যে যে কারণের জন্য, এই প্রণালীতে সুফল পাওয়া যায়, তাহা আগেকার দিনের স্কুলে ছিল না। কোনোরূপ অসুস্থতার জন্য শিশু খারাপ ব্যবহার করিতে শুরু করিলে এখন তাহাকে সরাইয়া পৃথক করিয়া রাখা হয়। তারপর এ প্রণালী প্রয়োগ করার কৌশল ও নিপুণতা তো আছেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বড় কথা হইল, বেশিরভাগ শিশুর শৃঙ্খলা মানিয়া চলার স্পৃহা। অবাধ্য শিশু একাই যে জগতের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু ইহাকে উপেক্ষা করিতে পারি না। যে স্কুলে শ্রেণির সকল ছাত্রই হইচই করিয়া শৃঙ্খলা অমান্য করিতে উৎসুক সেখানে শিক্ষককে এক সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থার সম্মুখিন হইতে হয়। এরূপ ক্ষেত্রে শিক্ষকের কি প্রণালী অবলম্বন করা উচিত তাহা আলোচনা করিতে চাই না, কেননা প্রথম হইতে শিশুকে উপযুক্তভাবে শিক্ষা দিলে শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে এরূপ বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টিই হইবে না।
তোষামোদ করিয়া শিক্ষাদান : শিশুরা শিক্ষণীয় বিষয় শিখিতে চায় তবে বিষয়টি শিখিবার উপযুক্ত হওয়া চাই এবং উপযুক্তভাবে শিক্ষা দেওয়া চাই। শৈশবে খাওয়ান ও ঘুম পাড়ানোর ব্যাপারে যে ভুল, শিক্ষাদানের ব্যাপারেও সেই ভুল করা হইয়া থাকে। শিশুর পক্ষে যাহা করা উপকারী তাহার জন্য তাহাকে এমন তোষামোদ করা হয় যে সে ভাবে সে বুঝি তদ্বারা বয়স্ক ব্যক্তিদিগকে কৃতার্থ করিতেছে। শিশুদের মনে অতি সহজেই এই ধারণা আসে যে, বয়স্ক ব্যক্তিরা চাহেন বলিয়াই তাহারা খায় এবং ঘুমায়। আহার ও নিদ্রায় কোনোরূপ ব্যতিক্রম দেখাইলে অভিভাবকগণ ব্যস্ত হইয়া পড়েন, শিশুর অহমিকাবোধ তৃপ্ত হয়। এই অবস্থার বাড়াবাড়ি ঘটিলে শিশুর পরিপাক ক্রিয়া ও নিদ্রা দুই-ই ব্যাহত হয় এবং সে রুগ্ন হইয়া পড়ে। পরিচারিকা আমার ছেলেকে খোশামোদ করিয়া খাওয়ানো অভ্যাস করিয়াছিল, ইহার ফলে ক্রমেই সে জেদি হইয়া উঠিতেছিল। একদিন দুপুরে তাহাকে আহার করিতে ডাকিলে সে পুডিং খাইতে অস্বীকার করিল। কাজেই ইহা রাখিয়া দেওয়া হইল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই খাবার চাহিল কিন্তু তখন দেখা গেল পাঁচক তাহা খাইয়া ফেলিয়াছে। ইহাতে সে সংযত হইয়া গেল এবং পরে আর কখনো আমাদের কাছে রাগের ভান করে নাই। শিক্ষা ব্যাপারে ঠিক এইরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করা উচিত। যদি কেহ শিক্ষা নিতে না চায় তাহাকে বাদ দেওয়া উচিত। তবে দেখিতে হইবে পাঠদান হইতে সে যতক্ষণ অনুপস্থিত থাকিবে, ততক্ষণ যেন। আনন্দে সময় কাটাইতে না পারে। সে যদি অন্যকে শিখিতে দেখে, তাহা হইলে শীঘ্রই নিজেই শিখিতে আগ্রহ প্রকাশ করিবে। শিক্ষক তখন তাহাকে সাহায্য করিতে পারেন; কাজটি এমনভাবে করিতে হইবে যেন শিশু বুঝিতে পারে যে, সে নিজেই উপকৃত হইতেছে, অপর কাহাকেও কৃতার্থ করিতেছে না। আমি স্কুলে একটি করিয়া বড় খালি কক্ষ রাখার পক্ষপাতী। পাঠে অনিচ্ছুক ছেলেদিগকে সেখানে পাঠানো হইবে। একবার সেখানে যাইলে সে-দিন আর তাহাকে শ্রেণিতে ফিরিতে দেওয়া হইবে না। পাঠের সময় খারাপ ব্যবহার করিলে শাস্তিস্বরূপ তাহাদিগকে শূন্য কক্ষে নির্বাসন করিতে হইবে। সাধারণ নীতি এই যে অপরাধীকে এমন শাস্তি দিতে হইবে যাহা সে পছন্দ করে না। তথাপি ছাত্রের মনে প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি প্রীতি জন্মাইবার উদ্দেশ্যে ওইরূপ পুস্তক হইতে লেখা নকল করার শাস্তি প্রদান করা হইয়া থাকে।
প্রশংসা ও নিন্দা : ছোটখাটো রকমের অপরাধের জন্য (যেমন আচরণের অশোভনতা ইত্যাদি) মৃদু রকমের শাস্তির উপযোগিতা আছে। প্রশংসা ও নিন্দা ছোট শিশুদের এবং বয়স্ক বালক-বালিকাদের পক্ষেও পুরস্কার ও শাস্তি হিসেবে বিশেষ প্রয়োজনীয়। যিনি ছোটদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতে পারেন এমন লোক যদি প্রশংসা বা নিন্দা করেন তবে ইহার গুরুত্ব আরও বাড়ে। প্রশংসা ও নিন্দা ব্যতীত শিক্ষাদান কার্য চলে বলিয়া আমি বিশ্বাস করি না, তবে ইহা প্রয়োগ করিতে কিছুটা সতর্কতা আবশ্যক।
প্রথমত, প্রশংসা বা নিন্দা তুলনামূলকভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়। কোনো শিশুকে বলা ঠিক হইবে না–তুমি অমুকের চেয়ে ভালো করিয়াছ বা অমুকে অমুকে মোটেই খারাপ নয়। প্রথমটির ফলস্বরূপ তাহার মনে অবজ্ঞার ভাব উৎপন্ন হয়, দ্বিতীয় শত্রুতার সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, প্রশংসা অপেক্ষা নিন্দার প্রয়োগ কম করা দরকার। শিশু কোনও অশোভন আচরণ করিলে শাস্তিস্বরূপ ইহা প্রয়োগ করিতে হইবে; ফল পাওয়া গেলে উহার প্রয়োগের আবশ্যকতা নাই।
তৃতীয়ত, যে কার্যে বিশেষ কৃতিত্ব নাই, তাহার জন্য প্রশংসা করা অনুচিত। সাহস কিংবা নূতন কৌশল প্রদর্শনের জন্য অথবা নিজের সংবাদের কোনো প্রকার নিঃস্বার্থপরতা দেখাইলে শিশুর নৈতিক শক্তির প্রকাশকে উৎসাহ দিবার জন্য প্রশংসা করিতে হইবে। শিক্ষা ব্যাপারে ছাত্র অনন্য সাধারণ ভাল কিছু করিলে তাহাকে প্রশংসা করা একান্ত আবশ্যক।
কঠিন কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রশংসাপ্রাপ্তি তরুণদের নিকট অতি আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা; প্রশংসা লাভের কামনা তাহাদের কাজে প্রেরণা জোগায়, যদিও ইহা প্রধান উদ্দেশ্য নয়। কাজের প্রতি অনুরাগ ও নিষ্ঠাই প্রেরণার মূল উৎস হওয়া উচিত।
নিষ্ঠুরতা : চরিত্রের গুরুতর দোষগুলি, যেমন নিষ্ঠুরতা, শাস্তি দিয়া সংশোধন করা যায়; তাহার জন্য শাস্তি প্রয়োগ করিলেও পরিমাণ খুব কম হওয়া বাঞ্ছনীয়। জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা ছেলেদের মধ্যে কম-বেশি স্বাভাবিকভাবেই দেখা যায়; ইহা প্রতিরোধকরার জন্য যথাসময়ে শিক্ষার প্রয়োজন। আপনি যদি মনে করেন ছেলেকে যখন কোনো প্রাণীর উপর নির্যাতন করিতে দেখিবেন, তখন তাহাকে শাসন করিবেন, তবে ভুল করা হইবে। এরূপ করিলে সে যাহাতে পরে আপনার নজরে না পড়ে সেই চেষ্টা করিবে। শিশুর যে ভাবটি পরে হয়তো নিষ্ঠুরতায় পরিণত হইতে পারে; তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া প্রথম অবস্থাতেই তাহা দূর করা প্রয়োজন। ছেলেকে অপরের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা শিখান; সে যেন আপনাকে কোনো প্রাণী, এমনকি বোলতা বা সাপও হত্যা করিতে না দেখে। যদি তাহা সম্ভবপর না হয়, তবে কোন্ কোন্ প্রাণী হত্যা করা হয় তাহা সহজভাবে শিশুকে বুঝাইয়া দিন। সে যদি অপর ছোট শিশুর প্রতি নির্দয় ব্যবহার করে, আপনিও তৎক্ষণাৎ তাহার প্রতি সেইরূপ করুন। সে প্রতিবাদ করিবে; আপনি তখন তাহাকে বুঝাইবেন যে, সে যদি ইহা পছন্দ না করে, অন্যের প্রতিও তাহার নিষ্ঠুর আচরণ করা সঙ্গত নহে। এইভাবে অন্যেরও যে তাহার মতোই সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে তাহা সে বুঝিতে পারিবে।
