আমি এখন সাধারণভাবে স্নেহ ও সমবেদনা সম্বন্ধে আলোচনা করিব। পিতামাতা ও সন্তানের প্রীতি সম্পর্কের মধ্যে জটিলতার উদ্ভব হইতে পারে; কেননা জনক-জননী কর্তৃক অপত্যস্নেহের অপব্যবহারের সম্ভাবনা আছে। এইজন্যই প্রথম অপত্যস্নেহের স্বরূপ কি তাহা আলোচনা করা হইল।
সমবেদনা : শিশুকে জোর করিয়া স্নেহ প্রকাশ করা বা সমবেদনা বোধ করা অভ্যাস করানো যায় না। ইহার একমাত্র উপায় হইল কিরূপ অবস্থায় এই ভাবগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাগ্রত হয় তাহা লক্ষ্য করা এবং তাহার পর ওইরূপ অবস্থা সৃষ্টি করিতে চেষ্টা করা। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই যে, সমবেদনা কতকটা সহজাত। শিশুগণ তাহাদের ভ্রাতাভগিনীদের কাঁদিতে দেখিয়া উৎকণ্ঠিত হয় এবং নিজেরাও কাঁদিতে শুরু করে। ভ্রাতাভগিনীদের উপর কস্টদায়ক কোনো আচরণ করিতে দেখিলে তাহারা তাহাদের পক্ষ সমর্থন করিয়া বড়দের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আমার পুত্রের কনুইতে ঘা হইয়াছিল। ব্যান্ডেজ করিয়া দেওয়ার সময় সে চিৎকার করিতেছিল। সংলগ্ন ঘর হইতে তাহার কনিষ্ঠ ভগিনী (বয়স আঠারো মাস) কান্না শুনিয়া আকুল হইয়া ওঠে এবং যতক্ষণ কান্না থাকে ততক্ষণ বারংবার বলিতে থাকে খোকন কাঁদছে, খোকন কাঁদছে। অন্য একদিন তাহার পায়ে কাঁটা ফুটিয়াছিল; তাহার মা সূঁচ দিয়া তাহা বাহির করিয়া দিতেছিলেন। খোকন উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, এতে লাগে না তো, মা? এইসব ব্যাপারে যে একটু কষ্ট সহ্য করিতে হয়, হইচই করিতে হয় না তাহা শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাহার মা বলিলেন, হ্যাঁ লাগেই তো। খোকন বারে বারে জেদ করিতে লাগিল যে, কাঁটা বাহির করিতে ব্যথা লাগে না; তাহার মা বারে বারেই বলিতে লাগিলেন ব্যথা লাগে। অবশেষে খোকন ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল, যেন তাহার নিজের পায়ের কাঁটা বাহির করা হইতেছে। এইরূপ ঘটনা সহজাত দৈহিক সমবেদনাবোধ হইতে ঘটে। ইহাকে ভিত্তি করিয়াই আরও ব্যাপক সমবেদনাবোধ জাগ্রত করা সম্ভবপর। এইজন্য তাহাদিগকে উপলব্ধি করাইতে হইবে যে, মানুষ এবং অপরাপর জীবজন্তুও দুঃখ কষ্ট বোধ করিতে হইবে; শিশু যাঁহাকে শ্রদ্ধা করে তাঁহাকে যেন সে নির্দয় ব্যবহার বা কোনো নিষ্ঠুর কাজ করিতে না দেখে। পিতা যদি গুলি করিয়া পক্ষী হত্যা করেন মারেন এবং মা যদি পরিচারিকার প্রতি রূঢ় ব্যবহার করেন তবে শিশুর মধ্যেও দোষগুলি সংক্রামিত হইবে।
অন্যায় অত্যাচার সম্বন্ধে জ্ঞান : কখন এবং কিভাবে শিশুকে জগতে প্রচলিত অন্যায়, অনাচারের সঙ্গে পরিচিত করানো যায় তাহা একটি কঠিন প্রশ্ন। যুদ্ধ, অত্যাচার, দারিদ্র্য এবং প্রতিষেধক রোগ সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকা শিশুদের পক্ষে অসম্ভব। কোনো-না কোনো স্তরে (অবস্থায়) শিশুকে এইসব বিষয় জানিতেই হইবে এবং জ্ঞানের সঙ্গে তাহার দৃঢ় বিশ্বাস গড়িয়া উঠা আবশ্যক যে, যে-দুঃখ হইতে পরিত্রাণ সম্ভবপর তাহা ঘটানো বা ঘটিতে দেওয়া কখনই উচিত নয়। যে সকল লোক স্ত্রীজাতির সতীত্ব রক্ষা করিতে চান তাহাদের যে সমস্যা, শিশুর মনকে অন্যায়, অত্যাচার, দুঃখদহনের বিরুদ্ধে জাগ্রত করিতে চান যাহারা তাহাদের সমস্যাও একইরূপ। পূর্বে স্ত্রীলোকের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিগণ মনে করিতেন বালিকাদিগকে বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত যৌন বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রাখাই ইহার প্রধান উপায়; কিন্তু এখন অজ্ঞতা জিয়াইয়া রাখার পরিবর্তে উপযুক্ত জ্ঞানদানের পন্থা গ্রহণ করা হয়।
আমি কতক শান্তিবাদী লোকের কথা জানি, তাহারা মনে করেন যুদ্ধের কথা বাদ দিয়া ইতিহাস পড়ানো উচিত; যতদিন সম্ভব শিশুদিগকে জগতের নিষ্ঠুরতা সম্বন্ধে অজ্ঞ রাখাই তাহাদের কামনা। কিন্তু আমি জ্ঞানের অভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত এই ধরনের কাঁচের ঘরে আড়াল করিয়া রাখা গুণের প্রশংসা করিতে পারি না। যখনই ইতিহাস পড়ানো হইবে, সত্য কাহিনীই পড়ানো উচিত। আমরা যে নীতি উপদেশ প্রচার করিতে চাই ঐতিহাসিক ঘটনা যদি তাহার প্রতিকূল হয় তবে বুঝিতে হইবে সে নীতিই ভ্রান্ত এবং উহা বর্জন করাই বাঞ্ছনীয়। ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে অনেকে, এমনকি অনেক ধার্মিক ব্যক্তিও সত্য ঘটনাকে তাঁহাদের মতের পক্ষে অসুবিধাজনক বোধ করেন; ইহা তাহাদের আদর্শের কিছুটা দুর্বলতারই পরিচায়ক। সত্যকারের বলিষ্ঠ নীতিজগতে বাস্তব সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ইহা দ্বারাই পুষ্ট। শিশুদিগকে অজ্ঞতার মধ্যে গড়িয়া তুলিলে এই ফল হইতে পারে যে, তাহারা পরে যখন অন্যায়, অনাচার বা কদাচারের সন্তান পাইবে তখন তাহার মধ্যে ঝাঁপাইয়া পড়িতে পারে। এইরূপ ঝুঁকি লওয়া উচিত নহে। নিষ্ঠুরতার প্রতি তাহাদের বিতৃষ্ণা বা বিরূপ মনোভাব জাগাইতে না পারিলে ইহা হইতে শিশুদিগকে নিবৃত্ত করা কঠিন; সমাজে নিষ্ঠুরতা বিদ্যমান আছে তাহা না জানিলেই বা ইহার প্রতি তাঁহাদের বিরাগ জাগ্রত হইবে কিরূপে?
কিন্তু অন্যায় অত্যাচার সম্বন্ধে শিশুকে ওয়াকিবহাল করার সহজ উপায়টি বাহির করা বড় সহজ নয়। অবশ্য বড় শহরের বস্তিতে যাহারা বাস করে তাহারা মদ্যপানের ফলে মাতলামি, ঝগড়া, মারামারি, স্ত্রীকে প্রহার করা ও এই জাতীয় অনেক প্রকার অনাচার, অত্যাচার দেখিতে পায়, ইহা তাহাদের উপর খুব গভীর প্রভাব বিস্তার করে না। কিন্তু কোনো যত্নশীল পিতা সন্তানকে এইরূপ দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত করাইতে চাহিবেন না। ইহার প্রধান কারণ এই যে, এইসব বীভৎস দৃশ্য শিশুমনে দারুণ ভীতি উৎপাদন করিয়া তাহার সমগ্র জীবনের উপরই গভীর প্রভাব বিস্তার করিতে পারে। অসহায় শিশু যখন প্রথম বুঝিতে পারে যে, শিশুদের উপরও নিষ্ঠুর অত্যাচার হওয়া অসম্ভব নয় তখন সে ভীত না হইয়া পারে না। আমার বয়স যখন চৌদ্দ বৎসর তখন আমি প্রথম ওলিভার-টুইস্ট [Oliver Twist] পড়ি; ইহা আমার মনে এমন ভীতি সঞ্চার করিয়াছিল যে, ইহা অপেক্ষা কম বয়সে পড়িলে আমি হয়তো সহ্যই করিতে পারিতাম না। কিছুটা বয়স বেশি হওয়ার ফলে শিশুর মনে সাহস না জন্মানো পর্যন্ত তাহাকে ভয়ঙ্কর বা ভীতি উৎপাদক কিছু না জানানই ভালো। এইরূপ মানসিক ধৈর্য কোনো শিশুর আগে আসে, কাহারও বা অন্যের তুলনায় পরে আসে। ভীরু বা কল্পনাপ্রবণ শিশুদের মনে ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য যেমন সহজে এবং গভীরভাবে রেখাপাত করিতে পারে, স্বাভাবিক সাহস সম্পন্ন অথবা শিশুদের মনে তেমন সহজে পারে না। শিশু যদি জানে যে তাহার পিতামাতার কল্যাণদৃষ্টি সর্বদা তাহার উপর নিবদ্ধ আছে এবং বিপদে তাহার ভয়ের কোনো কারণ নাই তবে স্বাভাবিকভাবে তাহার মনে নির্ভীকতার ভাব গড়িয়া উঠিবে। ইহা গড়িয়া না উঠা পর্যন্ত শিশুকে বাস্তব নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পরিচিত করানো উচিত নয়। কখন এবং কিভাবে এই পরিচয় সাধন করিতে হইবে সে সম্বন্ধে বাধাধরা কোনো নিয়ম নাই; এই বিষয়ে অভিভাবকের দক্ষতা এবং বিচার-বুদ্ধির প্রয়োজন।
