সমবয়সীদের উপযোগিতা : বেশি বয়সী ও কম বয়সী শিশুদের প্রয়োজনীয়তা আছে কিন্তু সমবয়সীদের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি, বিশেষত শিশুর চার বৎসর বয়স হইতে আরম্ভ করিয়া বেশির দিকে। সমবয়স্কদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করিতে হয় তাহা শেখা বিশেষ প্রয়োজন। জগতে যত কিছু অসমতা তাহার অধিকাংশই কৃত্রিম; আমাদের আচরণের ভিতর দিয়া এইগুলি দূর করিতে পারিলেই সর্বাপেক্ষা ভালো হইত। ধনীলোকেরা নিজদিগকে তাঁহাদের পাঁচক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মনে করেন এবং সমাজে যেইরূপ আচরণ করেন পাঁচকের সঙ্গে সেইরূপ করেন না। কিন্তু তাহারাই আবার একজন ডিউকের তুলনায় নিজদিগকে নিকৃষ্ট মনে করেন এবং তাহার সঙ্গে আচরণে তাঁহাদের আত্মমর্যাদাবোধের অভাবই পরিলক্ষিত হয়। এই দুই জায়গাতেই তাহারা ভুল করেন; পাঁচক এবং ডিউক উভয়ের প্রতি একইরূপ ভাব পোষণ করা এবং একইরূপ আচরণ করা উচিত। যে যৌবনে বয়সের তারতম্য অনুসারে স্তরভেদ করা হয় তাহা কৃত্রিম নয়; এই জন্যই যে সামাজিক অভ্যাসগুলি পরবর্তিকালে কাজে লাগিবে তাহা সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে অর্জন করা উচিত। সমানে সমানে সকল খেলা এবং স্কুলের প্রতিযোগিতা ভালো জমে। স্কুলে যে সুনাম বা প্রতিষ্ঠা লাভ করে তাহা সে অর্জন করে নিজের চেষ্টায়। সে সকলের প্রশংসা লাভ করিতে পারে অথবা সকলের ঘৃণার পাত্রও হইতে পারে; ইহা নির্ভর করে তাহার চরিত্র ও শক্তির উপর। স্নেহশীল পিতামাতা সন্তানকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়া আদুরে গোপাল সৃষ্টি করেন, এইরূপ ক্ষেত্রে ছেলে আত্মশক্তি প্রকাশে বিশেষ উৎসাহিত হয় না; সন্তানের প্রতি স্নেহশীল পিতামাতা এমন কঠোর পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে শিশুর স্বতঃপ্রবৃত্ততা রুদ্ধ হইয়া যায়। কাজেই দেখা যায় অতিরিক্ত স্নেহ প্রদর্শনের ফলে যে সব শিশুর কর্মশক্তি লোপ পায়, অতিরিক্ত কঠোরতার ফলেও তেমনই তাহার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কাজের উৎসাহ ও উদ্যম নষ্ট হইয়া যায়। সমবয়সীরাই কেবল মুক্ত প্রতিযোগিতায় এবং সমানভাবে সহযোগিতার ভিতর দিয়া শিশুদের কাজে স্বতস্ফূর্ত আনিতে পারে। স্বেচ্ছাচারিতা না দেখাইয়াও কিভাবে আত্মসম্মান বজায় রাখা যায়, হীনতা প্রকাশ না করিয়া কিভাবে অন্যের প্রতি ভদ্র ব্যবহার করা যায় সমবয়সীদের সঙ্গে আচরণের মাধ্যমেই তাহা ভালোভাবে শিক্ষা করা যায়। এই জন্য শিশুরা ভালো স্কুলে সদাচরণ শিক্ষার যে সুবিধা পায় পিতামাতা হাজার চেষ্টা করিয়াও বাড়িতে তাহা দিতে পারেন না।
শিশু ও কিশোরের জীবনে সমবয়সীদের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বলা হইল। আরও কয়েকটি কারণে তাহাদের সঙ্গলাভ একান্ত আবশ্যক। শিশুর দেহ ও মনের সুস্থ বিকাশের জন্য খেলা অত্যাবশ্যক কিন্তু প্রথম বৎসরের পর শিশু অন্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে না হইলে খেলিয়া আনন্দ পায় না। খেলিতে না পাইলে শিশু হয় দুর্বল; জীবনের আনন্দের আস্বাদ সে পায় না। আনন্দই শিশুর জীবন রসায়ন। ইহা হইতে বঞ্চিত হওয়ায় তাহার মনে উৎকণ্ঠা বাড়িয়া উঠিতে থাকে। অবশ্য শিশুকে তিন বৎসর বয়স হইতেই একটি বিদেশি ভাষা শিকাইতে আরম্ভ করিয়া সকল প্রকার বাল্যসুলভ চপলতা হইতে দূরে সরাইয়া রাখা যায়, যেমন ঘটিয়াছিল জন স্টুয়ার্ট মিলের জীবনে। কেবল জ্ঞানসঞ্চয় দিক হইতে বিবেচনা করিলে ইহার ফল ভালই হয় বলিতে হইবে কিন্তু সকল দিক বিবেচনা করিয়া এই প্রণালীর প্রশংসা করা যায় না। মিল তাহার আত্মজীবনীতে বলিয়াছেন– কৈশোরের একসময়ে তাহার মনে দারুণ উৎকণ্ঠা উপস্থিত হইয়াছিল এই ভাবিয়া যে, নানা সুরের সংমিশ্রণ কোনো না কোনো সময় শেষ হইয়া যাইবে; তখন তো আর নূতন গান রচনা করা চলিবে না। এই দুশ্চিন্তায় তিন আত্মহত্যা করার উপক্রম করিয়াছিলেন। ইহা স্পষ্টই বোঝা যায় যে, এই ধরনের মানসিক আলোড়ন স্নায়বিক দুর্বলতারই পরিচায়ক। মিলের পিতাও একজন বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন কিন্তু পিতার দার্শনিক মত যে কোথাও ভুল হইতে পারে পুত্র তাহা চিন্তাই করিতে পারিতেন না। তাঁহার মানসিক দাস্যতা এইভাবে তাঁহার বিচার-শক্তির মূল্য অনেক হ্রাস করিয়া দিয়াছিল। সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থার মধ্য দিয়া যৌবনে উপনীত হইলে হয়তো মিল আরও বেশি সতেজ বুদ্ধি ও অধিকতর মৌলিকতার অধিকারী হইতেন। আর যাহাই হউক, জীবন উপভোগ করার শক্তি তিনি নিশ্চয় অনেক বেশিমাত্রায় লাভ করিতে পারিতেন। আমি নিজেও ষোলো বৎসর বয়স পর্যন্ত সমবয়সীদের সঙ্গ ও সাধারণ আনন্দ হইতে বঞ্চিত হইয়া নিঃসঙ্গভাবে লালিত হইয়াছিলাম। মিল যেইরূপ বর্ননা করিয়াছেন, কৈশোরে আমারও ঠিক ওইরূপ অবস্থা মনে আসায় আমিও আত্মহত্যার ইচ্ছা করিয়াছিলাম। আমার মনে হইয়াছিল–গতিবিজ্ঞানের নিয়মানুসারে দেহ চালিত হইতেছে, ইচ্ছা বলিয়া কোনো কিছু নাই; ইহা নিছক ভ্রান্তিমাত্র। এই চিন্তা দুশ্চিন্তার আকার ধারণ করিয়া আমার আত্মহত্যার বাসনা জাগাইয়াছিল। পরে সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশা করার সময় বুঝিলাম, কাহারও সঙ্গে আমার মতের বনিবনা হয় না। আমার চিন্তা ও ভাবধারার পরিবর্তন হইয়াছে কি না, কতদূরেই বা আমি আগের মতোই আছি তাহা আমার পক্ষে বলা সম্ভবপর নয়।
সমবয়সীদের সঙ্গে মেলামেশার স্বপক্ষে সব রকম যুক্তি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, কতক বালক-বালিকাকে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। ব্যক্তি হিসেবে ইহাদের মধ্যে অসাধারণত্ব থাকিতে পারে। কোনো বালকের যদি দৈহিক দুর্বলতার সঙ্গে অস্বাভাবিক [Abnormal] মানসিক শক্তি থাকে তবে সে সাধারণ সঙ্গীদের সহিত খাপ খাওয়াইয়া চলিতে নাও পারে; হয়তোবা সঙ্গীরা খেপাইয়া উত্ত্যক্ত করিয়া তাহাকে পাগল করিয়া দিতে পারে। অসাধারণ মানসিক শক্তি অনেক সময় পাগলামির পর্যায়ে পড়ে; এইরূপ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মনীষাসম্পন্ন বালকের জন্য পৃথক ব্যবস্থা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। প্রথমে বালকের অস্বাভাবিক অনুভূতিশীলতার কারণ অনুমান করিয়া ধৈর্য ও যত্নের সহিত ইহা নিরাময় করার চেষ্টা করিতে হইবে। বালক যাহাতে অত্যাচারিত না। হয় সেইদিকে বিশেষ লক্ষ রাখা আবশ্যক। আমার মনে হয় শৈশবে শিশুর শিক্ষার ত্রুটির মধ্যে ইহার কারণ খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে। শৈশবে কুশিক্ষার ফলে পরিপাকক্রিয়ার ব্যাঘাত অথবা স্নায়ুর বিকলতা ঘটা অসম্ভব নয়। শৈশবে যথোপযুক্তভাবে এবং বিজ্ঞতার সহিত লালন-পালন করিলে অধিকাংশ শিশুই সুস্থ, সবল, স্বাভাবিকরূপে বাড়িয়া ওঠে; অন্য শিশুদের সঙ্গ তাহাদের দেহের এবং মনের শক্তিবিকাশে অনুকূল অবস্থাই সৃষ্টি করে। তবু খুব অল্পসংখ্যক ক্ষেত্রে হয়তো ব্যতিক্রম দেখা দিতে পারে, যেমন দেখা যায় প্রতিভাবানদের জীবেন। এইরূপ অবস্থায় অসাধারণ বালককে বরং স্কুলে না পাঠাইয়া নিরিবিলিতে আত্মবিকাশের বন্দোবস্ত করিয়া দেওয়া উচিত।
১১. স্নেহ ও মনোবেদনা
অনেকে মনে করিতে পারেন অকারণে আমি এ পর্যন্ত এ স্নেহ সম্বন্ধে কোনো কথা উল্লেখ করি নাই, অথচ শিশুর সুচরিত্রের ইহা একটি প্রধান উপাদান। ইহা স্বীকার্য যে, স্নেহ ও জ্ঞান যথাযোগ্য আচরণের জন্য একান্ত আবশ্যক কিন্তু উন্নতির শিক্ষার আলোচনা প্রসঙ্গে আমি স্নেহ বা ভালোবাসা সম্বন্ধে কিছুই বলি নাই, তাহার কারণ আছে। আমার উদ্দেশ্য এই যে শিশুকে যত্নের সঙ্গে উপযুক্ত শিক্ষা দিলে তাহার ফলস্বরূপ স্নেহপ্রীতি আপনা আপনি বিকাশ লাভ করিবে,সচেতন চেষ্টা দ্বারা জোর করিয়া শিশুর কাছ হইতে ইহা আদায় করার কোনো প্রয়োজন নাই। কি ধরনের স্নেহ বাঞ্ছনীয় এবং শিশুর ক্রমবিকাশের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে তাহার মন, প্রকৃতি কেমন থাকে তাহাও জানা দরকার। দশ-বারো বৎসর হইতে যৌবনাগম পর্যন্ত বালকের স্নেহপ্রীতি বিশেষ মোটেই থাকে না এবং প্রকৃতির উপর জোর করিয়াও কোনো লাভ নাই।
