পূর্বে বলা হইয়াছে যে শিশুর সম্পত্তির উপর অধিকার-বোধের অপকারিতা আছে, উপকারিতাও আছে। ইহাকে উৎসাহ দিয়া বৃদ্ধি করা যেমন ক্ষতিকর, দমন করাও তেমনি অপকারী। কি উপায়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করিয়া শিশুর সহিত আচরণ করা উচিত তাহা আলোচনা করা যাক।
খেলার মধ্যে কতক হইবে শিশুর ব্যক্তিগত সম্পত্তি, কতক হইবে সকলের সাধারণ সম্পত্তি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দোলনা, ঘোড়া সর্বদাই সাধারণ সম্পত্তি হইবে। ইহা হইতে একটি নীতি ঠিক করা যায় : যেখানে খেলনাটি ব্যবহার করিয়া সকলে আনন্দ পায় কিন্তু ব্যবহার করিতে হয় একে একে একজনের পর আর একজন পালা করিয়া সেখানে ইহা যদি বেশ বড় এবং দামি হয় তবে ইহাকে সাধারণ সম্পত্তি বলিয়া গণ্য করা সঙ্গত। পক্ষান্তরে শিশুদের বয়সের কমবেশি হওয়ায় যদি কোনো খেলনা সকলের পক্ষে সমান আকর্ষণীয় না হয় তবে ইহা যাহাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয় তাহার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হইতে পারে। যদি কোনো খেলনা নাড়াচাড়া করিতে যত্নের প্রয়োজন হয় যাহা কেবল একটু বয়স্ক শিশুরাই করিতে পারে তবে ছোটদের হাতে দিয়া তাহা নষ্ট করিয়া ফেলা উচিত নয়। ছোট শিশুকে বরং তাহার বয়সের উপযোগী পুতুল বা খেলনা দিয়া তাহার অভাব পূরণ করা চলে। দুই বৎসর বয়সের পর শিশু যদি নিজের দোষে পুতুল ভাঙিয়া ফেলে তবে সঙ্গে সঙ্গে আবার নূতন খেলনা দিবেন না; খেলনার অভাব তাহাকে কিছুদিন বুঝিতে দিতে হইবে। শিশু যাহাতে তাহার খেলনা অন্য ছেলেকে খেলিতে দিতে সর্বদা অসম্মত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখিবেন। শিশুর যদি বেশি খেলনা থাকে তবে সে যেইগুলি ব্যবহার করে না, সেইগুলি অন্য শিশুর খেলার জন্য দিতে তাহাকে আপত্তি করিতে দিবেন না। তবে যে খেলনা অন্য শিশু হয়তো ভাঙিয়া ফেলিতে পারে কিংবা যে খেলনা দিয়া ইহার মালিক নূতন কিছু তৈয়ার করিয়াছে তাহা অন্যের হাতে না দেওয়াই বাঞ্ছনীয়; যতদিন না সে তাহার সৃষ্টির কথা ভুলিয়া না যায় ততদিন তাহার পরিশ্রমের পুরস্কারস্বরূপ ইহা রাখা উচিত। এই ব্যতিক্রমটুকু মনে রাখিয়া শিশুর খেলার সরঞ্জাম দিয়া অন্য শিশুকে খেলিতে দিতে হইবে। শিশু হয়তো অনেক সময় স্বেচ্ছায় এইরূপ ভদ্র আচরণ করিবে না। সে ক্ষেত্রে কঠোর হওয়াই উচিত। শিশুর কোনো জিনিস অন্য কেহ হাতে লইলেই যে তৎক্ষণাৎ তাহার হাত হইতে তাহা কাড়িয়া লইবে এরূপ আচরণ কখনই বরদাস্ত করিবেন না। বয়স্ক শিশু যদি অপেক্ষাকৃত ছোট শিশুর প্রতি অসদয় ব্যবহার করে আপনিও তাহার প্রতি দ্রুপ ব্যবহার করুন এবং কেন আপনি ওইরূপ করিলেন তাহা সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে বুঝাইয়া দিন। এইরূপ আচরণ দ্বারা শিশুদের মধ্যে কিছুটা প্রীতির ভাব গড়িয়া তোলা যায়, যাহার ফলে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া ও কান্নাকাটি বন্ধ হইতে পারে। সময় সময় কিছুটা কঠোর হওয়ার এবং মৃদু শাস্তিদানের প্রয়োজনও হইতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই দুর্বলের উপর অত্যাচার করার অভ্যাস গড়িয়া উঠতে দেওয়া সঙ্গত হইবে না।
সাধারণ সম্পত্তি : শিশুর নিকট প্রিয় কতকগুলি খেলনা তাহার নিজস্ব সম্পত্তি বলিয়া গণ্য করিতে হইবে, আর যে খেলনাগুলি অন্যকেও ব্যবহার করিতে দেওয়া চলে সেইগুলির সম্বন্ধে এইরূপ নিয়ম করিতে হয় : যে যখন ব্যবহার করিবে সেইগুলির উপর তখনকার জন্য সম্পূর্ণরূপে তাহারই অধিকার থাকিবে। মন্তেসরি খেলার সরঞ্জামগুলি বিদ্যালয়ের সকল শিশুর সাধারণ সম্পত্তি কিন্তু একজন যখন কোনো একটি ব্যবহার করে তখন আর কেহ সেটি দাবি করিয়া তাহার খেলায় বাধা দেয় না। এইরূপ ব্যবস্থার ফলে শিশুর মনে ধারণা জন্মে যে, যতক্ষণ যে কোনো দ্রব্য ব্যবহার করিবে ততক্ষণ সেইগুলির মালিক সে নিজে। কাজই হইল তাহার মালিকানা-স্বত্বের ভিত্তি। পরবর্তিকালের কর্মপ্রণালী ও মনোভাবের সঙ্গে এ সময়কার মনোভাবের কোনো বিরোধ নাই।
অত্যন্ত কচি শিশুর পক্ষে এইরূপ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায় না, কেননা তখনও তাহাদের গঠন ক্ষমতা প্রকাশ পায় নাই। ক্রমে বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে ইহা প্রবর্তন করা উচিত। যখন তাহারা বুঝিতে পারে যে তাহাদের খেলিতে ইচ্ছা হইলেই খেলার সরঞ্জাম ফিরিয়া পাইবে তখন তাহাদের অন্যকে ব্যবহার করিতে দিতে বিশেষ আপত্তি থাকে না, থাকিলেও রীতি মানিয়া চলার ফলে ক্রমে তাহা দূর হয়।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি : তথাপি শিশুর বয়স কিছু বেশি হইলেই তাহাকে কিছু বই দেওয়া উচিত; এইগুলি হইবে তাহার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। পুস্তক প্রীতি তাহার পড়ার বাসনা উদ্রেক করিবে। তবে দেখিতে হইবে বইগুলি যেন প্রকৃতই ভালো বই হয়; তার শিশুরা যদি বাজে বই চায় তাহা বরং সকলের সাধারণ সম্পত্তি বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে।
মূলনীতি : স্বার্থপরতা এবং সম্পত্তি লাভের বাসনা দুই-ই শিশুর জীবনে সত্য এবং তাহার চরিত্রগঠনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে : পিতামাতাকে শিশুর প্রকৃতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করিয়া যত্নসহকারে এই উপযুক্ত আচরণ শিখাইতে হইবে। এই সম্পর্কে কয়েকটি মূলনীতি মনে রাখা আবশ্যক :
প্রথম, যথেষ্ট পরিমাণ খেলনা নাই বলিয়া শিশুর মনে যেন বিফলতা বা ব্যর্থতার ভাব জাগ্রত না হয়। এই ভাব বদ্ধমূল হইয়া গেলে শিশু পরবর্তিকালে হয় অনুদার, সংকীর্ণমনা, কৃপণ।
