গ্রিকদের প্রতি হোক বা অন্য যে কারো প্রতি হোক, ভক্তির বিরুদ্ধে আরো সাধারণ একটি যুক্তি আছে। একজন দার্শনিককে পাঠ করার ক্ষেত্রে যথার্থ প্রবণতাটি হওয়া উচিত না-ভক্তি, না-ঘৃণা। বরং একধরনের তাত্ত্বিক সহানুভূতিসুলভ মন নিয়ে তাকে পাঠ করা শুরু করতে হবে। তারপর যখন মনে হবে যে, এই দার্শনিকের তত্ত্বগুলো বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে, কেবল তখনই একটি বিচারী দৃষ্টিভঙ্গিতে ফিরে যেতে হবে, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। তখন মনের অবস্থাটা যত দূর সম্ভব এমন হওয়া প্রয়োজন যে, এ পর্যন্ত যা কিছু সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল তা ত্যাগ করা হলো। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপটিতে বাধা সৃষ্টি করে ঘৃণা আর দ্বিতীয় ধাপটিকে বাধা দেয় ভক্তি। দুটো ব্যাপার স্মরণ রাখা দরকার : এক. যে ব্যক্তির অভিমত ও তত্ত্ব পাঠ করার যোগ্য, ধরে নিতে হবে যে তার কিছু-না-কিছু প্রতিভা আছে। দুই. কোনো বিষয় সম্পর্কেই সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সত্য ধারণায় পৌঁছে যাওয়া চলবে না। কোনো বুদ্ধিমান মানুষ যখন এমন কোনো মত বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে যা আমাদের কাছে স্পষ্টতই অর্থহীন বা উদ্ভট মনে হয়, তখন আমাদের উচিত হবে না সেটাকে কোনো না- কোনোভাবে সত্য প্রমাণ করতে চেষ্টা করা, কিন্তু কীভাবে তা সত্য বলে মনে হয় তা বোঝার চেষ্টা করা আমাদের উচিত। ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কল্পনাশক্তির এই অনুশীলন একই সঙ্গে আমাদের চিন্তার পরিধি বাড়ায় এবং উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে, আমাদের অনেক ধারণা বা সংস্কার অন্য মেজাজের একটি যুগের মানুষের কাছে কতটা নির্বোধ, বোকামিপূর্ণ মনে হতে পারে।
আমরা এ অধ্যায়ে আলোচনা করব পিথাগোরাস ও হেরাক্লিটাস সম্বন্ধে। তবে এ দুজনের মধ্যবর্তী আরো একজন দার্শনিক আছেন। তার গুরুত্ব অবশ্য অপেক্ষাকৃত কম। তিনি জেনোফেনিস। তার জন্ম-মৃত্যুর সন-তারিখ খুবই অনিশ্চিত। তার সময়কাল নির্ধারণ করা যায় শুধু এই তথ্য থেকে যে, তার রচনায় পিথাগোরাসের উল্লেখ আছে, আর হেরাক্লিটাস উল্লেখ করেছেন তার কথা। জন্মসূত্রে জেনোফেনিস ছিলেন আয়োনীয়, কিন্তু জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি বাস করেছেন দক্ষিণ ইতালিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সব বস্তুর সৃষ্টি মাটি ও পানি থেকে। দেবতাদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব শক্তিশালী একজন মুক্তচিন্তার মানুষ। হোমার ও হেসিয়ড দেবতাদের ওপর এমন সব বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছেন যেগুলো নশ্বর মানবদের কাছে লজ্জাকর ও ঘৃণ্য : চুরি, ব্যভিচার, পরস্পরকে বিপথগামী করা…মানুষেরা মনে করে দেবতারা যে রকম, তাদের জন্মই হয়েছে সেই রূপে। আর মনে করে, দেবতাদেরও মানুষের মতো পোশাক-পরিচ্ছদ আছে, মানুষের মতোই তাদের কণ্ঠস্বর, আকৃতি…হ্যা! যদি ষাঁড় ও ঘোড়াদের মানুষের মতো হাত থাকত আর সেই হাত দিয়ে তারা ছবি আঁকতে পারত, মানুষের মতো শিল্পকর্ম করতে পারত, তাহলে ঘোড়ারা দেবতাদের ছবি আঁকত ঘোড়ার মতো, আর ষাঁড়েরা আঁকত ষাঁড়ের মতো। আর দেবতাদের দেহগুলো তারা বিভিন্ন রকম ঘোড়া আর বিভিন্ন রকম ষাঁড়ের মতো করে আঁকত…ইথিওপিয়ার দেবতাদের রং কালো, নাক বোঁচা। থ্রেস-এর লোকেরা বলে তাদের দেবতাদের চোখ নীল আর চুল লাল। জেনোফেনিস এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন, সে ঈশ্বর আকারে ও চিন্তায় মানুষের মতো নন, তিনি তার মনের শক্তিবলে সবকিছু অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করেন। জেনোফেনিস পিথাগোরাসের দেদহান্তরবাদকে বিদ্রূপ করতেন। একদিন পথে যেতে যেতে তিনি (পিথাগোরাস) দেখতে পেলেন একটি কুকুরকে পীড়ন করা হচ্ছে। তিনি বললেন, থামো ওকে আঘাত কোরো না। সে একজন বন্ধুর আত্মা। আমি তার কণ্ঠ শুনে তা বুঝতে পেরেছি। জেনোফেনিস মনে করতেন, ধর্মতত্ত্বের বিষয়গুলোর মধ্যকার সত্য অনুধাবন করা অসম্ভব। দেবতাদের সম্বন্ধে আমি যেসব বিষয়ে কথা বলি সেসব সম্পর্কে নিশ্চিত সত্য জানে এমন মানুষ নেই, কখনো থাকবেও না। হ্যাঁ, এমনকি যদি কোনো মানুষ এমন কিছু বলে যা সম্পূর্ণরূপে সত্য, তবুও সে নিজেই সেই সত্যকে জানতে পারে না। একমাত্র অনুমান ছাড়া কোথাও আর কিছু নেই। পিথাগোরাস ও অন্যদের মরমিবাদী প্রবণতার বিপরীতে যেসব দার্শনিক ছিলেন, জেনোফেনিসের স্থান তাদের ধারায়। তবে স্বাধীন চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি প্রথম সারির নন।
আমরা যেমনটি দেখেছি, পিথাগোরাসের মতবাদগুলোকে তার শিষ্যদের মতবাদগুলো থেকে আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। তা ছাড়া, পিথাগোরাস যদিও খুবই প্রাচীন, তবুও তার ধারার প্রভাব মূলত অন্য অনেক দার্শনিকের প্রভাবের পরবর্তীকালীন। তাদের মধ্যে প্রথম জন হচ্ছে হেরাক্লিটাস। তিনি একটি তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। হেরাক্লিটাসের আবির্ভাব খ্রি.পূ. ৫০০ সালের কাছাকাছি সময়ে। তার জীবন সম্পর্কে জানা যায় খুব সামান্যই। শুধু জানা গেছে যে তিনি ছিলেন এফেসাস-এর একজন অভিজাত নাগরিক। প্রাচীনকালে তিনি খ্যাত ছিলেন প্রধানত এই মতবাদের জন্য যে, সবকিছুই একটি নিত্য-পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্যে বিরাজ করছে। কিন্তু দেখা যাবে, এটা তার অধিবিদ্যার অনেকগুলো দিকের একটি মাত্র।
হেরাক্লিটাস ছিলেন একজন আয়োনীয়, কিন্তু মিলেসীয়দের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের অংশীদার তিনি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মরমিবাদী, তবে খুবই অদ্ভুত একধরনের মরমিবাদী। তিনি মনে করতেন, আদিবস্তু হচ্ছে আগুন; আগুনের মধ্যে যেমন করে অগ্নিশিখার জন্ম হয়, তেমনি প্রত্যেক বস্তু জন্ম হয় অন্য একটি কিছুর মৃত্যুর ফলে। নশ্বররা অবিনশ্বর আর অবিনশ্বরা নশ্বর-নশ্বরের জন্মের মধ্যে আছে অবিনশ্বরের মৃত্যু আর নশ্বরের মৃত্যুর মধ্যে অবিনশ্বরের জন্ম। জগতে ঐক্য আছে, কিন্তু সে ঐক্য গঠিত হয় পরস্পর বিপরীতধর্মী বস্তুগুলোর মিলন থেকে। সব বস্তুর উৎপত্তি এক অভিন্ন বস্তু থেকে, আর সেই একের উৎপত্তি সব বস্তু থেকে। কিন্তু বহুর গুরুত্ব একের চেয়ে কম, এক হলো ঈশ্বর।
