বর্তমানে ছোট পরিবারের সংখ্যাই বেশি; এজন্য অনেক পরিবারে শিশুর শিক্ষায় এই দিকটি সমস্যা সৃষ্টি করে। নার্সারি স্কুল এরূপ ক্ষেত্রে উপকারে আসে। সেখানে সমবয়সী শিশুদের পরস্পর মিলিয়া খেলা করিবার সুযোগ শিশুর জীবন গঠনে বিশেষ কাজে লাগে। এ সম্বন্ধে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হইবে। বর্তমানে শিশুর স্বার্থপরতা কিভাবে দূর করা যায় তাহা আলোচনা করিবার সময় ধরিয়া লওয়া হইতেছে যে, পরিবারের অন্তত দুইটি প্রায় সমবয়সী শিশু আছে; তাহাদের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি না হওয়ায় তাহাদের রুচিও প্রায় একইরূপ হইবে।
যেখানে খেলনা আছে মাত্র একটি অথবা খেলার আনন্দ একেবারে মাত্র একজন করিয়া উপভোগ করিতে পারে; যেমন ঘোট ঠেলাগাড়িতে চড়া, সেখানের শিশু সহজেই ন্যায়বিচার বুঝিতে পারে। অবশ্য প্রথমে সে অন্যকে বাদ দিয়া নিজেই সবটা আনন্দভোগ করিতে চায় কিন্তু বয়স্ক ব্যক্তিরা যখন নিয়ম করিয়া দেন একজনের পর আর একজন পরপর সকলেই আনন্দ ভোগ করিবে, তখন শিশু তৎক্ষণাৎ রাজি হয়। ন্যায়বিচার বোধ যে শিশুর সহজাত তাহা মনে করিবার কোনো কারণ নাই। তবে কত শীঘ্র এ বোধ সৃষ্টি করা যায় তাহা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। বিচার অবশ্য প্রকৃতই ন্যায় বিচার হওয়া চাই, কোনো একজনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকিলে চলিবে না। আপনি যদি কোনো শিশুকে অপরের অপেক্ষা বেশি ভালোবাসেন, লক্ষ্য রাখিবেন তাহাদিগকে আনন্দ দিবার সময় আপনার আচরণে যেন পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ না পায়। এটা সর্বসম্মত নীতি যে একই বাড়ির শিশুদের খেলনা সমান হওয়ার দরকার।
ন্যায় বিচার ও নীতি উপদেশ : শিশু যখন ন্যায় বিচার দাবি করে তখন শুধু নীতি উপদেশে ভুলাইয়া রাখিলে কোনো ফল হইবে না। ন্যায়সঙ্গতভাবে যেটুকু তাহার প্রাপ্য তাহার তুলনায় বেশি দিবেন না কিন্তু ইহাও আশা করিবেন না যে, সে কিছু কম লইয়াই সন্তুষ্ট থাকুক। The Fair Child Family পুস্তকে অন্তরের গুপ্ত পাপ [The Secret Sins of the Heart] শীর্ষক একটি অধ্যায় আছে, যে যে প্রণালী বর্জন করা উচিত এখানে তাহার উল্লেখ আছে। লুসি জানে সে ভাল মেয়ে কিন্তু তাহার মা তাহাকে বলেন যে, তাহার আচরণ দৃশ্যত ভাল হইলেও তাহার চিন্তাগুলি খারাপ। তিনি বাইবেল হইতে উদ্ধৃত করিয়া বলেনঃ হৃদয় সবচেয়ে বেশি প্রবঞ্চনাপূর্ণ এবং ভীষণ পাপে ভরা শ্ৰীমতী Fairchild তাঁহার মেয়ে লুসিকে একখানি ছোট খাতা দিলেন, তাহার বাইরের আচরণ যখন ভালো, তখন হৃদয়ে যে পাপ উঁকিঝুঁকি মারে তাই এই খাতায় লিখিয়া রাখিতে হইবে। একদিন প্রাতভোজনের সময় লুসির পিতামাতা তাহার বোনকে একটি ফিতা এবং তাহার ছোট ভাইকে চেরি ফুল দিলেন কিন্তু তাহাকে কিছুই দেওয়া হইল না। এই বিষয়ে লুসি তাহার খাতায় লিখিয়া রাখিল আমার মা-বাবা আমার অপেক্ষা ছোট ভাইবোনকে বেশি ভালোবাসে এই পাপচিন্তা আমার মনে উদয় হইয়াছিল। তাহাকে শিখানো হইয়াছিল এবং সে বিশ্বাসও করিত যে, নৈতিক-মানসিক শাসন দ্বারা এই পাপচিন্তা দূর করিতে হইবে। কিন্তু এইরূপ করিলে মনের স্বাভাবিক বাসনাকে শুধু দাবাইয়া রাখা হইবে এবং পরবর্তিকালে এই নিগৃহীত বাসনাই নূতন ও বিকৃত আকারে আত্মপ্রকাশ করিবে। এ ব্যাপারে প্রকৃত পন্থা ছিল–লুসির পক্ষে তাহার মনের কথা প্রকাশ করা এবং তাহার পিতা-মাতার পক্ষে উচিত ছিল লুসিকে কোনো উপহার দিয়া অথবা তখন দিবার মতো অন্য কোনো কিছু না থাকায় দেওয়া গেল না, পরে তাহাকেও দেওয়া হইবে ইহা বুঝাইয়া তাহার পিতামাতার ন্যায় বিচার ও পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে যে সন্দেহ জাগিয়াছিল তাহা নিরসন করা। সত্য কথা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করিলে তাহা সন্দেহ দূর করে কিন্তু শুষ্ক নৈতিক উপদেশ দিয়া ও শাসন করিয়া ইহা দমন করিতে গেলে ইহাকে শুধু বাড়াইয়া দেওয়া হয়। সম্পত্তি বোধ :
ন্যায় বিচারের সহিত আরও একটি বিষয়ের নিবিড় সম্বন্ধ আছে; ইহা হইল সম্পত্তি বোধ অর্থাৎ কোনো জিনিস নিজের অধিকারে রাখিবার আত্মপ্রসাদ। এই মনোভাবটির ভালো এবং মন্দ উভয় দিকই আছে। কাজেই ইহাকে অতিরিক্ত উৎসাহ দিলে যেমন ক্ষতিকর হইতে পারে, শাসন দ্বারা দাবাইয়া রাখিলেও তেমনি শিশুর সুস্থ আত্মবিকাশে বিঘ্ন সৃষ্টি করিতে পারে। এ সম্পর্কে শিশুর সঙ্গে কিরূপ আচরণ করিতে হইবে তাহার বাধা-ধরা নিয়ম ঠিক করিয়া দেওয়া যায় না। শিশুর প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বুঝিয়া কিরূপ আচরণ করা সঙ্গত তাহা নির্ণয় করিতে হইবে। তবে এরূপ ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।
শিশুর সম্পত্তি-প্রীতি যদি খুব বেশি হয় তবে পরবর্তী জীবনে ইহা হইতে অনেক দুর্বিপাকের সৃষ্টি হইতে পারে; পৃথিবীতে যত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতা অনুষ্ঠিত হয়, যত মতবাদ, কলহ ও দ্বন্দ্ব মানবসমাজকে আলোড়িত করে তাহার অন্যতম কারণ মূল্যবান সম্পত্তি হারানোর ভয়। কাজেই যতদূর সম্ভব নরনারী যাহাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর ভীতি না করিয়া সুখি হইতে পারে এইরূপ মনোভাব গড়িয়া তোলাই বাঞ্ছনীয়, অর্থাৎ কেবল নিজেদের সম্পত্তির রক্ষামূলক কাজে লিপ্ত না থাকিয়া তাহারা যাহাতে সৃজনাত্মক কাজে আনন্দ পাইতে পারে এইরূপ শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। এইজন্য শিশুদের সম্পত্তির অধিকার-বোধ উগ্রভাবে বাড়িতে না দেওয়া ভাল। তবে এই সম্বন্ধে মনে রাখিতে হইবে যে, কোনো জিনিসের অধিকার পাইবার বাসনা শিশুর জীবনে অত্যন্ত প্রবল থাকে। শিশু যখন দৃষ্ট জিনিস ধরিতে পারে, যখন তাহার হস্ত ও চক্ষুর মধ্যে সামঞ্জস্য সাধিত হয় তখন হইতেই এই অধিকার লাভের বাসনা বৃদ্ধি পাইতে থাকে। যাহা সে হস্তে চাপিয়া ধরে তাহাই সে নিজের মনে করে এবং কাড়িয়া লইলে রাগান্বিত হয়। শিশুর যদি খেলনা না থাকে তবে সে ভাঙা কাঠি, ইটের টুকরা এবং এইটা সেইটা কুড়াইয়া আনিলে নিজের সম্পত্তি বলিয়া জমাইয়া রাখিবে। জিনিস থাকিলে শিশু তাহার যত্ন লইতে শেখে এবং ধ্বংস করা মনোবৃত্তি কমিয়া যায়। শিশু নিজে যাহা নিজের জন্য তৈয়ার করিয়া লয় তপ্রতি তাহার মমতা ও গর্ববোধ খুব বেশি। সম্পত্তির উপর অধিকার-বোধ জন্মিতে না দিলে শিশুর গঠন করার আবেগ আহত করা হয়।
