নিষ্ঠুরতা নিবারণের উপায় : শিশু অন্যের উপর নিষ্ঠুর আচরণ করিলে তাহার উপরও অনুরূপ আচরণ করিয়া যদি তাহার নিষ্ঠুরতার মনোভাব দূর করিতে চান, তবে এ প্রণালী প্রথম হইতেই আরম্ভ করিতে হইবে। ইহার কারণ স্পষ্ট। অন্যের উপর নির্দয়তার প্রতিদানে শিশুর উপর যে অনুরূপ নির্দয় ব্যবহার করিবেন, তাহা তো গুরুতর হওয়া চলিবে না।
যখন নিষ্ঠুরতার প্রতিদানে নিষ্ঠুরতা প্রয়োগ করিবেন শিশু যেন বুঝিতে পারে আপনি রাগিয়া তাহাকে শাস্তি দিতেছেন না, তাহার শিক্ষার জন্যই ওইরূপ ব্যবস্থা করিতেছেন। তাহাকে বলিতে পারেন- দেখ তোমার ছোটবোনকে তুমি এমনিভাবে কষ্ট দিয়েছ। আঘাত পাইয়া ছেলে প্রতিবাদ কিরবে। তখন আপনি বলিবেন–বেশ তোমার যদি ইহা ভালো না লাগে অন্যের উপরেও তো তোমার এরূপ করা উচিত নয়। এইরূপে শিশু যদি সঙ্গে সঙ্গে সহজভাবে শিক্ষা পায়, তবে তাহার এই ধারণা হইবে যে, অন্যের সুখদুঃখ বোধকে মানিয়া চলা উচিত। ইহার ফলে কখনো গুরুতর নিষ্ঠুরতার উদ্ভব হইবে না।
নৈতিক উপদেশ : নৈতিক উপদেশ সকল ঠিক সময়ে এবং বস্তুসাপেক্ষভাবে (concrete) প্রয়োগ করা উচিত। শিশুকে উপদেশ দিবার জন্য আপনি ইচ্ছা করিয়া কোনো ঘটনার অবতারণা করিবেন না। স্বাভাবিকভাবে কোনো ঘটনা ঘটিলে তখন তাহার সুযোগ লইবেন। মনে রাখিতে হইবে, একটিমাত্র সুযোগ অবলম্বন করিয়া ব্যাপকভাবে নানা উপদেশ দিলে কোনো ফল হইবে না। কোনো একটি বিশেষ ঘটনায় শিশু যে উপদেশ পাইবে পরে অনুরূপ কোনো ক্ষেত্রে সে নিজেই উহা প্রয়োগ করিতে পারিবে। কোনগুলি মানুষের সগুণ এবং কিভাবে তাহা প্রকাশ করিতে হয়, সে সম্বন্ধে সাধারণ নীতি জানিয়া তাহা অনুসরণ করা শিশুর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। কোনো বিশেষ অবস্থায় কিরূপ আচরণ করিতে হয় তাহা জানাই বরং তাহার পক্ষে সহজ। পরে অনুরূপ অবস্থা ঘটিলে সে পূর্বের অভিজ্ঞতার সাহায্যে যথাযথ আচরণ করিতে পারিবে।
সাহসী হও, দয়ালু হও, সাধারণভাবে এরূপ উপদেশ দিবেন না; বরং কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে তাহাকে সাহস দেখাইতে উৎসাহ দিন; পরে বলুন–বেশ? এই তো তুমি সাহসী ছেলে, তাহার খেলনাটি তাহার ছোট ভাই বা বোনকে খেলিতে দিতে বলুন। খেলনা পাইয়া শিশু যখন আনন্দে উল্লসিত হইয়া উঠিবে, তখন খোকাকে বলুন–এই তো তুমি ঠিক কাজ করেছ। খোকার বেশ দয়া আছে। নিষ্ঠুরতা নিবারণ করিতেও এই নীতি প্রয়োগ করিতে হইবে। লক্ষ্য রাখিবেন কখনো ইহার সূচনা দেখিতে পান কিনা; নির্দয়তার ভাব বাড়িতে না দিয়া অঙ্কুরে ইহা নিবারণ করিতে হইবে।
সকল রকম চেষ্টা সত্ত্বেও যদি বয়স বাড়িলে শিশুর নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়, তবে রোগের মতো ইহার প্রতিবিধান করিতে হইবে। হাম বা অন্য কোনও প্রকার রোগ হইলে শিশুকে যেমন অপ্রীতিকর অবস্থা ভোগ করিতে হয়, এক্ষেত্রেও তেমনি ভোগ করিতে হইবে; শিশু যে অপরাধী এবং দুষ্ট হইয়াছে, এমন ভাব তাহার মনে জন্মাইবার প্রয়োজন নাই। কিছু সময়ের জন্য তাহাকে অন্যান্য বালক-বালিকা এবং প্রাণীর নিকট হইতে পৃথক করিয়া রাখিতে হইবে; তাহাকে বুঝাইতে হইবে যে, অপরের সঙ্গে তাহাকে মিশিতে দেওয়া নিরাপদ নয়। তাহার প্রতি অন্যে নির্দয় ব্যবহার করিলে তাহার কি দশা হইত তাহাও শিশুকে যথা সম্ভব বুঝান উচিত। তাহাকে ইহা উপলব্ধি করাইতে হইবে যে, নির্দয়তার আবেগ তাঁহার দুর্ভাগ্যের সূচনা করিতেছে এবং তাহার বয়োজ্যেষ্ঠরা তাহাকে ভবিষ্যতে ইহা হইতে রক্ষার চেষ্টাই করিতেছেন। আমার বিশ্বাস, অল্প কিছু মনোরোগ বিশিষ্ট শিশু ছাড়া অন্য সকলের পক্ষেই এ প্রণালী সুফল প্রদান করিবে।
দৈহিক শাস্তির কুফল : দৈহিক শাস্তিদানকে আমি কখনোই যুক্তিযুক্ত বলিয়া বিশ্বাস করি না, তবে মৃদু আকারে দিলে ইহা বিশেষ ক্ষতি করে না, যদিও ভালও কিছু করে না, কঠোর আকারে দিলে ইহা নির্দয়তা সৃষ্টি করে। ইহা সত্য যে, শাস্তিদাতার প্রতি অনেক সময় শিশুর ক্রোধের উদ্রেক হয় না। যেখানে শিশুকে প্রায়ই শাস্তিভোগ করিতে হয়, সেখানে সে ইহাকে স্বাভাবিক মনে করে এবং নিজেকে ইহার সঙ্গে খাপ খাওয়াইয়া নেয়। কিন্তু ইহা তাহার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে যে, কর্তৃত্ব বজায় রাখিবার জন্য এইরূপ দৈহিক শাস্তি প্রদান করা ন্যায়সঙ্গত। যে শিশু বয়স্ক ব্যক্তিতে পরিণত হইয়া কর্তৃত্ব করিবে, তাহার পক্ষে এ শিক্ষা বিপজ্জনক।
তাহা ছাড়া পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে যে খোলাখুলি সরল বিশ্বাসের সম্বন্ধ থাকা উচিত শাস্তির কঠোরতা তাহা নষ্ট করিয়া দেয়। আধুনিক পিতা চান তাহার পুত্রকন্যা তাহার উপস্থিতিতে নিঃসংকোচে অবস্থান করুক; তাঁহাকে আসিতে দেখিলে তাহারা যেন খুশি হয়–তিনি ইহা চান। তিনি যতক্ষণ উপস্থিত আছেন ততক্ষণ সবাই মিথ্যা ভয়ে সংকোচে (কাচুমাচু হইয়া) চুপচাপ থাকিবে আর আড়ালে যাইলেই নরকের তাণ্ডব শুরু করিবে ইহা পিতার নিকট বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের অকৃত্রিম প্রীতি লাভ করা জীবনের যে কোনো বড় আনন্দ লাভের মতই লোভনীয়। আমাদের পূর্বপুরুষগণ এই আনন্দ কি জানিতেন না, কাজেই তাহারা কি হারাইতেছিলেন তাহাও বুঝিতেন না। তাঁহারা সন্তানদিগকে শিক্ষা দিতেন যে, পিতামাতাকে ভালোবাসা তাহাদের কর্তব্য কিন্তু কার্যত এই কর্তব্য পালন করা এক রকম অসম্ভব করিয়া তুলিতেন। এই অধ্যায়ের প্রথমে কবিতায় যে-মেয়েটির কথা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহার পিতা যখন বেত্রাঘাতে তাহাকে দমন করিতে আসিতেন, তখন সে নিশ্চয়ই খুশি হইত না। যতদিন পর্যন্ত লোকে বিশ্বাস করিত যে হুকুম করিয়া ভালবাসা আদায় করা সম্ভব, ততদিন তাহারা শিশুদিগের অকৃত্রিম প্রক্ষোভ [Emotion] হিসাবে স্নেহ প্রীতি লাভ করিতে চেষ্টা করে নাই। ইহার ফলে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সম্বন্ধ ছিল কঠোর রূঢ় ও নির্দয়। শিশুর শাস্তিবিধান এই সমগ্র মনোভাবের সঙ্গে সংযুক্ত এবং এই মনোভাব দ্বারাই পুষ্ট। ইহাই বিস্ময়ের ব্যাপার যে, যে সকল লোক কোনো স্ত্রীলোকের বিরুদ্ধে হাত তোলার কথা কল্পনাও করিতে পারিত না, তাহারাই অসহায় অরক্ষিত শিশুর উপর দৈহিক নির্যাতন করিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হইত না। সৌভাগ্যের কথা এই যে, গত একশত বৎসরের মধ্যে পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রীতির সম্বন্ধ গড়িয়া উঠিয়াছে এবং ইহারই ফলে শাস্তির নীতিই আগাগোড়া পাল্টাইয়া গিয়াছে! আমি আশা করি, শিক্ষাক্ষেত্রে যে উন্নতির ভাবধারার প্রবর্তন হইয়াছে তাহা ক্রমে মানুষের অন্যান্য কর্মক্ষেত্রেও প্রসারিত হইবে, কারণ আমাদের শিশুদের সহিত ব্যবহারে যেমন, অন্যত্রও তেমনি উহার বিশেষ প্রয়োজন আছে।
১০. অপর শিশুর সাহচর্য
পিতামাতা এবং শিক্ষক কিভাবে নিজেদের চেষ্টায় শিশুর চরিত্রগঠনে সহায়তা করিতে পারেন, এ পর্যন্ত তাহাই আলোচনা করা হইয়াছে কিন্তু অনেক কিছু আছে যাহা অপর শিশুর সাহায্য ব্যতীত বিকাশ করা যায় না। শিশুর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীর প্রয়োজনও বাড়িতে থাকে; বাস্তবিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রের সতীর্থ সঙ্গীর যত প্রয়োজন এমন আর কোনো সময়ে নয়। শিশুর প্রথম বৎসরে প্রথম কয়েক মাসে অন্য শিশুর কোনো প্রয়োজনই হয় না, শেষ তিন মাসে সামান্য সাহায্য করে মাত্র। এই সময় কিঞ্চিৎ অধিক বয়স্ক শিশুরা উপকারে আসে। পরিবারের প্রথম শিশু সাধারণত হাঁটিতে এবং কথা বলিতে শিখিতে বেশি সময় নেয়, কারণ বয়স্ক ব্যক্তিদের কার্যকলাপ ও শক্তি তাহার তুলনায় এত বেশি যে তাহাদিগকে অনুসরণ করা কঠিন। এক বৎসর বয়সের শিশুর কাছে তিন বৎসরের শিশুই বেশি অনুকরণযোগ্য কারণ তিন বৎসরের শিশু যাহা করে ছোট শিশুও তাহা করিতে চায় এবং তাহার শক্তিও অসাধারণ বলিয়া মনে হয় না। শিশুদের নিকট অন্য শিশুরাই বেশি সমগোত্র, বয়স্ক ব্যক্তিরা নয়; অন্য শিশুরাই তাহাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে, কাজে প্রেরণা দেয়। পরিবারেই কেবল ছোট শিশুরা অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সের শিশুদের নিকট হইতে এরূপ শিক্ষার সুযোগ পায়। খেলার সময় যদি শিশুকে সঙ্গী নির্বাচন করিতে দেওয়া হয়, তবে সে তাহার অপেক্ষা বেশি বয়সের শিশুকেই সৎসঙ্গীরূপে বাছিয়া লইবে; ইহাতে তাহার অহমিকাবোধ তৃপ্ত হয়, সে যে উপরের স্তরের শিশুদের সমকক্ষ হইতে পারিয়াছে ইহা ভাবিয়া আনন্দ অনুভব করে। কিন্তু বয়স্ক শিশুরা আবার তাহাদের অপেক্ষা বেশি বয়সের ছেলেদের সঙ্গ কামনা করে। তাই দেখা যায় স্কুলে কি বস্তির রাস্তায়, কি অন্যত্র প্রায় সমবয়সী ছেলেরাই একত্রে খেলে, অধিক বয়সের ছেলেরা ছোটদের সঙ্গে খেলিয়া আনন্দ পায় না। এইভাবে দেখা যায় কিঞ্চিৎ বেশি বয়সের শিশুদের সাহচর্যে যে সুবিধা তাহা কেবল গৃহে লাভ করাই সম্ভবপর। কিন্তু ইহার একটি অসুবিধা এই যে, প্রত্যেক পরিবারেই জ্যেষ্ঠ শিশু এই সুযোগ হইতে বঞ্চিত হয়। পরিবার যত ছোট ছোট হয়, বড় শিশুর হারও তত কমিয়া আসে। কাজেই এই অসুবিধা ক্রমে বাড়িয়াই চলে। নার্সারি স্কুলে শিক্ষা দ্বারা শিশুদের অপর শিশুর সাহচর্য লাভের অভাব পূরণ না করিলে ছোট পরিবার শিশুদিগের শিক্ষায় ও আত্মবিকাশে অসুবিধাই সৃষ্টি করে। নার্সারি স্কুলে উপযোগিতা কি এ সম্বন্ধে পরে এক অধ্যায়ে আলোচনা করা হইবে।
