দ্বিতীয়, ব্যক্তিগত সম্পত্তি যখন শিশুর কতকগুলি সগুণ বিকাশ করে, বিশেষ করিয়া যখন তাহাকে নিজের জিনিসের প্রতি যত্ন লইতে শিখায়, তখন তাহাকে কিছু জিনিস ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে রাখিতে দিন। তবে লক্ষ্য রাখিবেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তিই যেন শিশুর আনন্দলাভের একমাত্র বা প্রধান উপায় না হয়।
০৮. সত্যবাদিতা
সত্য বলার অভ্যাস গঠন করা নৈতিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সত্য বলিতে সত্য কথা ও সত্য চিন্তা উভয়ই বুঝাইতেছি; বস্তুত এই দুইটির মধ্যে শেষোক্তটিই আমার কাছে বেশি প্রয়োজনীয় মনে হয়। মিথ্যাবাদীকে দুইটি পৃথক দলে ভাগ করা যায় : একদল লোক সজ্ঞানে মিথ্যা বলে অর্থাৎ তাহারা যে মিথ্যা কথা বলিতেছে তাহারা তাহা জানে; অপর দল প্রথমে মিথ্যা দ্বারা নিজেদের অচেতন মনকে বঞ্চনা করে তাহার পর কল্পনা করে যে তাহারা ধার্মিক ও সত্যবাদী। প্রথম দল মিথ্যাবাদী, দ্বিতীয় দল ভণ্ড কপটাচারী। এই দুই দলের মধ্যে যদি একদলকে বাছিয়া লইতে হয় তবে আমি প্রথম দলকে পছন্দ করিব। যাহারা সত্যভাবে চিন্তা করেন তাহারা মিথ্যা কথা বলা যে সর্বদাই অন্যায় তাহা বিশ্বাস করেন না। যাহারা এইরূপ মনে করেন, যাহারা কোনও অবস্থাতেই সত্যভাষণ হইতে বিরত হওয়ার পক্ষপাতী নন, তাঁহাদিগকে ধর্মাচার দ্বারা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করিয়া অনেক সময় নিজেদের অভিমতের পরিবর্তন করিতে হয়। ইহার ফলে মনকে ফাঁকি দিয়া নিজেদের মিথ্যাচার স্বীকার না করিলেও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁহারা প্রকৃতই মিথ্যাচারী। তবে যেইরূপ ক্ষেত্রে মিথ্যাবাদিতা সমর্থনযোগ্য সেইরূপ অবস্থা মানুষের জীবনে খুব কমই আছে। প্রায় সকল সময় দেখা যায় এইরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয় অত্যাচারী শক্তিমানের উদ্ধত অবিচারে অথবা যুদ্ধের ন্যায় কোনো দেশব্যাপী ব্যাপক বিপদের সময়ে। মানব-সমাজের অবস্থার উন্নতি ঘটিলে এইরূপ অবস্থা কমই সংঘটিত হইবে।
প্রায় সকল ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভয় হইতে মিথ্যাবাদিতার উৎপত্তি। যে শিশু নিঃশঙ্কভাবে বাড়িয়া ওঠে সে কখনো মিথ্যা কথা বলে না; কোনোপ্রকার নৈতিক উপদেশ বা চেষ্টা ইহার কারণ নয়, প্রকৃত কারণ এই যে, মিথ্যা কথা বলার কোনো প্রয়োজন সে অনুভব করে না। যে শিশু গৃহে উপযুক্ত অভিভাবকের নিকট হইতে সদয় ব্যবহার লাভ করে তাহার চোখে ফুটিয়া উঠে সরলতার দীপ্তি এবং অপরিচিত লোকের সঙ্গেও তাহার আচরণ হয় নির্ভীক ও সঙ্কোচহীন। কিন্তু যে শিশু সর্বদা অত্যাচার এবং কঠোরতার মধ্যে লালিতপালিত হয়, শাস্তি পাওয়ার ভয়ে সে সর্বক্ষণ সঙ্কুচিত হইয়া থাকে, তাহার ভয় কখনো বা কি অন্যায় করিয়া ফেলে, সর্বদা ভীতি ও সঙ্কোচের মধ্যে থাকিতে হয় বলিয়া তাহার আচরণের স্বাভাবিকতা আসে না।
শিশু আপনা হইতে মিথ্যা কথা বলিতে শেখে না। মিথ্যা বলিয়া যে কিছু আছে এবং মিথ্যা কথা যে বলা যায় তাহা প্রথমে শিশুর ধারণায় আসে না। বয়স্কদের নিকট হইতে শিশু এ শিক্ষা পায়; ভয় ইহাকে দ্রুততর করে। শিশু বুঝিয়া ফেলে যে, বয়স্ক ব্যক্তিরা তাহার নিকট মিথ্যা কথা বলে এবং তাহাদের নিকট সত্য কথা বলার বিপদ আছে; কাজেই সে মিথ্যা বলিতে শুরু করে। যে কারণগুলি শিশুকে মিথ্যাভাষণে উৎসাহ দেয় বা বাধ্য করে সেইগুলি দূর করুন, দেখিবেন সে মিথ্যা বলার চিন্তা তাহার মনেই আসিবে না।
মিথ্যাবাদিতা ও শিশুমনের বৈশিষ্ট্য : শিশু প্রকৃতই মিথ্যা কথা বলিতেছে কি না সে সম্বন্ধে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। শিশুদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল, তাহারা অনেক সময় বয়স্কদের প্রশ্নের উত্তর কি হইবে তাহা জানে না কিন্তু বয়স্করা হয়তো মনে করেন তাহারা ঠিক জানে। শিশুদের সময় সম্পর্কে ধারণা খুবই অস্পষ্ট; চার বৎসরের কম বয়স্ক শিশুর কাছে গতকাল ও এক সপ্তাহ পূর্বের মধ্যে কিংবা গতকাল ও ছয় ঘণ্টা পূর্বের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য নাই। আপনার প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকিলে তাহারা আপনার প্রশ্ন করার ভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর অনুসারে হ্যাঁ কিংবা না বলিবে। আবার অনেক সময় কল্পনার আশ্রয়ে কোনো কিছু ভান করিয়াও তাহারা কথা বলে। তাহারা যখন বলে যে পিছনের বাগানে সিংহ আছে তখন এ ভান সহজেই বোঝা যায়; শিশু তখন কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করিতেছে; সিংহ সম্বন্ধে সে শুনিয়াছে বা ছবি দেখিয়াছে; সিংহ গাছপালার মধ্যে থাকে তাহাও সে জানে না; কল্পনায় সিংহকে সে নিজের বাড়ির কাছেই আনিয়াছে মাত্র। এ ক্ষেত্রে শিশুর কথা কল্পনাপ্রসূত বলিয়া সহজেই বোঝা গেল; অনেক সময় তাহার কল্পনাপ্রণোদিত কথা ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে। বাস্তবতার কষ্টিপাথরের এইগুলিকে মিথ্যা বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে। বাস্তবতার কষ্টি পাথরের এইগুলিকে মিথ্যাভাষণ বলা যায় সত্য কিন্তু ইহাতে কাহাকেও বঞ্চনা করার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য বক্তার নাই। বস্তুত বয়স্ক ব্যক্তিকে ঠকানো বা ফাঁকি দেওয়ার কোনো চিন্তাই শিশুদের মনে উঠিতে পারে না; তাহাদের নিকট বয়স্ক ব্যক্তিরা সর্বজ্ঞ; কাজেই তাহাদিগকে বঞ্চনা করা অসম্ভব। আমার পৌনে চার বছর বয়সের ছেলে শুধু গল্প শোনার আনন্দের জন্যই, আমি যখন বর্তমান ছিলাম না তখন তাহার কি হইয়াছিল সে সম্বন্ধে গল্প শুনিতে চায়। তাহার ধারণা তাহার পিতার অজানা কিছু নাই। তাহাকে বোঝানো কষ্ট যে তাহার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার সাধ্যাতীত। শিশুরা নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধির সঙ্গে বয়স্কদের জ্ঞানের তুলনা করিয়া এত পার্থক্য দেখে যে, বয়স্কদের জ্ঞানের যে সীমা আছে তাহা ধারণা। করিতে পারে না। গত ইস্টারের সময় ছেলেকে কতকগুলি চকোলেট দেওয়া হইয়াছিল। আমরা তাহাকে বলিয়াছিলাম বেশি খাইলে অসুখ করিবে; শুধু বলিয়াই ক্ষান্ত ছিলাম, চকোলেটগুলি তাহার কাছেই রাখা হইয়াছিল। বেশি খাইয়া সে অসুখে পড়িল। অসুখসারিলে সে একদিন হাস্যোজ্জ্বল, কতকটা বিজয়োৎফুল্ল কণ্ঠে বলিল : বাবা আমার অসুখ হয়েছিল–বাবা বলেছিলেন যে আমার অসুখ হবে। তাহার পিতার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা পরীক্ষা করিয়া শিশু বিস্মিত হইয়াছিল। সে যেন পরীক্ষা দ্বারা কোনও বৈজ্ঞানিক নিয়মের সত্যতা প্রমাণ করিয়াছিল। ইহার পর হইতে তাহার হাতে অধিক পরিমাণে চকোলেট দিয়াও নিশ্চিন্ত হওয়া গিয়াছে। যদিও চকোলেট পাইত তবু কখনো লোভের বশে বেশি খাইয়া অসুখ সৃষ্টি করিত না। ইহা ছাড়া আরও একটি সুফল হইয়াছে এই যে তাহার খাদ্য সম্বন্ধে আমরা যাহা বলি তাহা সে একান্তভাবে বিশ্বাস করে। তাহার মনে এই ভাব জাগ্রত করার জন্য নৈতিক উপদেশ শাস্তি অথবা ভয়ের প্রয়োগ করিতে হয় নাই। প্রথম অবস্থায় শিশুর সঙ্গে আচরণে ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রয়োজন হইয়াছে। সে এমন এক বয়সে আসিয়া পৌঁছিতেছে, যখন সকল ছেলের পক্ষেই মিষ্টি খাবার চুরি করা এবং এ সম্বন্ধে মিথ্যা বলা স্বাভাবিক। আমার ছেলেও খাবার চুরি করিবে নিশ্চয় কিন্তু এ বিষয়ে মিথ্যা কথা বলিলে আমি বিস্মিত হইব। শিশু যখন মিথ্যা কথা বলে তখন তাহাকে ইহার জন্য দায়ী না করিয়া পিতামাতার নিজেদিগকেই দায়ী মনে করা উচিত। তাহাদের কর্তব্য হইবে–কি জন্য মিথ্যা কথা না বলা ভালো তাহা শান্তভাবে শিশুকে বুঝানো এবং যে যে কারণে শিশু মিথ্যা কথা বলিতে অভ্যস্ত হয় তাহা দূর করা। শাস্তি দিয়া মিথ্যা ভাষণ বন্ধ করার চেষ্টা ঠিক হইবে না, ইহার ফলে বরং তাহার ভয় বেশি হইবে এবং ভয় তাহার মিথ্যা ভাষণের প্রবণতা আরও বাড়াইয়া দিবে। আঘাত করিয়া আগুন নিভানো চেষ্টাই মতোই শাস্তিদিয়া মিথ্যা বলার অভ্যাস ত্যাগ করাইতে গেলে বিপরীত ফল ফলিবে।
