যন্ত্র :
যে ব্যক্তি সমাজকে একটি যন্ত্র বলিয়া মনে করে তাহাকে অনেকটা আধুনিক বলা চলে। শিল্পপতি এবং কমিউনিস্ট এই শ্রেণিতে পড়ে। তাহাদের নিকট মানব স্বভাব নীরস এবং আকর্ষণবিহীন; মানবজীবনের উদ্দেশ্যও অতি সরল বলিয়া বোধ হয়। তাহারা মনে করে দ্রব্যের উৎপাদন বৃদ্ধিই মানুষের একমাত্র কাম্য। এই সহজ উদ্দেশ্য সিদ্ধ করাই তাহাদের সমাজ সংগঠনের লক্ষ্য। কিন্তু অসুবিধা হইল এই যে, সংগঠকগণ যাহা সাধারণ মানুষের বাঞ্ছনীয় বলিয়া মনে করেন লোকে তাহা অপেক্ষা অনেক বেশি জিনিস পাওয়ার কামনা করে। সংগঠকগণ পরিকল্পনা করিয়া নির্ধারণ করেন। কি কি জিনিস পাইলেই মানুষের সন্তুষ্ট থাকা উচিত; তাহাদের পরিকল্পনা মতো দ্রব্যের উৎপাদন বাড়াইয়া লোকের অভাব পূরণ করা এবং সকলকে সুখি করাই ইহাদের উদ্দেশ্য কিন্তু মানুষের বাসনার অন্ত নাই। নূতন সমাজ সংগঠকের তালিকাভুক্ত জিনিস পাইয়া লোকে সন্তুষ্ট হয় না। ইহার ফলে সংগঠককে বাধ্য হইয়া এমন ছাঁচে ঢালা সমাজ গড়িতে চেষ্টা করিতে হয় যেখানে সকলেই তাঁহার আদর্শকে মানিয়া লইয়া তিনি যাহা ভালো মনে করেন তাহাই সানন্দে গ্রহণ করিবে। এই প্রচেষ্টাকে বলা যায় সোজা খাপে বাঁকা তলোয়ার ভরার কসরৎ। ইহা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি করে এবং অবশেষে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টি করে।
বৃক্ষ :
সমাজ-ব্যবস্থাকে যিনি একটি বৃক্ষের মতো মনে করেন তাঁহার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যের সঙ্গে পার্থক্য থাকে। একটি খারাপ যন্ত্র ভাঙিয়া ফেলিয়া তাহার পরিবর্তে নূতন যন্ত্র স্থাপন করা যায়। কিন্তু একটি গাছ কাটিয়া ফেলিলে সেইরূপ আকার ও শক্তিসম্পন্ন একটি নূতন গাছ জন্মিতে অনেক সময় লাগিবে; যন্ত্র বা ছাঁচ নির্মাতার ইচ্ছামতো তৈয়ার করা যায় কিন্তু বৃক্ষের নিজস্ব স্বভাব আছে। যত্ন পরিচর্যায় সেই নির্দিষ্ট স্বভাবই বিকশিত হইয়া ওঠে। যে-জাতীয় গাছ তাহার বৈশিষ্ট্যগুলি প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিয়া ইহাদের বৃদ্ধি কম বেশি করা যায় এইমাত্র; এক জাতীয় গাছকে অন্য জাতীয় গাছে পরিণত করা যায় না। জীবন্ত জিনিস গড়িয়া তোলা আর যন্ত্র তৈয়ার করার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। জীবন্ত জিনিস গড়িতে কৌশলের প্রয়োজন বেশি নয়; ইহার জন্য এক প্রকার সহানুভূতির প্রয়োজন। এইজন্য শিশুদিগকে গঠন-কার্য শিক্ষা দিবার সময় কেবল ইট, কাঠ ও যন্ত্রের উপর তাহাদের গঠন-ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে শিখাইলেই চলিবে না, তাজা গাছ, পোষা পশু-পক্ষীর প্রতি যত্ন ও সমবেদনার মনোভাবও গড়িয়া তুলিতে হইবে। নিউটনের সময় হইতে জড়বিজ্ঞান মানুষের মন অধিকার করিয়াছিল, শিল্প বিপ্লবের সময় হইতে ইহার বাস্তব প্রয়োগ চলিতেছে। যন্ত্রশিল্পের উন্নতি ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের প্রতিও যন্ত্রসুলভ মনোভাব ক্রমে বৃদ্ধি পাইয়াছে। জীবের ক্রমবিবর্তনবাদ কতকগুলি নূতন ভাবধারার প্রবর্তন করিয়াছিল কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এইগুলি কতকটা ম্লান হইয়া পড়ে; সুপ্রজনন, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষা দ্বারা ইহার বিলোপ সাধন করা আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। সমাজকে বৃক্ষরূপে কল্পনা করা ছাঁচ কিংবা যন্ত্ররূপে কল্পনা করার চেয়ে ভালো কিন্তু ইহাও দোষমুক্ত নয়। মনোবিজ্ঞানের সাহায্যে লইয়া এই দোষ-ক্রটি দূর করিতে হইবে।
মনোবিজ্ঞানমূলক সংগঠন :
মনোবিজ্ঞানমূলক গঠন (Psychological Constructiveness] নূতন এবং সম্পূর্ণ অভিনব ধরনের। এ পর্যন্ত ইহার বৈশিষ্ট্য এবং উপকারিতা লোকে উপলব্ধি করিতে পারে নাই। শিক্ষাপ্রণালী, রাজনীতি ও সকল মানবীয় ব্যাপারে ইহার একান্ত প্রয়োজন এবং নাগরিক যাহাতে মিথ্যা সাদৃশ্য দেখিয়া বিভ্রান্ত না হয় সেইজন্য তাহাদের কল্পনাক্ষেত্রে ইহাকে একটি বিশেষ স্থান দিতে হইবে। কতক লোক মানুষের ব্যাপারে কোনও কিছু গঠন করিতে ভয় পান; তাহাদের আশঙ্কা আছে তাহাদের মানুষকে প্রাণহীন যন্ত্রে পরিণত করিয়া ফেলেন; মানুষের স্বভাবের উপরই তাঁহারা নির্ভর করেন।
অতএব অরাজকতা এবং তাহার ফলে মানুষের পুনরায় পশুত্বে প্রত্যাবর্তন [Back to nature] ইহার উপরই তাঁহাদের বিশ্বাস। মনোবিজ্ঞানমূলক গঠন ও যন্ত্রের গঠনের মধ্যে কি পার্থক্য তাহা এই পুস্তকে স্কুল উদাহরণ সাহায্যে দেখাইতে চেষ্টা করিতেছি। উচ্চশিক্ষায় এইভাবের কল্পনা-উদ্রেককারী দিকটার সহিত বিদ্যার্থীর পরিচয় ঘটাইতে হইবে। এইরূপ করিতে পারিলে আমার বিশ্বাস এই যে, আমাদের রাজনীতি আর এমন তীব্র ও ধ্বংসমুখি থাকিবে না; ইহার পরিবর্তে রাজনীতি হইবে নমনীয় এবং বিজ্ঞানসম্মত, আর উৎকৃষ্ট নরনারী প্রস্তুত করাই হইবে ইহার উদ্দেশ্য।
০৭. স্বার্থপরতা ও সম্পত্তি
পূর্ববর্তী এক অধ্যায়ে ভয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হইয়াছে, বর্তমান অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়টিও ভয়ের মতোই প্রবল আবেগসঞ্জাত, আংশিকভাবে প্রবৃত্তি হইতে উৎপন্ন এবং বিশেষভাবে অবাঞ্ছনীয়। এই রকম ক্ষেত্রে শিশুর স্বভাবকে হঠাৎ বাধা দিয়া সংশোধনের চেষ্টা বা তাহাকে মনোমতোভাবে চালাইবার চেষ্টা করা কখনই উচিত হইবে না। শিশুর স্বভাব এবং প্রকৃতি সম্বন্ধে উদাসীন থাকায় কোনো লাভ নাই কিংবা শিশুর প্রকৃতি যদি অনুরূপ হইত তবে ভালো হইত মনে মনে কেবল এরূপ আশা করিয়াও কোনো উপকার হইবে না। শিশুকে তাহার স্বভাব ও প্রকৃতিজাত আবেগসহ কাঁচামালরূপে [Raw material] গ্রহণ করিতে হইবে। তারপর উপযুক্ত শিক্ষার ভিতর দিয়া এমনভাবে তাহার প্রবৃত্তিগুলির বিকাশ ঘটাইতে হইবে যাহাতে বাঞ্ছনীয় আচরণগুলি তাহার জীবনে অভ্যস্ত হইয়া যায়।
