যৌন জীবন বা যৌন আচরণ সম্বন্ধে শিশুর নিকট মিথ্যা কথা বলা অনেক কালের রেওয়াজ হইয়া গিয়াছে। আমার কাছে ইহা অত্যন্ত অপকারী মনে হয়। পরবর্তী এক অধ্যায়ে যৌন শিক্ষা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হইবে।
যদি রূঢ় আচরণ দ্বারা শিশুদের কৌতূহল দমিত না হয় তবে তাহারা অসংখ্য প্রশ্ন করিবে, কতক প্রশ্ন হইবে বুদ্ধির পরিচায়ক, কতক বা ইহার বিপরীত। প্রশ্নগুলি প্রায়ই বিরক্তিকর, কখনো বা অসুবিধাজনক। তথাপি আপনার সাধ্যানুসারে ইহাদের সদুত্তর দিতে হইবে। কিন্তু যদি ধর্ম সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করে তবে এ সম্বন্ধে আপনার নিজের যাহা অভিমত তাহাই বলুন; ইহাতে যদি অন্য ব্যক্তির সঙ্গে মতের পার্থক্য প্রকাশ পায় তাহাতেও কিছু আসে যায় না। সে যদি এমন প্রশ্ন করে যাহার উদ্দেশ্য আপনাকে দুষ্ট বা বোকা বলিয়া প্রতিপন্ন করা, তাহারও উত্তর দিন। সে যদি যুদ্ধ অথবা মৃত্যুদণ্ড সম্বন্ধে প্রশ্ন করে, উত্তর দিন। কতক প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক জটিলতা জড়িত থাকে–যেমন- বৈদ্যুতিক আলো কেমন করিয়া উৎপন্ন করা হয় ইত্যাদি। এই ধরনের কঠিন প্রশ্ন ছাড়া অন্য প্রশ্নের উত্তরে তুমি এখন সব বুঝতে পারবে না বলিয়া শিশুকে থামাইয়া দিবেন না। যদি কখনো এরূপ উত্তর দিতে হয় তবে তাহাকে বুঝাইয়া দিবেন যে, প্রশ্নের উত্তরটি খুবই আনন্দদায়ক; তাহার জ্ঞান আরও কিছু বেশি হইলে তবে সে ইহার আনন্দ উপলব্ধি করিতে পারিবে। কোনো প্রশ্নের উত্তরে শিশুকে কিছু বলিবার সময় কম না বলিয়া সে যাহা বুঝিতে পারে তাহার চেয়েও কিছু বেশি বলিবেন; যেটুকু সে বুঝিতে পারিল না তাহা তাহার কৌতূহল ও জ্ঞানবুদ্ধির বাসনা জাগাইয়া তুলিবে।
শিশুর সঙ্গে যদি সর্বদা সকল অবস্থাতেই সত্য কথা বলা যায় তবে ইহার সুফলস্বরূপ তাহার আস্থা এবং শ্রদ্ধালাভ করা যায়। আপনি যাহা বলিলেন তাহা বিশ্বাস করার প্রবণতাই শিশুর বেশি থাকে যদি না আপনার কথা তাহার কোনো প্রবল বাসনার বিরুদ্ধে যায়, যেমন হইয়াছিল ইস্টারের সময় খোকার চকোলেট খাওয়ার ব্যাপারে। একথা একটু পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। আপনার মন্তব্যের সত্যতা পরীক্ষিত হইলে সহজেই আপনি শিশুর বিশ্বাস উৎপাদন করিতে পারিবে। কিন্তু আপনি যদি মিথ্যা শাস্তির ভয় দেখান তবে শিশু আর সহজে ভীত হইবে না এবং আপনার কথামত চলিবেও না; তখন আপনাকে আরও বেশি কড়াকড়ি ও ভীতি প্রদর্শন করিতে হইবে; ফলে শিশুর অস্থিরচিত্ততা সৃষ্টি হইবে। একদিন আমার ছেলে স্রোতের জলের মধ্যে হাঁটিতে চায়। সেখানে ভাঙা কাঁচ। প্রভৃতির টুকরা থাকিলে তাহার পা কাটিয়া যাইতে পারে, এজন্য আমি তাহাকে বারণ করি। জলে নামার বাসনা তাহার এমন প্রবল হইয়াছিল যে, সে কাঁচের টুকরা সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া ওঠে কিন্তু আমি যখন একটি টুকরা পাইয়া তাহার ধারালো কিনারা দেখাইলাম তখন সে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিল। আমি যদি আমার নিজের সুবিধার জন্য অর্থাৎ তাহাকে জলে নামা হইতে বারণ করার জন্য বাসনাপত্রের ভাঙা টুকরা আছে বলিয়া মিথ্যা ভাঁওতা দিতাম তবে সে আমার উপর বিশ্বাস হারাইত; সেখানে কোনো ভাঙা ধারালো টুকরা না পাইলে আমি তাহাকে নিশ্চয়ই জলে নামিতে দিতাম। এই ধরনের নানা পরীক্ষার ফলে শিশু আমার যুক্তি ও বিবেচনা সম্বন্ধে আর কোনও প্রকার সন্দেহ পোষণ করে না।
আমরা ছলনা ও প্রতারণাময় সংসারে বাস করিতেছি। যে শিশু ইহার আওতায় বর্ধিত হয় না সে সাধারণত যাহা শ্রদ্ধার যোগ্য বলিয়া অনেকে মনে করে তাহার ভিতরকার ভণ্ডামির জন্য অনেকে কিছুই ঘৃণা করিবে। কোনও কিছুর প্রতি ঘৃণার ভান পোষণ করা বাঞ্ছনীয় নয়। আমি এরূপ অবস্থার প্রতি তাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করার পক্ষপাতী নই, তবে সে যদি স্বেচ্ছায় জানিতে চায় তবে তাহার কৌতূহল নিবৃত্ত করিতেই হইবে। ভণ্ডামিপূর্ণ সমাজে জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা কতকটা বাধাস্বরূপ হয় বটে কিন্তু সত্যবাদিতাকে ভিত্তি করিয়া মানুষের যে নির্ভীকতা লাভ হয় তাহার মূল্য অনেক বেশি। আমাদের সন্তানগণ সৎ, সরল এবং আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন হউক ইহাই আমরা কামনা করি। আমি তো মনে করি এই সকল গুণে ভূষিত হইয়া তাহারা যদি কর্মক্ষেত্রে অকৃতকার্য হয় তাহা বরং ভালো তবু তাহারা যে ক্রীতদাসের কলাকৌশলে অর্থাৎ মিথ্যা, কপটতা ও ভণ্ডামির সাহায্যে কৃতকার্য হইবে তাহা চাই না। প্রত্যেক খাঁটি চমৎকার ব্যক্তির সততা এবং নিজের সততা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ থাকা উচিত। [এই গর্ববোধকে তুলনা করা চলে মাংসপেশির অভ্যন্তরস্থিত অস্থির সঙ্গে। শক্তি অস্থি দেহকে উন্নত ও দৃঢ় রাখে; অস্থিহীন প্রাণী উন্নত মস্তকে চলিতে পারে না। কিন্তু অস্থি যদি মাংস দ্বারা আবৃত না থাকে তবে অপরের সংস্পর্শে আসিলে তাহা অন্যকে রূঢ় আঘাত দেয়। বিনয় ও ভদ্রতারূপ মাংসপেশির আড়ালে অস্থিরূপ গর্ববোধ মানুষকে অনেক হীনতা ও নীচতা হইতে রক্ষা করে। এইরূপ গর্ববোধ থাকিলে বিশেষ কোনো মহত্তর উদ্দেশ্য ব্যতীত সে ব্যক্তির পক্ষে মিথ্যা কথা বলা অসম্ভব। আমি চাই আমার ছেলেমেয়েরা চিন্তায় ও বাক্যে সত্যবাদী হউক; ইহার জন্য যদি তাহাদিগকে জাগতিক ব্যাপারে দুর্ভাগ্য ভোগ করিতে হয় তাহাতেও আমি রাজি, কেন না সত্যকে পরিত্যাগ করা ধন, মান অপেক্ষা অধিকতর মূল্যবান সম্পদ বিসর্জন দেওয়ারই শামিল।
০৯. শাস্তি
আগেরকার দিনে এবং কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত শিশু এবং বালক-বালিকাদিগকে শাস্তি দেওয়া একটি অতি সাধারণ প্রচলিত ব্যাপার ছিল; শিক্ষার জন্য ইহাকে সর্বজনস্বীকৃত এবং অপরিহার্য মনে করা হইত। বেত্রাঘাত সম্বন্ধে ডক্টর আর্নল্ড কি অভিমত পোষণ করিতেন তাহা সর্বজনবিদিত। তাহার সময়ে ডক্টর আর্নল্ডের অভিমত অতি কোমলতাপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হইত। শিশুকে তাহার নিজের স্বভাব ও প্রকৃতি অনুসারে বাড়িয়া উঠিতে দিবার নীতি প্রচার করেন রুশো। তথাপি তিনিও এমিল [Emile] গ্রন্থে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিদানের অনুকূলে অভিমত দিয়াছেন। একশত বৎসর পূর্বে শিশুর শাস্তি বিধান সম্পর্কে কিরূপ ধারণা ছিল তাহা তখনকার সতর্ককারী একগল্পে বর্ণিত আছে। ছোট্ট একটি মেয়েকে সাদা জামা পরাইয়া দেওয়া হইতেছে কিন্তু সে জেদ ধরিয়াছে ফিকে লাল রঙেরটি পরিবে। তাহার অবাধ্যতার ফল কি হইল?
বহির্বাটি থেকে এসে বাবা শুনিলে যবে
খুকুর তর্জন ক্রন্দন;
তখনই রাগের বশে ভিতরে ছুটিয়া এসে
বেত্রাঘাতে করে দমন।
The Fair Child Family পুস্তকে বর্ণিত আছে মিঃ ফেয়ার চাইল্ড তাঁহার ছেলেমেয়েদিগকে পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া করিতে দেখিলে বেত মারিতেন আর তালে তালে কবিতা আবৃত্তি করিতেন কুকুর মাতুক আনন্দে কামড়ে গর্জনে [Let dogs delight to bark and bite] তারপর ফাঁসির কাষ্ঠের সঙ্গে ঝুলানো মৃতদেহ দেখানোর জন্য লইয়া যাইতেন। বাতাসে মৃতদেহটি নড়িত, শিকলের ঝন্ঝন্ শব্দ হইত; ছেলেমেয়েরা ভয়ে জড়ো হইয়া তাহাদিগকে বাড়িতে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে অনুরোধ করিতে থাকিত। কিন্তু মিঃ ফেয়ার চাইল্ড তাহাদিগকে বহুক্ষণ সেই বীভৎস দৃশ্য দেখিতে বাধ্য করিতেন এবং বলিতেন, যাহাদের অন্তরে ঘৃণা আছে তাহাদের এই দশাই হয়। পিতার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে ধর্মযাজক করা; এবং এই উদ্দেশ্যেই হয়তো তাহাকে এমন শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল যাহাতে সে পাপীর অপরাধ যে কিরূপ ভীষণ হয় সে সম্বন্ধে পরে প্রত্যক্ষদর্শীর মতো জ্বলন্ত বর্ণনা দিতে পারে। বর্তমান যুগে এইরূপ শাস্তি কেহই সমর্থন করিবে না। কিন্তু ইহার পরিবর্তে কিরূপ শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত সে সম্বন্ধে বহু মতভেদ আছে। কেহ এখনও ভালোমতো শাস্তিদানের পক্ষপাতী আবার কেহ কেহ মনে করেন ইহার কোনও প্রয়োজন নাই। এ দুইটিই চরম অভিমত।
