পিথাগোরাসের সময় থেকে গণিত ও ধর্মতত্ত্বের যে সংমিশ্রণ শুরু হয়েছে তা-ই গ্রিসের ধর্মীয় দর্শন, মধ্যযুগীয় ধর্মীয় দর্শন এবং আধুনিক যুগে কান্ট পর্যন্ত ধর্মীয় দর্শনের স্বরূপ গঠন করেছে। পিথাগোরাসের আগে অফিজম ছিল এশীয় গুহ্য। ধর্মগুলোর অনুরূপ। কিন্তু প্লেটো, সেন্ট অগাস্টিন, টমাস অ্যাকুইনাস, দেকার্তে, স্পিনোজা এবং লাইবনিজে ধর্মের সঙ্গে চিন্তনের, নৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে পিথাগোরাস থেকে আগত সময়নিরপেক্ষ বিষয়ের প্রতি যৌক্তিক মুগ্ধতা-যা এশিয়ার সহজ-সরল মরমিবাদ থেকে ইউরোপের বৌদ্ধিকীকৃত ধর্মতত্ত্বকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছে-তার এক ঘনিষ্ঠ মিশ্রণ ঘটেছে। কেবল অতি সাম্প্রতিককালে এসেই পরিষ্কারভাবে বলা সম্ভব হয়েছে পিথাগোরাসের ভুলটা কী ছিল। চিন্তার জগতে পিথাগোরাসের মতো প্রভাব বিস্তারকারী আর কোনো ব্যক্তির কথা আমার জানা নেই। এ কথা বলছি এ কারণে যে, প্লেটোবাদে যা দেখা যায় তা বিশ্লেষণ কবলে দেখা যাবে তার সারমর্ম রয়েছে পিথাগোরাসবাদে। ইন্দ্রিয়ের কাছে নয়, বুদ্ধির সামনে উন্মোচিত একটি শাশ্বত জগতের পুরো ধারণাটিই এসেছে পিথাগোরাসের কাছ থেকে। পিথাগোরাস না থাকলে ক্রাইস্ট শব্দটাই ক্রিস্টানদের মাথায় আসত না। তিনি না থাকলে ধর্মতাত্ত্বিকদের ঈশ্বর ও অমরত্বের যৌক্তিক প্রমাণ অন্বেষণের প্রয়াসই জাগত না। যাই হোক, এসব কিছুই এ পর্যন্ত তার মধ্যে নিহিতরূপে ছিল। কীভাবে তা প্রকাশ্য হয়েছে তা আমাদের আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জানা যাবে।
০৪. হেরাক্লিটাস
গ্রিকদের সম্পর্কে বর্তমানকালে দুটি বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণভাবে প্রচলিত। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটি রেনেসাঁর যুগ থেকে শুরু করে অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বস্তুত সর্বজনীন ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল গ্রিকদের প্রতি প্রায়-কুসংস্কারের সমতুল্য একধরনের ভক্তি। ভাবা হতো যে তারা সব সর্বোত্তম কিছুর উদ্ভাবক, তাদের প্রতিভা ছিল এমন অতিমানবিক পর্যায়ের, যার সঙ্গে আধুনিক মানুষের সমতুলনার কথা প্রত্যাশাই করা চলে না। অন্য দৃষ্টিভঙ্গিটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল বিজ্ঞানের বিজয় আর সভ্যতার প্রগতির প্রতি আশাবাদী একধরনের বিশ্বাস দ্বারা। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি এ রকম যে, চিন্তার জগতে গ্রিকদের অধিকাংশ অবদানই এখন বিস্মৃতির বিষয়। এ দুই দৃষ্টিভঙ্গির কোনোটার প্রতিই ব্যক্তিগতভাবে আমার পক্ষপাত নেই। আমি বলব, উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই অংশত সঠিক এবং অংশত ভুল। বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশ করার আগে আমি সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করব, গ্রিক চিন্তাজগৎ থেকে আমরা কী ধরনের জ্ঞান এখনো পেতে পারি।
নানা ধরনের প্রকল্পই বিশ্বজগতের প্রকৃতি ও গঠন-কাঠামো সম্পর্কে সম্ভবপর। অধিবিদ্যার বিকাশ যতখানি ঘটেছে তাতে রয়েছে এসব প্রকল্পের এক ক্রমান্বয়িক পরিশীলন, রয়েছে সেসবের তাৎপর্যের বিকাশ এবং সেগুলোর বিরুদ্ধবাদীদের আপত্তি মোকাবিলা করার জন্য প্রত্যেকটি প্রকল্পের পুনর্গঠন। এসব আনুমানিক তত্ত্ব অনুসারে জগতের ধারণা গঠন করতে পারার মধ্যে একধরনের কল্পনাপ্রবণ আনন্দ পাওয়া যেতে পারে এবং তা অন্ধত্ববাদের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিষেধক হতে পারে। তা ছাড়াও, এসব প্রকল্পের কোনোটাই যদি প্রমাণসাধ্য না-ও হয়, তবুও সেগুলোর মধ্যে যেগুলো স্বয়ংসঙ্গতিপূর্ণ আর জ্ঞাত তথ্যাবলির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, সেগুলোর আবিষ্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর মধ্যেই জ্ঞান রয়েছে। আধুনিক দর্শনকে যেসব প্রকল্প প্রভাবিত করেছে তার প্রায় সবই প্রথমে চিন্তা করেছিল গ্রিকরা। বিমূর্ত বিষয়াবলিতে তাদের কল্পনাপ্রবণ উদ্ভাবনী শক্তির অতি-উচ্চপ্রশংসা তেমন একটি করা চলে না। গ্রিকদের সম্পর্কে আমি যা কিছু বলব তা এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলব। আমি মনে করি গ্রিকরা যেসব তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে সেগুলোর অস্তিত্ব ও বিকাশ ছিল স্বনির্ভর এবং সেগুলো-যদিও প্রাথমিক অবস্থায় ছিল বালসুলভ-দুই হাজারের বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে ও বিকশিত হতে সক্ষম ছিল।
এ কথা অবশ্য সত্য যে, বিমূর্ত চিন্তার ক্ষেত্রে গ্রিকদের অন্য আরেক রকম অবদান ছিল, সেটার অধিকতর স্থায়ী মূল্য আছে। গণিত ও অবরোহী যুক্তিমূলক চিন্তার কৌশল গ্রিকদের আবিষ্কার। বিশেষ করে জ্যামিতি এক গ্রিক উদ্ভাবন, যা ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান সম্ভব ছিল না। কিন্তু গ্রিক মনীষায় গণিতের ব্যাপারে একপেশে প্রবণতাটি ছিল এই যে, গ্রিক মনন চিন্তা করত স্বতঃসিদ্ধ বলে প্রতীয়মান একটি ধারণা থেকে অবরোহী পদ্ধতিতে, পর্যবেক্ষণলব্ধ কিছু থেকে আরোহী পদ্ধতিতে নয়। তাদের এই পদ্ধতি প্রয়োগের চমৎকার সাফল্য শুধু প্রাচীন জগৎকেই নয়, আধুনিক জগতেরও বৃহত্তর অংশকে ভুল পথে নিয়ে গেছে। বিশেষ বিশেষ ঘটনার পর্যবেক্ষণ দ্বারা আরোহী পদ্ধতিতে সূত্রের পৌঁছার চেষ্টা করে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, হেলেনিক জগতের দার্শনিকদের মনোকল্পিত স্বতঃসিদ্ধের প্রতি বিশ্বাসকে দূর করতে পেরেছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। অন্যান্য কারণসহ এই কারণেও গ্রিকদের প্রতি প্রায়-কুসংস্কারতুল্য ভক্তি পোষণ করা ভুল। যদিও গ্রিকদের মধ্যে অল্প কিছুসংখ্যক ব্যক্তির ঝোঁক ছিল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রতি, তবু সামগ্রিকভাবে এটা ছিল তাদের মেজাজের বিরোধী। তাদের শেষ চার শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতিকে খাটো করে তাদেরকে মহিমান্বিত করার প্রয়াস আধুনিক চিন্তাজগতের ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলেছে।
