৌভাগ্যবশত আমার বয়স কিছু বেশি থাকায় সে ধর্মযাজককে আমি নেহাত নির্বোধ বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলাম, নতুবা ভয়ে হয়তো আমি অভিভূত হইয়া পড়িতাম। আব্রাহাম ও এলিসা নিষ্ঠুরতার কাজ করিয়া ধর্মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়াছিলেন, গল্পের মারফত ইহাই যদি প্রমাণ করিতে চেষ্টা করা হয় তবে এগুলি সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা উচিত। নতুবা ইহা শিশুর নীতিজ্ঞানের মান নিকৃষ্ট করিয়া ফেলিবে। কিন্তু এইগুলি যদি মানুষের অন্যায় অত্যাচারের ভূমিকারূপে বিবৃত হয় তবে ইহা হইতে বাঞ্ছিত ফল পাওয়া সম্ভব, কারণ কাহিনী হিসাবে এইগুলি জীবন্ত, বহু প্রাচীন এবং ভিত্তিহীন। কিং জন। [King John] পুস্তকে বর্ণিত গল্পে হিউবার্ট কিভাবে বালক আর্থারের চোখ তুলিয়া ফেলিয়াছিল সেই কাহিনীও এই প্রসঙ্গে বলা চলে।
তারপর যুদ্ধ বর্ণনাসহ ইতিহাস শিক্ষা দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের কাহিনী শুনাইলে প্রথমদিকে শিশুর সহানুভূতি পরাজিতের পক্ষে জাগ্রত করানো দরকার। আমি বরং প্রথমে এমন যুদ্ধের গল্প আরম্ভ করিতে চাই যেখানে শিশু স্বাভাবিকভাবে পরাজিতের প্রতিই সমবেদনা বোধ করিবে–যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইংরাজ বালককে প্রথমে হেস্টিংসের যুদ্ধ কাহিনী শুনাইবে। যুদ্ধের দরুন মানুষের যে দুঃখ-দুর্দশার সৃষ্টি হয় তাহার উপরই বেশি জোর দিতে হইবে। পরে ক্রমে ক্রমে শিশুর এমন মানসিক অবস্থার সৃষ্টি করিতে হইবে যেন সে যুদ্ধের কাহিনী পড়িবার সময় নিজেকে কোনো পক্ষভুক্ত মনে না করে; তাহার মনে যেন এই ধারণা জন্মে যে, উভয়পক্ষের লোকেরাই ছিল নির্বোধ; সাময়িকভাবে তাহাদের মেজাজ চটিয়া গিয়াছিল এবং তাহাদের এমন পরিচারিকার প্রয়োজন ছিল যাহারা তাহাদিগকে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিছানায় শোয়াইয়া রাখিতে পারিত। যুদ্ধকে আমি নার্সারি বা শিশুপালনাগারে শিশুদের ঝগড়ার সমপর্যায়ভুক্ত করিব। আমার বিশ্বাস, শিশুদিগকে এইভাবে যুদ্ধের প্রকৃত স্বরূপ জানানো যায়। ইহা যে নির্বুদ্ধিতার কাজ তখন তাহারা উপলব্ধি করিতে পারিবে।
শিশু যদি নির্দয় আচরণের কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ দেখিতে পায় তবে বয়স্ক ব্যক্তি তাহাকে সে সম্বন্ধে সকল কথা বুঝাইয়া বলিবেন; শিশু যেন মনে মনে এই ধারণা করে যে, নির্দয় ব্যক্তিগণ জীবনের প্রথম হইতে ভালভাবে শিক্ষা পায় নাই। বলিয়াই নিষ্ঠুর আচরণ করিয়া থাকে, তাহাদের হৃদয়ে কোমল সমবেদনা বোধ বিকাশ লাভ করিলে তাহারা এইরূপ আচরণ করিত না। কাল্পনিক গল্প ও ইতিহাসের গল্প শুনিয়া শিশুগণ নিষ্ঠুরতার সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করে। ইহার পূর্বে তাহাদিগকে কোনোরূপ সত্যকারের নৃশংসতার দৃশ্য দেখানো উচিত নহে। অবাস্তব কাল্পনিক কাহিনী, তাহার পর যুদ্ধবিগ্রহের ঐতিহাসিক গল্প এবং সর্বশেষ পারিপার্শ্বিক বাস্তব জীবনের ঘটনা সম্বন্ধে শিশুকে ধীরে ধীরে অবহিত করাইতে হইবে। সকল ক্ষেত্রেই শিশুর মনে এই অনুভূতি জাগানো আবশ্যক যে, অন্যায় অত্যাচার প্রতিরোধ করা সম্ভবপর এবং কেবল আত্মসংযমের অভাব ও অশিক্ষা হইতেই ইহার উদ্ভব। তাহার মনে অত্যাচারীর প্রতি ক্রোধের উদ্রেক করা উচিত নহে, সে বরং নির্দয় ব্যক্তিকে যেন মনে করে আনাড়ি অপদার্থ লোক যে জানে না কি কাজ করিলে সকলের প্রকৃত সুখ হইতে পারে।
