পিতামাতার প্রতি সন্তানের আচরণ: শিশুদের নিকট হইতে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করি সে সম্বন্ধেও আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। সন্তানের প্রতি জনক-জননীর স্নেহ যদি যথাযথ হয় তাহাদের আচরণও অনুরূপ হইবে। পিতামাতাকে দেখিলে সে খুশি হইবে, অন্য কোনো আনন্দপ্রদ খেলা বা কাজে লিপ্ত না থাকিলে তাহাদের অনুপস্থিতিতে দুঃখিত হইবে; দৈহিক বা মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিলে তাহাদের সাহায্য কামনা করিবে; দুঃসাহসিক কাজে তাহাদের উদ্যম আসিবে কেননা তাহারা উপলব্ধি করিবে পিতামাতার অফুরন্ত স্নেহ, এবং তাহাদের রক্ষার জন্য কল্যাণশক্তি সর্বদা তাহাদের জন্য সঞ্চিত রহিয়াছে যদিও প্রকৃত বিপদের সময় ছাড়া শিশুর মনে এ চিন্তা আসিবে না। তাহারা আশা করিবে, পিতামাতা তাহাদের প্রশ্নের উত্তর দিবেন, তাহাদের জটিল সমস্যার সমাধান করিয়া দিবেন এবং কঠিন কাজে সাহায্য করিবেন। সন্তানগণ পিতামাতার নিকট হইতে খাদ্য ও আশ্রয় পায় ইহা চিন্তা করিয়া তাহারা জনক-জননীকে ভালবাসিবেন না; পিতামাতার কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত হওয়া এবং সেজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা শিশুদের স্বভাব নয়। তাহাদের সঙ্গে খেলিলে, তাহাদিগকে নূতন জিনিস দেখাইলে, তাহাদিগকে বিচিত্র পৃথিবীর গল্প শুনাইলে তাহারা পিতামাতাকে বেশি পছন্দ করিবে। তাহারা ক্রমে উপলব্ধি করিবে যে, তাহাদের উপর পিতামাতার স্নেহ বিদ্যমান রহিয়াছে, পৃথিবীর উপর যেমন চন্দ্ৰসূর্যের কিরণ বর্ষিত হয় জনক জননীর স্নেহও দ্রুপ স্বাভাবিকভাবে বর্ষিত হইতেছে এই ধারণা সন্তানদের মনে আসা উচিত। পিতা-মাতার প্রতি তাহাদের ভালোবাসা অপর শিশুদের প্রতি ভালোবাসা হইতে পৃথক প্রকৃতির হইবে। পিতামাতা সন্তানকে পুরোভাগে রাখিয়া তাহার মঙ্গলের জন্য কাজ করিবেন, শিশুর কাজ হইবে আত্মবিকাশ ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা। এখানেই আসল পার্থক্য। পিতামাতার প্রতি শিশুর করণীয় বিশেষ কিছু নাই। জ্ঞানে, স্বাস্থ্যে ক্রমে পুষ্ট হইয়া ওঠাই তাহার কাজ এবং ইহা দ্বারাই পিতৃমাতৃহৃদয়ের অপত্যস্নেহ প্রবৃত্তি পরিতৃপ্তি লাভ করে।
কেহ যেন মনে না করেন যে আমি পারিবারিক জীবনে স্নেহ এবং ইহাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কমাইবার পক্ষপাতী। তাহা মোটেই নহে। আমি যাহা বলিতে চাই তাহা এই যে, বিভিন্ন প্রকারের স্নেহ আছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্নেহ এক প্রকার, সন্তানের প্রতি পিতামাতার স্নেহ অন্য প্রকার, পিতামাতার প্রতি সন্তানের স্নেহ আবার অন্য আর এক প্রকার। ক্ষতি তখনই সাধিত হয় যখন বিভিন্ন প্রকার স্নেহ তালগোল পাকাইয়া ফেলা হয়। ফ্রয়েডীয়গণ এ সম্বন্ধে যে সত্য সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন তাহা আমি বিশ্বাস করি না, কারণ তাঁহারা বিভিন্ন স্নেহের প্রবৃত্তিগত পার্থক্য স্বীকার করেন না। ইহার ফলে পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে আচরণেও ইহারা বাধা নিষেধের কড়াকড়ি আরোপ করেন। কেননা তাহাদের মতে জনক-জননী ও সন্তানের মধ্যে যে স্নেহ বিদ্যমান তাহা প্রচ্ছন্নভাবে যৌন ভালোবাসারই নামান্তর। বিশেষ কোনো দুর্ভাগ্যসূচক ক্ষেত্র ব্যতীত আমি এরূপ স্নেহচ্ছতার সমর্থক নহি। যে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসেন এবং সন্তানদিগকে স্নেহ করেন তাঁহারা নিজেদের হৃদয়বৃত্তির নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করিতে পারিবেন। সন্তানের মঙ্গলের জন্য যথেষ্ট চিন্তা ও জ্ঞানের প্রয়োজন হইবে কিন্তু এইগুলি অপত্যস্নেহের ভিতর দিয়াই তাহারা লাভ করিতে সক্ষম হইবেন। পরস্পরের নিকট হইতে তাহারা যাহা পান, তাহা সন্তানের নিকট হইতে কামনা করা তাঁহাদের পক্ষে কখনই সমীচীন হইবে না; তাঁহারা যদি পরস্পরকে ভালবাসিয়া সুখি হন তবে সন্তানের স্নেহ লাভের আকাঙ্ক্ষা তাহাদের মনে জাগ্রতই হইবে না। আবার পুত্রকন্যা যদি যথোচিত যত্নের সঙ্গে লালিত-পালিত হয়, পিতামাতার প্রতি তাহাদের স্নেহ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রকাশ পাইবে, তাহাদের স্বাধীনতার কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিবে না। সন্তানের প্রতি যথোপযুক্ত আচরণ করিতে পিতামাতার আত্ম-কৃচ্ছতার প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন হইল জ্ঞান বুদ্ধিদীপ্ত অপত্যস্নেহের সম্প্রসারণের।
আমার পুত্রের বয়স যখন দুই বৎসর চার মাস তখন আমি আমেরিকায় যাইয়া তিন মাস ছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে সে বেশ সুখিই ছিল কিন্তু ফিরিলে আনন্দে আত্মহারা হইয়া উঠিয়াছিল। আমার জন্য সে অধীরভাবে বাগানের প্রবেশ পথে অপেক্ষা করিতেছিল : আমার হাত ধরিয়া সে ঘুরিয়া এটা-সেটা দেখাইতে লাগিল। আমি তাহার কথা শুনিতে চাহিতেছিলাম, সে-ও বলিতে চাহিতেছিল; আমার কিছু বলার ইচ্ছা ছিল না, তাহারও শোনার ইচ্ছা ছিল না। আবেগ বিপরীতমুখি হইলেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। যখন গল্প বলার কথা উঠে, সে শুনিতে চায়, আমি বলিতে চাই। এখানেও সামঞ্জস্য রহিয়াছে। শুধু একবার এই অবস্থার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল। তাহার তিন বৎসর ছয় মাস বয়সের সময় আমার জন্মদিন করিয়াছিল। তাহার মায়ের নিকট সে শুনিয়াছিল যে, সেইদিন আমায় খুশি করার জন্যই সব কিছু করিতে হইবে। গল্প শোনা ছিল তাহার কাছে সবচেয়ে আনন্দদায়ক। সেইদিন উৎসবের সময় সে বলিল যে আমাকে গল্প শুনাইবে। আনন্দের ব্যাপার শুরু হইল। সে কোলে বসিয়া পর পর গোটা বারো গল্প শুনাইল, তাহার পর আজকে আর নয় এই বলিয়া লাফ দিয়া নামিয়া গেল। ইহার পর অনেকদিন পর্যন্ত সে আর গল্প শুনাইতে আসে নাই।
