পিথাগোরাসের জন্য এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, তার উপপাদ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিষম জ্যামিতিক আকারগুলোও আবিষ্কৃত হয়, যার ফলে তার পুরো দর্শনকেই ভুল প্রমাণিত হতে দেখা যায়। সমকোণবিশিষ্ট একটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজে অতিভুজের উপরে অঙ্কিত বর্গক্ষেত্র অন্য দুই বাহুর উপর অঙ্কিত যেকোনো বর্গক্ষেত্রের দ্বিগুণ। ধরা যাক প্রত্যেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১ ইঞ্চি, তাহলে অতিভুজের দৈর্ঘ্য কত হবে? মনে করা যাক অতিভুজের দৈর্ঘ্য m/n ইঞ্চি। তাহলে m^২/n^২ = ২। যদি m ও n-এর একটি উৎপাদক গুণনীয়ক থাকে তাহলে তাকে বের করলে দেখা যাবে m অথবা n-দুটোর একটি অবশ্যই হবে বেজোড়। এখন m^২-২n^২, অতএব m^২ জোড় সংখ্যা, অতএব m জোড় সংখ্যা, অতএব n বেজোড় সংখ্যা। ধরা যাক, m = 2p, তাহলে 4p^২ = ২n^২, অতএব n^২ = ২p^২, অতএব n জোড় সংখ্যা এবং অতএব n হবে একটি জোড় সংখ্যা, যা কিনা পূর্ব সিদ্ধান্তের বিপরীত। সুতরাং m/n-এর কোনো ভগ্নাংশ অতিভুজটির পরিমাপ নির্ণয় করতে পারবে না। এই প্রমাণটির সারমর্ম তাই, যা রয়েছে ইউক্লিডের ১০ম খণ্ডে।
এ যুক্তি থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, দৈর্ঘ্যের যে এককই আমরা ধরি না কেন, এমন কিছু দৈর্ঘ্য আছে যেগুলোর সঙ্গে ওই এককের কোনো সুনির্দিষ্ট সাংখ্যিক সম্পর্ক থাকে না। কথাটা বলা হচ্ছে এই অর্থে যে, m ও n বলে এমন দুটো পূর্ণসংখ্যা থাকতে পারে না যে আলোচ্য দৈর্ঘ্যের m-গুণ তার এককের n-গুণ হবে। এতে করে গ্রিক গণিতবিদদের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মে যে জ্যামিতিকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে পাটিগণিতের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, স্বাধীনভাবে। প্লেটোর সংলাপগুলোতে এমন কিছু অনুচ্ছেদের দেখা পাওয়া যায় যা থেকে এই প্রমাণ মেলে যে, প্লেটোর যুগের জ্যামিতির স্বতন্ত্র প্রয়োগ প্রক্রিয়াধীন ছিল। ইউক্লিডের সময় তার উৎকর্ষ ঘটে। ইউক্লিড তার দ্বিতীয় পুস্ত কে জ্যামিতির সাহায্যে অনেক কিছু প্রমাণ করেছেন, যেগুলো আমরা স্বাভাবিকভাবে বীজগণিতের সাহায্যে করে থাকি। যেমন-(a+b)^২ = a^২ + ২ab + b^২। বিষমগুলোর ব্যাপারে অসুবিধার কারণেই তার কাছে এটা অনিবার্য মনে হয়েছিল। একই কথা প্রযোজ্য তার পঞ্চম ও ষষ্ঠ পুস্তকে বর্ণিত ভগ্নাংশের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। পুরো পদ্ধতিটি আনন্দদায়ক, এবং এ থেকে উনিশ শতকের গণিতবিদদের পরিশ্রমক্ষমতা টের পাওয়া যায়। বিষম-এর ব্যাপারে যত দিন পর্যন্ত কোনো যথার্থ পাটিগাণিতিক তত্ত্ব ছিল না তত দিন ইউক্লিডের পদ্ধতি, যা জ্যামিতিতে যতটা খাটানো সম্ভব ছিল, তা-ই ছিল সর্বোত্তম। দেকার্তে যখন স্থানাঙ্ক জ্যামিতি প্রবর্তন করেন এবং তা করে পাটিগণিতকে আবার সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে যান, তখন তিনি বিষম-এর সমস্যাটি সমাধানের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেছিলেন। অবশ্য তার কালে সে ধরনের কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
দর্শন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর জ্যামিতির প্রভাব গভীর। জ্যামিতি, যেভাবে তা গ্রিকদের হাতে প্রবর্তিত হয়, তা শুরু হয় কতকগুলো স্বতঃসিদ্ধ ধারণা দিয়ে (বা সেগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেওয়া হয়) এবং তা থেকে অবরোহমূলক যুক্তির ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হতে কতকগুলো উপপাদ্যে পৌঁছে, যেগুলো মোটেই স্বতঃসিদ্ধ নয়। স্বতঃসিদ্ধ ও উপপাদ্যগুলোকে আমাদের অভিজ্ঞতার আওতাধীন বাস্তব স্থানে সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়। এভাবে মনে হয় যে, স্বতঃসিদ্ধ কী, প্রথমে তা খেয়াল করে তারপর অবরোহ-পদ্ধতি ব্যবহার করে বাস্তব জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্লেটো ও কান্টকে এবং তাদের মধ্যবর্তী কালের অধিকাংশ দার্শনিককে প্রভাবিত করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স-এ বলা হয়েছে : আমরা এই-সব সত্যকে সত্য বলে মনে করি। এটা আসলে ইউক্লিডের অনুকরণ। ১৮ শতকের ন্যাচারাল রাইটস মতবাদ আসলে ছিল রাজনীতিতে ইউক্লিডের স্বতঃসিদ্ধগুলোর সন্ধান।
স্বীকৃত প্রায়োগিক উপাদান থাকা সত্ত্বেও নিউটনের প্রিন্সিপিয়ার আঙ্গিক আগাগোড়াই ইউক্লিড দ্বারা প্রভাবিত। ধর্মতত্ত্বও-তার নিখুঁত স্কলাস্টিক আঙ্গিকে-একই উৎস থেকে শৈলী গ্রহণ করেছে। ব্যক্তিগত ধর্ম এসেছে আধ্যাত্মিক অনুভূতি থেকে আর ধর্মতত্ত্ব এসেছে গণিত থেকে। পিথাগোরাসের মধ্যে উভয়েরই সাক্ষাৎ মেলে।
আমার বিশ্বাস, শাশ্বত ও নির্ভুল সত্যের প্রতি বিশ্বাসের উৎস গণিত, একটি অতীন্দ্রিয় বুদ্ধিগ্রাহ্য জগতের প্রতি বিশ্বাসের উৎসও তা-ই। জ্যামিতির কারবার, উদাহরণস্বরূপ, বৃত্ত নিয়ে। কিন্তু কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু নিখুঁতভাবে বৃত্তাকার নয়। যত যত্নসহকারেই আমরা আমাদের কম্পাস ব্যবহার করি না কেন, অঙ্কিত বৃত্তে কিছু খুঁত, কিছু বিষমতা থেকেই যাবে। তাহলে এ থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গির আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, সব নির্ভুল যুক্তি কেবল ভাবনার জগতের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে নয়। এ পথে চিন্তা করলে স্বাভাবিকভাবেই আরো এগোনো যায় এবং দাবি করা যায় যে, ইন্দ্রিয়ের চেয়ে চিন্তা মহত্তর এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর চেয়ে চিন্তার বিষয়গুলো অধিকতর সত্য। শাশ্বতর সঙ্গে সময়ের সম্বন্ধ সম্পর্কিত মরমি মতবাদগুলোও বিশুদ্ধ গণিত থেকে প্রচুর রসদ পেয়েছে। কেননা, গাণিতিক বিষয়গুলো, যথা সংখ্যাগুলো, যদি আদৌ সত্য হয়, তবে সেগুলো শাশ্বত, সময়ের মধ্যে সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। ঈশ্বরের চিন্তা-ভাবনাগুলোকে এ ধরনের শাশ্বত বিষয় বলে মনে করা যেতে পারে। এখান থেকেই প্লেটোর এই মতবাদ এসেছে যে, ঈশ্বর একজন জ্যামিতিবিদ এবং এখান থেকেই স্যার জেমস জর এই বিশ্বাসের উৎপত্তি যে, ঈশ্বর গণিতের প্রতি আসক্ত। পিথাগোরাসের সময় থেকে এবং বিশেষ করে প্লেটোর সময় থেকে, মহাপ্রলয়বিশ্বাসী ধর্মের বিপরীতে বুদ্ধিবাদী ধর্ম সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে গণিত ও গাণিতিক পদ্ধতি দ্বারা।
