স্বার্থপরতা : যতই বিশ্লেষণ করা যায় ততই ইহা অস্পষ্ট হইতে থাকে। কিন্তু শৈশবে শিশুর জীবনে ইহা সুস্পষ্ট আকারে প্রকাশ পায়; এবং ইহার ফলে যে সমস্যার উদ্ভব হয় তাহার সমাধান একান্ত আবশ্যক। কোনোরূপ শিক্ষা না দিলে একজন শিশু তাহার অপেক্ষা কম বয়সীর খেলনা কাড়িয়া লইবে, নিজের ভাগ অপেক্ষা বেশি দাবি করিবে এবং তাহার কমবয়সী নিরাশ হউক আর নাই হউক সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ না করিয়া নিজের বাসনা পূর্ণ করিতেই চেষ্টা করিবে। বাহিরের চাপে যদি নিয়ন্ত্রিত ও সংযত না হয় তবে গ্যাসের মতো মানুষের সাহসিকতাও ক্রমেই বিস্তার লাভ করে। এ ব্যাপারে শিক্ষার উদ্দেশ্য হইল মানুষের ক্রমবর্ধমান স্বার্থপরতাকে সংযত করিবার জন্য বাহিরের চাপ প্রয়োগ করা; এ চাপ শিশুকে কিল, চড় বা অন্য শাস্তিদান নয়, শিশুর মনে সহানুভূতি, ভাল ভাব ও সদভ্যাস গড়িয়া তোলা। শিশুর মনে ন্যায় বিচারের ভাবটি দৃঢ় করিতে হইবে, আত্মত্যাগের ভাব নয়। সংসারে প্রত্যেক লোকেরই কিছু স্থানের উপর অধিকার আছে; সে যদি তাহার নিজের প্রাপ্য অধিকারের জন্য দণ্ডায়মান হয় তবে তাহাকে দোষ দেওয়া উচিত নয়। যখন স্বার্থত্যাগ শিক্ষা দেওয়া হয় তখন হয়তো (শিক্ষাদাতার) উপদেষ্টার মনে এই ধারণা বিদ্যমান থাকে যে, ইহা পুরাপুরি মাত্রায় অনুসরণ করা হইবে না; কাজেই বাস্তব ফল প্রায় ঠিকই হইবে অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গতভাবে যেটুকু তাহার প্রাপ্য তাহার দাবি সে ছাড়িবে না। কিন্তু কার্যত লোকে এরূপ উপদেশ গ্রহণ করিতে পারে না কিংবা নিজেদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করিতেও মনে মনে পাপ ও সঙ্কোচ বোধ করে, আর না হয় হাস্যকরভাবে আত্মত্যাগের চরম নিদর্শন দেখায়। যদি কেহ নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার পর্যন্ত ত্যাগ করে তবে যাহার জন্য ত্যাগ করা হইল ত্যাগীর মনে তাহার প্রতি ক্ষীণ আক্রোশ লুক্কায়িত থাকে; স্বার্থপরতা কৃতজ্ঞতা লাভের বাসনার ছদ্মবেশে তাহাদের মনে মনের পিছন-দরজা দিয়া প্রবেশ করে। যাহাই হোক আত্মত্যাগ সত্য নীতি বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না, কেননা ইহাকে সর্বজনীন করা সম্ভবপর নয়। যাহা সত্য নয় তাহাকে গুণের উপায় হিসাবে শিক্ষা দেওয়া কখনোই সমীচীন নয়, কারণ মিথ্যা ধরা পড়িলেই গুণও কর্পূরের মতো উবিয়া যায়। পক্ষান্তের ন্যায়বিচার সকলের পক্ষে সমানভাবে প্রযোজ্য; ইহা সর্বজনীন। কাজেই শিশুর অভ্যাসে ও চিন্তায় আমাদিগকে ন্যায়ের ধারণা অনুপ্রবেশ করাইতে হইবে।
ন্যায়বিচার শিখানো : সঙ্গিনীর শিশুকে ন্যায়বিচার শিখানো অসম্ভব না হইলেও কঠিন। বয়স্ক ব্যক্তির অধিকার ও বাসনা এবং শিশুর আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে এত বেশি পার্থক্য যে, এগুলি শিশুর মনে কোনো সাড়া জাগায় না। একই প্রকার আনন্দলাভের জন্য উভয়ের মধ্যে কোনোরূপ সাক্ষাৎ প্রতিযোগিতাও নাই; অধিকন্তু বয়স্ক লোকেরা জোর করিয়া অন্যকে দিয়া তাহাদের দাবি পূরণ করাইতে পারে, কাজেই তাহাদের বিচারক তাহারা নিজেরাই। তাহাদের স্বার্থের সঙ্গে শিশুর স্বার্থের দ্বন্দ্ব রাখিলে শিশুরা নিরপেক্ষ লোকের নিকট হইতে ন্যায়বিচার পাইল বলিয়া ধারণা করিতে পারে না। বয়স্ক লোকেরা শিশুদের আচরণ সম্বন্ধে উপদেশ দিতে পারে, যেমন মা যখন কিছু গুনিতেছেন তখন মাঝখানে বাধা দিয়ো না, বাবা, যখন কাজ করেন তখন চিৎকার করো না, যখন বাড়িতে আগন্তুক আসে তখন কিছুর জন্য বায়না ধরো না ইত্যাদি। শিশুরা যদি অন্য সময় সদয় ব্যবহার পায় তবে উপদেশ মানিয়া লইয়া সংযত আচরণ করে কিন্তু ইহার যুক্তিযুক্ততা তাহারা বুঝিতে পারে না। শিশুদিগকে এরূপ নিয়ম মানিতে বাধ্য করা উচিত, কেননা তাহাদিগকে যথেচ্ছাচারী হইতে দেওয়া সঙ্গত। ইহা ছাড়া তাহাদিগকে ইহাও বুঝিতে হইবে যে অন্যলোকের কাছে তাহাদের কাজের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। কিন্তু এরূপ শিক্ষার ফলে শিশুদের নিকট হইতে বাহিরে-দেখানো ভদ্র আচরণ ছাড়া আর কিছু আশা করা যাইবে না; যখন শিশুর সমবয়সী অন্য বালক-বালিকা থাকে কেবল তখনই তাহার মনে ন্যায়বিচার সম্বন্ধে যথার্থ ধারণা জন্মানো যায়। শিশুকে বহুদিন একাকী সাথীবিহীন অবস্থায় না রাখার পক্ষে ইহা একটি যুক্তি বটে। যে দম্পত্তির একটিমাত্র সন্তান তাহাদিগকে মাঝে মাঝে শিশুর জন্য সঙ্গীর ব্যবস্থা করিতে হইবে। ইহার জন্য শিশুকে সাময়িকভাবে কাছছাড়া করিতে হইলে তাহা করা উচিত। নিঃসঙ্গ শিশুর বাসনাগুলি বয়স্ক ব্যক্তির হাতে নিগৃহীত, দমিত হয়, অথবা সে স্বার্থপর হইয়া বাড়িয়া উঠে।
কোনো পরিবারের একমাত্র শিশু যদি দ্র আচরণে অভ্যস্ত হয় তবে সে হয় অনুকম্পার পাত্র, আর যদি অভদ্র ব্যবহার শেখে তবে হয় বিরক্তিজনক। সমবয়সীদের সঙ্গলাভে বঞ্চিত হইলে শিশুর মনের অনেকগুলি গুণ পরিপূর্ণভাবে বিকাশের সুযোগ পায় না। সঙ্গীবিহীন শিশু সর্বদা বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকিলে তাঁহাদের উপদেশ পালন করিতে শেখে বটে কিন্তু সেইরূপ জোর করিয়া চাপানো আচরণ তাহার কাছে প্রীতিপ্রদ হইতে পারে না। নিরূপায় হইয়া সে প্রাণহীনভাবে কতকগুলি বাঁধাধরা ভদ্র আচরণ পালন করে। তাই সে কৃপার পাত্র। পক্ষান্তরে পিতামাতার অতিরিক্ত আদর যত্ন লাভ করিয়া শিশু যদি আত্মসর্বস্ব, স্বার্থপর, আবদারের হইয়া ওঠে তবে তাহার আচরণ অন্যের বিরক্তি উৎপাদন করে।
