আমার মনে হয় শিক্ষায় শাস্তির প্রয়োজন আছে, তবে ইহার স্থান খুব কম; আর কঠোর শাস্তি মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়, আমার মতে ধমক দেওয়া বা তিরস্কার করাও শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। যদি কখনো কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করিতে হয়, তাহার জন্য স্বাভাবিক ক্রোধ প্রকাশই যথেষ্ট হওয়া উচিত। কয়েকবার আমার ছেলে তাহার ছোট বোনের উপর রূঢ় ব্যবহার করিলে তাহার মা রাগিয়া বিরক্তির সঙ্গে জোরে ধমক দেন। ইহাতেই সুফল ফলিল। ছেলে ফেঁপাইয়া কাঁদিতে লাগিল এবং তাহার মা তাহাকে আদর না করা পর্যন্ত সে শান্ত হইল না। পরে ছোট বোনের সঙ্গে তাহার ব্যবহার লক্ষ্য করিয়া দেখা গেল ক্রোধের সুফল তাহার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করিয়াছে। আমরা কোনও জিনিস না চাহিলেও সে যখন ইহার জন্য জেদ করিয়াছি কিংবা তাহার ছোট বোনের খেলায় বিঘ্ন সৃষ্টি করিয়াছে, তখন তাহাকে মৃদু আকারে শাস্তি দিতে হইয়াছে। এইরূপ ক্ষেত্রে ভালোভাবে বুঝাইলেও কোনো ফল না হইলে আমরা তাহাকে একটি ঘরে একাকী রাখিয়া আসিতাম। ঘরের দরজা খোলা থাকিত; তাহাকে বলা হইত যে ভালো হইলেই যেন ঘর হইতে চলিয়া আসে। কয়েক মিনিট সে খুব জোরে চিৎকার করিয়া কাঁদিত তারপর শান্ত হইয়া বাহির হইয়া আসে এবং ভালো ব্যবহার করিতে থাকে। সে ইহা ভালোভাবেই বুঝিত যে বাহিরে আসায় সে শান্ত আচরণের শর্ত মানিয়া লইয়াছে। আমাদিগকে ইহার চেয়ে কঠোরতর শাস্তি প্রয়োগ করিতে হয় নাই।
যাহারা কঠোর শাস্তি দিয়া শিশুকে শায়েস্তা করিতে চাহিতেন এমন প্রাচীনপন্থি শৃঙ্খলা-বিধানকারী ব্যক্তিদের বই পড়িয়া বোঝা যায় যে, বর্তমান প্রণালীতে শিক্ষিত শিশুদের অপেক্ষা প্রাচীন প্রণালীতে শিক্ষিত শিশুরা অনেক বেশি দুষ্ট ছিল। The Fair Child Family পুস্তকে শিশুদের যেরূপ আচরণের কথা উল্লেখ করা আছে, আমার ছেলে তাহার অর্ধেক খারাপ আচরণ করিলেই আমি স্তম্ভিত হইব। এরূপ ক্ষেত্রে আমি মনে করিব ছেলের পিতামাতার দোষই বেশি। আমি বিশ্বাস করি যে, বিচারবুদ্ধি বিশিষ্ট পিতামাতাই অনুরূপ সন্তান গড়িয়া তুলিতে পারেন। শিশুদের জীবনগঠনের পক্ষে পিতামাতার স্নেহ বিশেষ প্রয়োজনীয়। সন্তানের প্রতি শুষ্ক কর্তব্য ও দায়িত্ব সন্তানগণ বোঝে না তজ্জন্য কৃতজ্ঞও থাকে না। তাহারা চায় জনক-জননীর অন্তর নিঙড়ানো মধুর স্নেহ। শিশুকে ভালোভাবে গড়িয়া তুলিতে হইলে তাহাকে বুঝিতে দিতে হইবে যে, সে পিতামাতার স্নেহের অধিকারী। ইহা ছাড়া তাহাকে কোনো কাজ বা আচরণ হইতে বিরত থাকিতে বলিলে অথবা কোনও কাজ করিতে নিষেধ করিলে সম্পূর্ণ অসম্ভব না হইলে, ইহার কারণ তাহার নিকট যথাযথভাবে বুঝাইয়া বলা উচিত। খেলাধুলা করিতে গেলে অনেক সময় ছোটখাট আঘাত লাগে, হাত-পা কাটে বা ছাল উঠিয়া যায়; এইরূপ বরং ঘটিতে দেওয়া ভালো, তথাপি শিশুদিগকে দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটির খেলা হইতে নিবৃত্ত করা উচিত নয়। এইরূপ কিছু কিছু অভিজ্ঞতা হইতে তাহারা উপলব্ধি করিতে পারে যে নিষেধ মানিয়া চলা বুদ্ধিমানের কাজ। যেখানে প্রথম হইতেই শিশুরা এইরূপ অবস্থার মধ্যে দিয়া শিক্ষা পাইতে থাকে সেখানে গুরুতর শাস্তি পাওয়ার যোগ্য কোনো কাজ তাহারা করিবে না বলিয়া আমার বিশ্বাস।
শিশু যখন জেদ করিয়া ক্রমাগতই অন্য শিশুদের খেলায় প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করিতে থাকে কিংবা অন্যদের আনন্দে বাধা দেয় তখন শাস্তিস্বরূপ তাহাকে অপর শিশুদের কাছ হইতে পৃথক করিয়া সরাইয়া রাখা উচিত। এইরূপ কোনো শাস্তি দিতেই হইবে, কেননা একজনের দুষ্টামির জন্য অন্য সকলের আনন্দে বিঘ্ন হইতে দেওয়া কর্তব্য নয়। কিন্তু দিবার কোনো প্রয়োজন নাই যাহাতে সে যে বিশেষভাবে দোষী সেই ভাব তাহার মনে হয়। সে যদি বুঝিতে পারে যে অন্যেরা যে আনন্দভোগ করিতেছে সে তাহা হইতে বঞ্চিত তবেই যথেষ্ট। এরূপ ক্ষেত্রের মাডাম মন্তেসরি কি ব্যবস্থা অবলম্বন করেন, তাহা তিনি বর্ণনা করিয়াছেন :
আমরা অনেক সময় এমন শিশুদের সংস্পর্শে আসিয়াছি যাহারা কোনো রকম সংশোধন বা উপদেশ কর্ণপাত না করিয়া অন্যের আনন্দে উৎপাত সৃষ্টি করিয়াছে। এইরূপ শিশুকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করান হয়। যখন দেখা যায় যে তাহাদের কোনোরূপ শারীরিক অসুস্থতা নাই,তখন তাহাকে ধরিয়া কোনো ছোট একটি টেবিলে বসাইয়া অন্যের নিকট হইতে দূরে পৃথক করিয়া রাখা হয়। তাহাকে ছোট একটি হাতওয়ালা আরাম চেয়ারে এমনভাবে একটু উঁচুতে বসানো হয় যাহাতে সে অন্য ছেলে মেয়েদের খেলা দেখিতে পারে। যে সব খেলনা সে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে, তাই তাহাকে খেলিতে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া প্রায় সকল ক্ষেত্রে শিশুকে শান্ত করিয়াছে। পৃথক স্থানে বসিয়া থাকিয়া সে অন্য সাথীদের খেলা দেখিতে পায় এবং তাহা তাহার নিকট বস্তূপাঠ [Object lesson]-এর মতো কাজ করে। শিক্ষাকে মৌখিক উপদেশ অপেক্ষা ইহা বেশি কার্যকরি হয়। ধীরে ধীরে সে অন্য সকলের সঙ্গে মিলিয়া-মিশিয়া খেলার সুবিধা উপলব্ধি করিতে পারে, সে নিজেই সকলের মধ্যে ফিরিয়া যাইতে চায়। এইভাবে যে সব শিশু প্রথমে আমাদের শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছিল তাহাদের সকলকেই শৃঙ্খলার মধ্যে আনিতে সক্ষম হইয়াছি। পৃথক করিয়া রাখা শিশুর প্রতি সর্বদা বিশেষ যত্ন লওয়া হইত, যেন সে পীড়িত। আমি নিজে কক্ষে প্রবেশ করিয়াই প্রথমে তাহার কাছে যাইতাম; যেন সে অতি কচি শিশু। তারপর আমি অন্যদের প্রতি দৃষ্টি দিতাম, তাহাদের বেলায় কৌতূহল দেখাইতাম, তাহারা যেন ছোট ছোট বয়স্ক ব্যক্তি এইভাবে তাহাদিগকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতাম। যাহাদিগকে পৃথক করিয়া রাখিয়া শাস্তি দিতে হইত, তাহাদের মনে কি হইত তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু তাহাদের আচরণের পরিবর্তন হইত স্থায়ী এবং সম্পূর্ণ। কেমন করিয়া কাজ করিতে হয়, কেমন করিয়া অন্যের সঙ্গে ব্যবহার করিতে হয়, ইহা শিখিতে তাহারা রীতিমতো গর্ববোধ করিত। তাহারা অন্য শিক্ষয়িত্রী এবং আমার প্রতি সর্বদা প্রীতির ভাব দেখাইত।
