বয়স্ক ব্যক্তি সমবেদনা দেখানোর যতখানি সুযোগ পায় তরুণ কিশোর ততখানি পায় না, কারণ ইহা প্রকাশের ক্ষমতা তাহাদের কম; তাহা ব্যতীত অন্যের কথা বাদ দিয়া নিজেদের জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার চেষ্টাতেই তাহারা থাকে বিভোর। এইসব কারণে অল্প বয়সে শিশুর মধ্যে অকালে এই গুণগুলির বিকাশ ঘটাইবার চেষ্টা না করিয়া আমাদের বরং বয়স্ক ব্যক্তিকে সহানুভূতিশীল ও স্নেহপরায়ণ করিয়া গড়িবার চেষ্টা করা উচিত।
বালকের মনে স্নেহবিকাশের সমস্যা চরিত্রের শিক্ষার অন্যান্য সমস্যার মতোই বিজ্ঞানসম্মত; ইহা মনস্তাত্ত্বিক গতিবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত বলা যায়। শিশুর কাছে কর্তব্য হিসেবে স্নেহ ভালোবাসার অস্তিত্ব নাই। পিতামাতাকে এবং ভাইবোনকে ভালোবাসা উচিত শিশুকে এ কথা বলা নিরর্থক। আদেশ করিলে বা উপদেশ দিলেই শিশু ভালোবাসিতে শুরু করিবে না। যে পিতামাতা সন্তানের ভালোবাসা চান, তাহাদিগকে নিজেদের আচরণ দ্বারা পুত্রকন্যার অন্তরে ইহার উদ্বোধন করিতে হইবে। সন্তানদিগকে এমন দৈহিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য দানের চেষ্টা করিতে হইবে যাহা স্বাভাবিকভাবে তাহাদের মনে জনক-জননীর প্রতি প্রীতির ভাব জাগায়।
.
অপত্য-স্নেহের স্বরূপ
শিশুদিগকে কখনই তাদের পিতামাতাকে ভালোবাসিতে আদেশ করা উচিত হইবে না; শুধু তাহাই নহে, এমন কিছু করা উচিত নহে যাহার উদ্দেশ্য একই, অর্থাৎ অপত্যস্নেহের প্রতিদানে পিতামাতার প্রতি সন্তানের প্রীতির বিকাশ। এইখানে অপত্যস্নেহের সঙ্গে যৌনভালবাসার পার্থক্য। যৌন ভালবাসার ব্যাপারে একপক্ষের আবেদনে (প্রতিদানে) অন্য পক্ষের সাড়া একান্ত আবশ্যক; ইহা স্বাভাবিক, জৈবিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই ইহার প্রয়োজন। কিন্তু অপত্যস্নেহের প্রতিদানে সন্তানের নিকট হইতে সাড়া পাওয়ার কোনো আবশ্যকতা নাই। বিশুদ্ধ অপত্যস্নেহ পিতামাতার মনে এমন একটি ভাব জাগ্রত করে যাহার ফলে তাহার সন্তানকে নিজেদের একটি (বাহ্য) পৃথকৃত অংশ বলিয়া মনে করেন। আপনার পায়ের বুড়া আঙুলের নিকট হইতে প্রতিদানের কৃতজ্ঞতা আশা করেন না। আমার মনে হয় অসভ্য বন্য রমণী তাহার সন্তানের প্রতি ঠিক এমনই ভাব পোষণ করে। সে যেমন নিজের মঙ্গল চায় তেমনি চায় সন্তানের মঙ্গল, বিশেষ করিয়া যতদিন শিশু নিতান্ত ছোট থাকে। নিজ দেহের যত্ন লওয়ার সময় যেমন সে আত্মত্যাগ [self-denial] করিতেছে বলিয়া ভাবে না, তেমনই সন্তানের যত্ন পরিচর্যা করার সময়ও সন্তানের জন্য আত্মত্যাগ করা হইতেছে বলিয়া তাহার মনে হয় না; কাজেই কোনো প্রতিদানের আশা সে করে না। যতদিন শিশু অসহায় থাকে ততদিন সে যে জননীকে একান্তভাবে চাহে ইহাই জননীর স্নেহের প্রতিদান। পরে, সে যখন ক্রমে বাড়িয়া উঠে, জননীর স্নেহ কমিয়া আসে এবং সন্তানের উপর প্রতিদানে কোনো কিছুর দাবি বাড়িতে থাকে। জীবজন্তুর মধ্যে দেখা যায় সন্তান সাবালক হইলে অপত্যস্নেহ ফুরাইয়া যায়; জনক-জননী সন্তানের উপর কোনো দাবিও রাখে না কিন্তু মানুষের সমাজে, এমনকি আদিম মানুষের মধ্যেও, ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায়। পুত্র যখন সবল বলিষ্ঠ যোদ্ধাতে পরিণত হয় তখনও পিতামাতা কামনা করে যে তাহাদের বার্ধক্যে সে তাহাদিগকে ভরণ-পোষণ করিবে। মানুষের দূরদৃষ্টি বৃদ্ধির ফলে পিতামাতা অপত্যস্নেহ হইতেও কিছু লাভের আশা করিতে শুরু করে। বৃদ্ধ বয়সে তাহারা দুর্বল ও অক্ষম হইয়া পড়ে; সন্তানকে সস্নেহে পালন করার প্রতিদানে তাহারা বার্ধক্যে যত্ন ও সাহায্য আশা করে। ইহা হইতেই জনক-জননীর প্রতি সন্তানের কর্তব্যের মূলনীতির উৎপত্তি; মানুষের ধর্মশাস্ত্রেও এই নীতি স্থান পাইয়াছে। পরে ক্রমে যখন সুশৃঙ্খল শাসন-ব্যবস্থা গড়িয়া ওঠে এবং মানুষ ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিকার ও ভোগ করিতে থাকে তখন বৃদ্ধ জনক-জননীর অসহায় ভাব অনেকটা কমিয়া আসে; নিজের সম্পত্তি থাকিলে তাহাদিগকে তো বয়স্ক সন্তানের উপর ভরণপোষণের জন্য নির্ভর করিতে হইবে না। মানুষ যখন ইহা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করে তখন পিতামাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যবোধও নীতি হিসাবে ক্রমে লোপ পায়। বর্তমান জগতে পঞ্চাশ বৎসর বয়স্ক লোকও আশি বৎসরের বৃদ্ধ পিতামাতার উপর আর্থিক দিক দিয়া নির্ভরশীল হইতে পারে; কাজেই এখনও পিতার প্রতি সন্তানের ভালবাসার চেয়ে সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহই প্রধান হইয়া রহিয়াছে। ইহা অবশ্য বিত্তশালী লোকদের ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে প্রযোজ্য। দিনমজুরদের জীবনে পিতাপুত্রের মধ্যে পূর্বের ভাবই এখনও বর্তমান আছে, তবে বৃদ্ধ বয়সে পেনশন বা ভাতার ব্যবস্থা থাকার ফলে এভাবও ক্রমে শিথিল হইয়া আসিতেছে। পিতামাতার প্রতি সন্তানের স্নেহ ক্রমে গুণের তালিকা হইতে বাদ পড়িতেছে কিন্তু সন্তানের প্রতি পিতামাতার স্নেহ শিশুর জীবনে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করিয়া রহিয়াছে।
পিতামাতার সঙ্গে সন্তানের স্নেহের সম্পর্ক, কিন্তু মনঃসমীক্ষকগণ এ সম্বন্ধে কিছু নূতন তথ্য পরিবেশন করিয়াছেন। তবে এইগুলি বিচারযোগ্য কি না সেই বিষয়ে সন্দেহ আছে। পিতা বা মাতার প্রতি সন্তানের অত্যধিক অনুরক্তিকে ইহারা যৌনবাসনার নবরূপ প্রকাশ বলিয়া মনে করেন।
