শিশুদিগকে যদি মিথ্যা ভাষণ অভ্যাস করা হইতে বিরত রাখিতে চাহেন তবে তাহাদের সহিত ব্যবহারে বয়স্ক ব্যক্তিদের সত্যবাদিতা একান্তভাবে অপরিহার্য। যে পিতা-মাতা শিক্ষা দেন যে, মিথ্যা কথা বলা পাপ তাহাদের ছেলে-মেয়েরাই যদি তাহাদিগকে মিথ্যাবাদী বলিয়া জানে তবে সে পিতা-মাতার উপদেশ দিবার নৈতিক অধিকার থাকে না। সন্তান-সন্তুতির নিকট সত্যকথা বলার নীতিটা সম্পূর্ণ নূতন; বর্তমান প্রজাতির [Generation] পূর্বে বড় বিশেষ কেহ ইহা মানিয়া চলিতেন না; ইভ তাহার ছেলে Cain এবং Abel কে আপেলের সম্বন্ধে সত্য কথাটি বলিয়াছিলেন কি-না আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে; আমার বিশ্বাস তিনি বলিয়াছিলেন যে, তাঁহার পক্ষে যাহা কল্যাণকর নয় এমন কোনও খাদ্য তিনি গ্রহণ করেন নাই। পিতামাতা সন্তানের নিকট নিজদিগকে সর্ব শক্তিসম্পন্ন, মানুষের স্বাভাবিক কাম, ক্রোধ প্রভৃতি রিপুর তাড়না হইতে মুক্ত এবং সর্বদা বিশুদ্ধ বিচারবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত বলিয়া জাহির করিতেন। শিশুদিগকে তিরস্কার করিবার সময় ক্রোধে অপেক্ষা দুঃখের ভাবই বেশি দেখাইতেন। যত গালমন্দই করুন না কেন তাহারা মেজাজ ঠিক রাখিয়া সন্তানদের মঙ্গলের জন্যই বলিতেছেন এরূপ ভাব দেখাইতেন। তাঁহারা বুঝিতেন না যে শিশুরা বিস্ময়করভাবে স্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন; তাহারা ভাওতা বা ভণ্ডামির রাজনৈতিক কারণ বোঝে না কিন্তু ইহাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে। আপনার যে হিংসা-বিদ্বেষ সম্বন্ধে আপনি নিজেই জানেন না তাহা শিশুদের নিকট সহজে ধরা পড়ে; ইহার পর আপনি হিংসা-বিদ্বেষের দোষ সম্বন্ধে শিশুদিগকে যতই উপদেশ দিন না কেন তাহারা কিছুই মানিবে না। কখনওই নিজেকে দোষত্রুটিশূন্য, অতিমানব বলিয়া ভান করিবেন না; ইহাতে শিশু আপনাকে বিশ্বাস করিবে না, পছন্দও করিবে না। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, অতি অল্প বয়সে আমি কেমন করিয়া আমার উপর প্রযুক্ত ভিক্টোরিয়া যুগের ভাওতা ভণ্ডামি বুঝিয়া ফেলিয়াছিলাম এবং প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম যে, আমার যদি কখনো সন্তান-সন্ততি হয় তবে তাহাদের প্রতি আচরণে এইরূপ ভুল করিব না। যথাসাধ্য আমি এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়া চলিতেছি।
বয়স্কের পক্ষে আর এক প্রকার মিথ্যা হইল–শিশুকে যে শাস্তি দেওয়া হইবে না, তাহার ভয় দেখানো। ডক্টর ব্যালার্ড তাঁহার চিত্তাকর্ষক পুস্তক [The Changing School] এই নীতি বিশেষ জোরের সঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন : শাসাইবেন না। যদি শাস্তির ভয় দেখান তবে আপনাকে শাস্তি দিতেই হইবে। আপনি যদি ছেলেকে বলেন, আবার যদি এ কাজ করো তবে তোমাকে মেরে ফেলব এবং সে যদি সেই কাজ আবার করে তবে ছেলেকে হত্যা করিতেই হইবে। আপনি যদি তা না করেন, তবে ছেলে আপনার প্রতি সকল শ্রদ্ধা হারাইবেন। পরিচারিকা এবং অশিক্ষিত পিতা-মাতা শিশুদের সঙ্গে ব্যবহারে যে শাস্তির ভয় দেখায় তাহা হয়তো এমন চরম নয় কিন্তু এ ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বিশেষ যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকিলে শিশুকে দিয়া কোনও কিছু করাইবার জন্য জেদ করিবেন না কিন্তু একবার যদি জেদ শুরু করেন তবে (ফল যাহই হউক) শেষ পর্যন্ত আপনাকে ইহা বজায় রাখিতেই হইবে। যদি কোনও শাস্তির ভয় দেখান তবে আপনি যাহা প্রয়োগ করিতে প্রস্তুত আছেন সেইরূপ শাস্তির ভয় দেখাইবেন; আপনার শাস্তিদানের হুমকিতেই কাজ হইবে, বাস্তবিক শাস্তি দিতে হইবে না, এরূপ ধারণা করিবেন না। অশিক্ষিত জনসাধারণকে এই নীতি বুঝানো বড় কঠিন। পুলিশ লইয়া গিয়া আটকাইয়া রাখিবে; দৈত্য আসিয়া ধরিয়া লইয়া যাইবে, প্রভৃতি ধরনের অবাস্তব ভীতি প্রদর্শন বিশেষ আপত্তিজনক। ইহা প্রথমে শিশুর মনে নিদারুণ ভীতি সঞ্চার করে, পরে যখন বুঝিতে পারে যে সবই ভাঁওতা-মাত্র তখন বয়স্ক ব্যক্তিগণের কথা ও ধমকানির উপর তাহার আর কোনো আস্থা থাকিবে না। আপনি জেদ করিয়া শেষ পর্যন্ত শিশুকে আপনার মনোমতভাবে চলিতে বাধ্য না করান তবে সে শীঘ্ৰ বুঝিয়া ফেলিবে যে এইরূপ ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া নিষ্প্রয়োজন; সে বরং তৎক্ষণাৎ মুখে স্বীকার করিবে কিন্তু কার্যত কিছুই করিবে না। শাস্তির ভয় দেখাইয়া সংশোধন করিতে চাহিলে মনে রাখিতে হইবে যে বিশেষ উপযুক্ত কারণ না থাকিলে কখনওই শিশুকে ভয় দেখানো বা ধমকানো উচিত নয়।
আর এক ধরনের অবাঞ্ছনীয় ভাঁওতা হইল প্রাণহীন পদার্থের প্রতি জীবন্ত প্রাণীর মতো আচরণ করিতে শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু টেবিল বা চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়া আঘাত পাইলে তাহার পরিচারক পরিচারিকারা দুষ্ট টেবিল, দুষ্ট চেয়ার প্রভৃতি বলিয়া এইগুলিকে আঘাত করিতে শিখাইয়া দেয়। শিশুর আঘাত লাগার জন্য টেবিল বা চেয়ার যেন দায়ী এইরূপ ধারণা শিশুর মনে আনিয়া দেওয়া হইল। ইহার ফলে স্বাভাবিক উপায়ে শৃঙ্খলা বিধানের একটি অতি প্রয়োজনীয় সূত্র নষ্ট করিয়া ফেলা হয়। নিজের বুদ্ধিতেই শিশু অল্প দিনেই বুঝিতে পারে যে প্রাণহীন পদার্থের সঙ্গে রাগ খাটাইয়া বা তোষামোদ করিয়া কোনো লাভ নাই। এইগুলি নাড়াচাড়া করিতে নিজের শারীরিক পটুতা অর্জন করিতে হইবে। এই বোধ তাহাকে দৈহিক কৌশল বা পটুতা অর্জন করিতে উৎসাহ দেয় এবং শিশু নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতার সীমা কতদূর তাহা উপলব্ধি করিতে শেখে।
