পিতা বা মাতার প্রতি অত্যধিক অনুরাগ : পিতা বা মাতার পক্ষে কোনো বয়স্ক সন্তানকে, এমনকি কিশোরকেও এমনভাবে আবৃত করিয়া রাখা উচিত নহে যাহাতে সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করিতে বা অনুভব করিতে না পারে। জনক বা জননীর ব্যক্তিত্ব যদি সন্তানের অপেক্ষা প্রবলতর হয় তবে এইরূপ সহজেই ঘটিতে পারে। দুই-একটি মনোবিকারগ্রস্ত রুগ্ন ব্যক্তির কথা বাদ দিলে আমি বিশ্বাস করি না যে, ছেলেদের মায়ের প্রতি এবং মেয়েদের পিতার প্রতি বিশেষ আকর্ষণের কোনো যৌনগত গূঢ় কারণ আছে। যেই স্থানে পিতামাতার অত্যধিক প্রভাব বিদ্যমান সেই স্থানে পিতা বা মাতা যিনিই সন্তানের ঘনিষ্ঠ সংস্রবে আসিবেন তাহার প্রভাবই বেশি অনুভূত হইবে; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জননীই সন্তানের পড়ে সন্তান পুত্র কি কন্যা তাহা বিচার করিয়া প্রভাবের মাত্রা কমবেশি হয় না। অবশ্য এমন হইতে পারে যে, কোনো মেয়ে তাহার জননীকে পছন্দ করে না এবং পিতার সংস্পর্শে আসার সুযোগ পায় না; সে হয়তো মনে মনে পিতাকেই আদর্শরূপে কল্পনা করিয়া লইতে পারে। এইরূপ ক্ষেত্রে পিতা কিন্তু নিজে কন্যার মনে প্রভাব বিস্তার করেন না, কন্যা নিজেই পিতাকে কল্পনার রঙে ও মায়াস্বপ্নের মাধুর্যে মণ্ডিত করিয়া নিজের অন্তরে স্থাপিত করিয়াছে। একটি সুতা অবলম্বন করিয়া যেমন মিছরি দানা বাঁধিয়া উঠে, দেওয়ালের গায়ের একটি গোজার সঙ্গে যেমন জিনিস ঝুলইয়া রাখা যায়, তেমনই কোনো একটি খুঁটি অবলম্বন করিয়া মনের ভাব আদর্শরূপে গড়িয়া উঠে। খুঁটিটি ভাবের আরোপ-ক্ষেত্র মাত্র; ভাব বা আদর্শের প্রকৃতির সহিত ইহার কোনো সম্বন্ধ নাই। এই স্থানে পিতাকে ঘিরিয়া কন্যার মানসিক ভাব পল্লবিত হইয়া উঠিয়াছে মাত্র কিন্তু পিতা এইজন্য মোটেই দায়ী নহেন। যথায় পিতামাতারা অপরিমিত প্রভাব বিস্তার করিয়া সন্তানকে আচ্ছন্ন রাখেন তাহার অবস্থা স্বতন্ত্র।
কোনো বয়স্ক ব্যক্তি যদি শিশুর নিত্য সঙ্গিরূপে জীবন-বিকাশের প্রথম হইতে প্রভাব বিস্তার করিতে থাকেন তবে পরবর্তীকালেও সেই শিশুকে মানসিক দিক দিয়া দাসরূপে পরিণত করা তাহার পক্ষে সহজ। বয়স্ক ব্যক্তির বুদ্ধি, প্রক্ষোভ অথবা উভয় কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে অভিভূত হইয়া শিশু নিজের বয়স্ক জীবনেও নিজের সত্তাকে হারাইয়া ফেলিতে পারে। এইরূপ অবস্থায় সে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তির মানবদাসে পরিণত হয়। জন স্টুয়ার্ট মিল এই বিষয়ে একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁহার পিতার বুদ্ধিগত প্রভাব তাহার জীবনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন। করিয়াছিল যে, পিতার চিন্তাধারায় যে কোথাও ভুল থাকিতে পারে তাহা তিনি ভাবিতেই পারিতেন না।
শৈশবে শিশুর পক্ষে অন্যের বুদ্ধি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া কতকটা স্বাভাবিক; পিতামাতা বা শিক্ষক যে অভিমত পোষণ করেন ও প্রচার করেন তাহা হইতে মুক্ত থাকা বয়স্ক ব্যক্তির পক্ষেও কঠিন, অবশ্য যদি অন্য কোনো উৎস হইতে বিরুদ্ধ মতবাদের স্রোত প্রবাহিত হইয়া তাহাদিগকে অন্যদিকে পরিচালিত করে, তাহা স্বতন্ত্র কথা। কাজেই ইহা বলা যাইতে পারে যে, লোকের পক্ষে অন্যের বুদ্ধিগত দাস্যতা বা প্রভাব অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়; আমার মনে হয় ইহা নিবারণের উদ্দেশ্যে বিশেষ শিক্ষা দ্বারাই এই প্রভাব মুক্ত হওয়া যাইতে পারে; বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে পূর্বপুরুষদিগের চিন্তা ও ভাবধারাকে আঁকড়াইয়া থাকা বিপজ্জনক, কাজেই শিশুদিগকে পিতামাতার বুদ্ধিগত প্রভাবের দাসত্ব রক্ষা করা উচিত। এ সমস্যা বর্তমান আলোচনার বিষয়ীভূত নহে। বর্তমানে কেবল প্রক্ষোভ ও চিন্তার দাসত্ব আলোচনা করিব।
পিতামাতা সন্তানকে ভালবাসেন; ইহা স্বাভাবিক। কিন্তু অপত্যস্নেহের প্রতিদানে তাহারা যখন পুত্র বা কন্যার নিকট হইতে প্রক্ষোভগত [Emotion] সাড়া কামনা করেন তখনই অন্যায় অস্বাভাবিকতার সূত্রপাত হয়। মনঃসমীক্ষকগণ এই অবস্থাকে বলেন ইডিপাস্ গুঢ়ৈয়া অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন যৌনবাসনার বিকৃত রূপ। জনক-জননীর সঙ্গে পুত্রকন্যার আচরণের মধ্যে যৌন কামনার কোনোরূপ প্রভাব আছে বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না। অল্প কিছুক্ষণ পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বিশুদ্ধ অপত্যস্নেহ সন্তানের নিকট হইতে প্রক্ষোভগত প্রতিদান বা সাড়া কামনা করে না। সন্তান যদি খাদ্য ও প্রতিপালনের জন্য পিতামাতার উপর নির্ভর করে তবেই স্নেহ তৃপ্ত হয়। সন্তানের এই নির্ভরতা। যখন কমিয়া আসে, পিতামাতার স্নেহও কমিয়া আসে। প্রাণিজগতে ইহাই নিয়ম এবং ইতর প্রাণীর উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে ইহা সম্পূর্ণ সন্তোষজনক। দেখা যায়, ইতর প্রাণীর পিতামাতা সন্তানদিগকে খাওয়ায় ও শত্রুর হাত হইতে রক্ষা করে। সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে পিতামাতা উদাসীন হইয়া পড়ে, সন্তানগণ পিতামাতা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিজেদের আহার সংস্থান ও যৌন সম্বন্ধ স্থাপনে চেষ্টিত হয়। ইতোমধ্যে তাহাদের পিতামাতা আবার সন্তানলাভের আয়োজন করিয়া থাকে। ইতর প্রাণিজগতে অপত্যস্নেহ এই সরল নিয়মের ধারা অনুসরণ করিয়া চলিতেছে। কিন্তু মানুষের এই প্রবৃত্তি এত সরলভাবে প্রকাশ পায় না। অসভ্য বর্বর মানবসমাজে দেখা যায়, পিতামাতা আশা করেন বার্ধক্যে অক্ষম হইলে তাহাদের বলিষ্ঠ সন্তানগণ তাহাদিগকে রক্ষা করিবে। সভ্য মানব সমাজে পিতামাতা কামনা করেন, উপার্জনশীল সন্তানগণ তাহাদের ভরণপোষণ করিবে। এই ভাবের কামনা হইতে পিতামাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য কি তাহা নির্দিষ্ট হয় এবং তাহা পুত্র কন্যার বাঞ্ছিত গুণ বলিয়া বিবেচিত হইতে থাকে। এখানে অপত্যস্নেহ অপপ্রয়োগের দুইটি মূল মনোবিজ্ঞানসম্মত কারণের আলোচনা করিব।
