প্রথম কারণ ঘটে যখন প্রবৃত্তি হইতে কিরূপ আনন্দ লাভ হইবে তাহা বুদ্ধি বুঝিতে পারে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, প্রবৃত্তি এখন সুখকর কাজেই প্রেরণা দেয় যাহার ফল জীবদেহের পক্ষে প্রয়োজনীয়, কিন্তু এ ফল সুখকর না-ও হইতে পারে। খাদ্য গ্রহণ সুখকর, কিন্তু পরিপাক ক্রিয়া সুখকর নহে, বিশেষ করিয়া যদি অজীর্ণ রোগ থাকে। যৌনমিলন সুখকর কিন্তু সন্তান প্রসব সুখকর নয়; ছোট শিশুর নির্ভরতা সুখকর কিন্তু বলিষ্ঠ বয়স্ক পুত্রের স্বাধীনতা সুখকর নয়। অসভ্য আদিম জননীর প্রকৃতিবিশিষ্ট রমণী অসহায় সন্তানকে স্তন্য দিয়া পালন করিতেই সর্বাপেক্ষা বেশি আনন্দ পায়, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর অসহায় ভাব যখন কমিয়া আসে, মায়ের আনন্দও কমিতে থাকে। কাজেই আনন্দলাভের জন্যই সন্তানের অসহায় অবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রবণতা দেখা দেয়; সন্তান যখন পিতামাতার স্নেহ-পরিচর্যা ও নির্দেশের আওতার বাহিরে চলিয়া যাইবে সে সময়কে ঠেকাইয়া রাখার চেষ্টাও স্বাভাবিকভাবে দেখা দেয়। মায়ের আঁচল-ধরা ছেলে এই ধরনের প্রচলিত কথার মধ্যে মাতৃহৃদয়ের এ কামনার প্রকাশ স্বীকৃত হইয়াছে। পুত্রগণকে বিদ্যালয়ে পাঠানো ব্যতীত তাহাদিগকে এই কু-প্রভাব হইতে মুক্ত রাখা অসম্ভব বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল। কন্যার বেলায় ইহাকে কু প্রভাব হইতে বিবেচনা করা হইত না; তাহাদিগকে অসহায় এবং অপরের উপর নির্ভরশীল করিয়া গড়িয়া তোলাই বাঞ্ছনীয় মনে হইত। আশা করা হইত যে, বিবাহের পূর্বে যে কন্যা মায়ের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করিত, বিবাহের পর সে স্বামীকেই একান্ত আশ্রয় বলিয়া মনে করিবে। কিন্তু কার্যত খুব কম ক্ষেত্রেই এইরূপ ঘটে। কেহই বুঝিতে পারে নাই যে, বালিকাকে যদি পরনির্ভরশীল করিয়া গড়িয়া তোলা হয় তবে সে স্বাভাবিকভাবে মাতার উপরই নির্ভর করিবে; ইহার ফলে তাহার পক্ষে কোনো পুরুষকে, একান্ত আপনার জন ও সঙ্গিরূপে গ্রহণ করা সম্ভব হইবে না, অথচ ইহাই সুখি দাম্পত্য-জীবনের মূল উপাদান।
দ্বিতীয় কারণটি ফ্রয়েডীয় মতবাদের কাছাকাছি আসে। যৌন ভালোবাসার কিছু উপাদান যখন অপত্যস্নেহের ভিতর প্রকাশ পায় তখনই ইহার উৎপত্তি। ইহার জন্য দুইজনের যে বিপরীত লিঙ্গ হইতে হইবে এমন কোনো কথা নাই। এখানে কেবল কতকগুলি বাসনা ক্রিয়া করিতেছে। যৌন মনোবিজ্ঞানের যে অংশের ফলে মানবসমাজে এক বিবাহ সম্ভবপর হইয়াছে তাহা মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে সে, পৃথিবীতে অন্তত একজন লোকের সুখবিধানের জন্য সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় এবং একান্ত বাঞ্ছিত ব্যক্তি। যেখানে দাম্পত্যজীবনে এই ভাবটি প্রবল সেখানে অন্য কতকগুলি বিষয় অনুকূল থাকিলে স্বামী-স্ত্রীর জীবন সুখবহ হয়। কোনো না কোনো কারণে সভ্যজগতে বহু বিবাহিত স্ত্রীলোকের যৌনজীবন অতৃপ্ত থাকে। এরূপ রমণীর পক্ষে নিজের সন্তানদের নিকট হইতে অবৈধ ও কৃত্রিম উপায়ে যৌন কামনা চরিতার্থ করার বাসনা জাগ্রত হইতে পারে, যে কামনা শুধু পুরুষই যথেষ্টভাবে এবং স্বাভাবিকভাবে পরিতৃপ্ত করিতে পারে। আমি স্পষ্টত কিছু বুঝাইতেছি না; সন্তানের প্রতি মাতার আচরণে প্রক্ষোভগত আলোড়ন, কতক ভাবের তীব্রতা, চুম্বন ও আলিঙ্গনে আনন্দলাভের জন্য চুম্বন ও আলিঙ্গনের আতিশয্যের কথা বলিতেছি। স্নেহশীলা জননীর নিকট ইহা ন্যায়সঙ্গত বলিয়াই বিবেচিত হইত। বস্তুত, কি ন্যায়সঙ্গত এবং কি ক্ষতিকর তাহার পার্থক্য বড়ই সূক্ষ্ম। ফ্রয়েডীয় মতবাদের কতক সমর্থক মনে করেন যে পিতামাতার পক্ষে সন্তানকে চুম্বন করা এবং কোলে করিয়া আদর করা উচিত নহে; ইহা মোটেই সমর্থন করা চল না। পিতামাতার আন্তরিক স্নেহ-প্রীতিতে সন্তানের অধিকার আছে : ইহা তাহাদের জীবনের প্রতি আনন্দোজ্জ্বল দৃষ্টিভঙ্গি দান করে, মনের স্বাস্থ্য বিকাশের পক্ষেও ইহা একান্ত আবশ্যক। কিন্তু পিতামাতার এই স্নেহ সম্বন্ধে এমন ধারণা হওয়া দরকার যেন সে আকাশ ভরা আলো বাতাসের মতোই ইহা গ্রহণ করিতে শেখে, ইহার জন্য কোনো প্রতিদান দিবার চিন্তা যেন তাহার মনে না আসে। সাড়া দেওয়ার প্রশ্নটিই এই স্থানে আসল। স্নেহের প্রতিদানে শিশুর নিকট হইতে কতকগুলি স্বতঃপ্রবৃত্ত সাড়া পাওয়া যাইবে। ইহা সবই কাম্য। কিন্তু ইহা হইবে বালকবৎ সঙ্গীদের বন্ধুত্বের কামনা হইতে সম্পূর্ণ পৃথক পিতামাতার বিশুদ্ধ স্নেহ পুষ্ট সন্তান স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া যে সাড়া দেয় তাহা দূষণীয় নয় কিন্তু মানসিক ভেঁপোমির ফলে সে যখন পিতা বা মাতার বন্ধুত্ব কামনা করে তখনই অস্বাভাবিক অবস্থার উদ্ভব হয়। মনস্তত্ত্বের দিক দিয়া পিতামাতা হইবেন শিশুর জীবনচিত্রের পটভূমি; তাহাদিগকে আনন্দ দেওয়ার জন্য শিশুকে সক্রিয়ভাবে কোনো কিছু করিতে উদ্বুদ্ধ বা প্ররোচিত করা উচিত হইবে না। তাহার বুদ্ধি ও উন্নতিতেই পিতামাতার আনন্দ; সে স্বেচ্ছায় কোনো সাড়া দিলে তাহা পিতামাতা অতিরিক্ত বিশুদ্ধ লাভ হিসাবে গ্রহণ করিবেন, যেন বসন্তকালে চমৎকার আবহাওয়া; কিন্তু এইরূপ সাড়া কাম্য প্রাপ্য বলিয়া বিবেচিত হওয়া উচিত নয়।
কোনো স্ত্রীলোক যদি যৌন ব্যাপারে পরিতৃপ্ত না হন তবে তাহার পক্ষে আদর্শ জননী হওয়া কিংবা ছোট ছোট শিশুদের আদর্শ শিক্ষিকা হওয়া অত্যন্ত কঠিন। মনঃসমীক্ষকগণ যাহাই বলুন না কেন, অপত্যস্নেহ যৌন প্রবৃত্তি হইতে মূলত পৃথক; যৌন বাসনা-উদ্ভূত প্রক্ষোভ ইহাকে ঘোলাইয়া তোলে। মনস্তত্ত্বের বিচারে কুমারী স্ত্রীলোকদিগকে শিক্ষকতা কার্যে নিযুক্ত করা সম্পূর্ণ ভুল। শিক্ষকদের শিক্ষকতার জন্য এমন মহিলাই যোগ্য যিনি তাহাদের নিকট হইতে নিজের প্রবৃত্তির পরিতৃপ্ত কামনা করিবেন না। বিবাহিত জীবনে সুখি স্ত্রীলোক বিনা চেষ্টাতেই এ পর্যায়ে পড়িবেন কিন্তু অন্য স্ত্রীলোকের পক্ষে এজন্য অসাধারণ আত্মসংযমের প্রয়োজন হইবে। অবশ্য একই অবস্থায় পুরুষের পক্ষেও ঠিক এই কথাই খাটে; কিন্তু পুরুষের বেলায় এরূপ ঘটনার সম্ভাবনা অনেক কম এই জন্য যে, তাহাদের অপত্যস্নেহ সাধারণত খুব বেশি প্রবল নয় এবং খুব কম পুরুষেরই যৌনক্ষুধা অপরিতৃপ্ত থাকে।
