বেশি বয়সী শিশুর উপকারিতা : শিশুর ক্রমবিকাশে সহায়তা করার জন্য বেশি বয়সী, কম বয়সী অপর শিশুদের প্রয়োজন আছে। স্কুলে বা অন্যত্র সমবয়সী শিশুরাই একত্র হইয়া খেলাধুলা করে; গৃহেই প্রথমোক্ত দুই প্রকার শিশুর সাহচর্য সীমাবদ্ধ থাকে। বেশি বয়সী শিশুরা ছোটদের সম্মুখে এমন এক আদর্শ তুলিয়া ধরে যাহা তাহাদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব। শিশুরা যাহাতে তাহাদের বড়দের খেলায় যোগদানের যোগ্য হইতে পারে সেইজন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে। বেশি বয়সী শিশুরা ছোটদের সঙ্গে খেলিতে স্বাভাবিকভাবে খেলে, কোনো প্রকার ভান করে না কিন্তু বয়স্ক ব্যক্তিরা সেইরূপ করিতে পারে না। তাহার কারণ বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর শক্তির সমতা নাই; সে নিজের সুখের জন্য শিশুর সঙ্গে খেলে না, শিশুকে আনন্দ দেওয়ার জন্যই খেলে, কাজেই তাহার পক্ষে ভান না করিয়া উপায় নাই। সে শিশুকে নিজের সমকক্ষ মনে করিতে পারে না, করা উচিতও নয়। শিশু যেমন সহজে ও সানন্দে বড় ভাইবোনের অনুগত হয় তেমন কোনো বয়স্ক ব্যক্তির হয় না; অবশ্য যদি অতিরিক্ত শাসন করা হয় তবে অন্য কথা; এইরূপ ক্ষেত্রে শিশু ক্রীতদাসের মতো বয়স্ক ব্যক্তির অনুগত হয়, ইহাতে শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ থাকে না।
অপরের অনুগত হইয়া কোনো কাজে সহযোগিতা করার অভ্যাস শিশুরা অপর শিশুর নিকট হইতে লাভ করে। বয়স্ক ব্যক্তিরা ইহা শিক্ষা দিতে গেলে দুইটি অসুবিধা দেখা দেয়। প্রথম, তাহারা যদি জোর করিয়া সহযোগিতা আদায় করিতে না চান, তবে শিশুদের মিথ্যা ভানকেই সত্য বলিয়া গ্রহণ করার ভান করিতে হইবে। সহযোগিতা–তাহা সত্য হউক, আর মিথ্যাই হউক তাহার যে কোনো মূল্য নাই বা তাহা যে সর্বদা বর্জনীয় এমন কথা বলিতেছি না। বেশি বয়সী ও কম বয়সী শিশুর মধ্যে যে সহযোগিতা থাকে তাহা যেমন স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত, বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে ছোটদের সহযোগিতায় তেমন সম্ভবপর নয়। এইরূপ অবস্থায় উভয় পক্ষ বহুক্ষণ সানন্দে সহযোগিতা করিতে পারে না।
বাল্য, কৈশোর, যৌবন সকল অবস্থাতেই কম বয়সীদের শিক্ষাদান ব্যাপারে কিছু বেশি বয়সীর যথেষ্ট প্রভাব বিদ্যমান থাকে; এই শিক্ষা শ্রেণির পাঠদান হইতে স্বতন্ত্র ইহা কাজের সময়কার বাহিরের শিক্ষা। কিছু বেশি বয়সী ছেলে বা মেয়ে তাহাদের অপেক্ষা কিছু কম বয়সীর উচ্চাকাচ্চা জন্মায় ও কর্ম-প্রেরণা দান করে; ছোটদের কোনো কঠিন সমস্যা তাহারা বয়স্ক ব্যক্তিদের তুলনায়ও ভালোভাবে বুঝাইয়া দিতে পারে, কারণ তাহারা নিজেরাও এ সমস্যার সমাধান করিয়া বিষয়টি অধিগত করিয়াছে এবং সেই জন্যই তাহারা ছোটদের অসুবিধা ভালোভাবে বুঝিতে পারে ও তাহা দূর করিবার উপায় দেখাইতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমি আমার অপেক্ষা কিঞ্চিৎ বয়োজ্যেষ্ঠদের নিকট হইতে এমন অনেক কিছু শিখিয়াছিলাম যাহা প্রবীণ জ্ঞানবৃদ্ধ অধ্যাপকদিগের নিকট হইতে শিখিতে পারিতাম না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক জীবনে ছাত্রদের বয়সের তারতম্য ভিন্ন ভিন্ন কঠিন স্তর সৃষ্টি করে না, অর্থাৎ বয়সের পার্থক্য থাকিলেও ছাত্রগণ পরস্পরের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেশে এবং ভাবের বিনিময় করে সেইখানেই বেশি বয়সীদের প্রভাব কম বয়সীদের সুফল প্রদান করে কিন্তু যেইখানে বেশি বয়সী ছাত্ররা কম বয়সীদের সঙ্গে মেলামেশাকে মর্যাদাহানিকর মনে করে সেইখানে এইরূপ ফলোভের সম্ভাবনা নাই।
ছোট ছোট ছেলেমেয়ের বিশেষ করিয়া তিন হইতে ছয় বৎসর বয়স্কদের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাহারা কিঞ্চিৎ বেশি বয়সীদের কতকগুলি নৈতিক গুণবিকাশে সহায়তা করে। শিশু যখন বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকে তখন যে গুণগুলি দুর্বলের সঙ্গে আচরণে বিকাশ লাভ করে, সেইগুলি আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায় না। শিশুকে শিখানো দরকার–তাহার ছোট ভাইবোনদের জিনিস কাড়িয়া লইতে নাই, ছোট কেহ হঠাৎ যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে তাহার ইটের খেলনা ঘর ভাঙিয়া ফেলে তবে অত্যধিক রাগ দেখাইতে নাই, তাহার অব্যবহৃত খেলনা যদি অন্য কেহ চায় তবে জমাইয়া না রাখিযা দেওয়াই ভালো ইত্যাদি। তাহাকে শিখানো দরকার যে, কচি শিশুকে অসতর্কভাবে বা শক্তভাবে ধরিয়া নাড়াচাড়া করিলে সে ব্যথা পায়। অনিচ্ছায় এইভাবে কোনও শিশুকে ব্যথা দিয়া কাঁদাইলে তাহার নিজেরও মনে কষ্ট অনুভব করা উচিত। এমনই ছোট শিশুকে রক্ষা করিতে বয়স্ক ব্যক্তিদিগকেও শক্ত কথা শুনানো বা ধমক দেওয়া যায় কিন্তু অন্য কোনও কারণে এইরূপ করা শোভন হইবে না; এইরূপ অপ্রত্যাশিত আচরণ ছোটদের মনের উপর দাগ রাখিয়া যায়। এই সবই শিক্ষাপ্রদ কিন্তু স্বাভাবিকভাবে এইরূপ সৃষ্টি না হইলে অন্য কোনো উপায়ে এই শিক্ষা দেওয়া চলে না।
শিশুকে বস্তুনিরপেক্ষ সাধারণ নৈতিক উপদেশ দান সময়ের অপব্যবহার ও মূর্খতারই পরিচায়ক। শুধু বাস্তব ঘটনাই শিশুর কাছে সত্য, ঘটনাও স্বাভাবিকভাবে ঘটা চাই। বয়স্ক ব্যক্তিরা যাহা মনে করেন নৈতিক উপদেশ, শিশুর নিকট তাহার বিশেষ কোনও আকর্ষণ নাই। শিশু উপদেশ হইতে তেমন শেখে না যেমন শেখে উদাহরণ হইতে। এইজন্যই শিশুর নিকট উপদেশের অপেক্ষা উদাহরণের মূল্য বেশি। মিস্ত্রিকে কাজ করিতে দেখিলে শিশু তাহার কাজ অনুকরণ করে; শিশু তাহার পিতামাতাকে অন্যের সহিত ভদ্র ও সদয় ব্যবহার করিতে দেখিলে নিজেও তাহা অনুকরণ করিতে চেষ্টা করে। উভয়ক্ষেত্রে শিশু যাহা অনুকরণ করিতে চায় তাহা মর্যাদাকর মনে করে। আপনি নিজে যদি ছেলেকে মিস্ত্রির করাত খুব ভালোভাবে ব্যবহার করার উপদেশ দেন কিন্তু যেমন তেমন করিয়া ব্যবহার করেন তবে আপনার উপদেশ কার্যকরি হইবে না। আপনি যদি শিশুকে তাহার ছোটবোনের প্রতি সদয় ব্যবহার করিতে উপদেশ দেন কিন্তু নিজেই তাহার উপর নির্দয় আচরণ করেন তবে আপনার উপদেশ ব্যর্থ হইবে। যদি আপনার কোনো কাজের ফলে ছোট শিশু কাঁদে যেমন নাক পরিষ্কার করিয়া দিতে গেলে কাঁদিতে পারে তবে তাহার তুলনায় বেশি বয়সী শিশুদিগকে এইরূপ দাঁড়াইয়া আপনাকে নির্দয় আচরণ হইতে থামাইতে চেষ্টা করিতে পারে। আপনার আচরণে শিশুর মনে যদি এই ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, ছোট শিশুকে কাঁদাইয়া আপনি নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়াছেন, তবে তাহার নিষ্ঠুরতার আবেগকে দমন করা আপনার পক্ষে সম্ভব হইবে না।
