যে নীতির কথা বলা হল, তার ব্যতিক্রম হিসাবে বলা যায়, কোনও কোনও কাজ এমনই মহৎ যে, যার জন্যে অন্যসব কাজকে পরিত্যাগ করাটা যুক্তিযুক্ত মনে করা যায়। যদি কোনও ব্যক্তি স্বদেশ রক্ষায় জীবন দান করেন, তবে স্ত্রী সন্তানদের কপর্দকশূন্য অবস্থায় রেখে যাওয়ার জন্যে কেউ তার নিন্দা করবে না। যদি কোনও বিজ্ঞানী কোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের জন্যে গবেষণা করেন এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রচেষ্টা সাফল্য লাভ করে, তা হলে পরিবারকে দারিদ্রের যন্ত্রণা সহ্য করিয়েছেন বলে কেউ তার নিন্দা করবে না, কিন্তু যদি তার সেই আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের চেষ্টা কখনো সফল না হয়, তাহলে জনমত তাকে বাতিকগ্রস্ত বলবে। কিন্তু এরকম বলা অন্যায়, কারণ এরকম কাজে সাফল্য আসবে কিনা তা পূর্বেই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। খ্রিস্ট যুগের প্রথম সহস্রাব্দে কোনও ব্যক্তি যদি সন্ন্যাস গ্রহণের জন্যে পরিবার ত্যাগ করে যেতেন তা হলে লোকে প্রশংসা করত। আজকাল কেউ এ কাজ করলে বলা হবে পরিবারের জন্যে বাঁচার সংস্থান রেখে তবেই তার তা করা উচিত।
আমার মনে হয় পেটুক আর স্বাভাবিক ক্ষুধাতুর মানুষের মধ্যে সবসময়েই একটা গভীর মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য থেকে যায়। যে মানুষের কোনও বাসনা অতিরিক্ত ধাবমান হয়, অন্যসব বাসনার বিনিময়ে, সে সাধারণত এমন লোক যার মনের গভীরে লুকিয়ে রয়েছে কোনও বেদনা। আর সেইজন্যেই সে যেন একটা ছায়ামূর্তির কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করছে। পানাসক্তের বেলায় এটা স্পষ্ট দেখা যায়। ভুলে থাকবার জন্যে লোকে মদ খায়, তাদের জীবনে যদি ঐ রকম অপচ্ছায়ার উৎপাত না থাকত, তাহলে তারা মাতলামিকে কখনও মিতাচার থেকে বেশি গ্রহণীয় মনে করত না। লোক কাহিনীর চীনা বলেছিল, আমি মদ খাওয়ার জন্যে মদ খাই না। মাতাল হওয়ার জন্যে মদ খাই।’ এই হচ্ছে একপেশে এবং অত্যধিক সব প্রবৃত্তির পরিচিত রূপ। বস্তুর অন্তর্নিহিত আনন্দ খুঁজে দেখা হয় না, খোঁজা হয় তাকে উপলক্ষ্য করে বিস্মৃতি। যদিও মদাসক্তির ফলে যে বিস্মৃতি চাওয়া হয় তার সাথে এর বিস্তর পার্থক্য। বরোর বন্ধু, যিনি স্ত্রীকে হারাবার বেদনা সহ্য করার জন্যে চীনা ভাষা শিখেছিলেন, তিনিও বিস্মৃতিই চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা এমন একটা উপায়ে যা অনিষ্টকর নয় বরং তা তার বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছিল। এই রকম পলায়নী মনোভাবের বিরুদ্ধে বলবার কিছু নেই, কিন্তু যে লোক সুরাপান, জুয়াখেলা অথবা অন্য কোনও অলাভজনক উত্তেজক কাজের মধ্যে বিস্মৃতিকে খুঁজে বেড়ায়, তার কথা আলাদা। এটা সত্যি এই দুই সীমারেখার মধ্যবর্তী অবস্থানের উদাহরণও আছে। ক্লান্তিকর জীবন থেকে রেহাই পেতে যে লোক বেপরোয়াভাবে গাড়ি বা বিমান চালায় অথবা পর্বতশীর্ষে ওঠে, তার বিষয়ে কী বলা উচিত? তার এই জীবন নিয়ে ঝুঁকি যদি জনগণের উপকার করত, তা হলে তাকে প্রশংসা করা যেত। কিন্তু তা যদি না হয় তা হলে আমরা তাকে মাতাল অথবা জুয়াড়ি থেকে সামান্য ওপরে ছাড়া আর কী ভাবতে পারি?
অকৃত্রিম উদ্দীপনা, বিস্মৃতি সন্ধানের উদ্দীপনার যে ধরণ তার চেয়ে আলাদা, তা মানবিক সত্ত্বার এক স্বাভাবিক অংশ, যদি তা দুর্ভাগ্যবশত নষ্ট হয়ে না যায়। ছোট শিশুরা যা দেখে, যা শোনে তাতেই আকৃষ্ট হয়। তাদের কাছে পৃথিবী বিস্ময়ে ভরা। তারা সব সময় নতুন নতুন বিষয়ে খুব উৎসাহের সাথে জানবার কাজে ব্যস্ত থাকে, যদিও সে জানা পণ্ডিতদের জানা নয়। তারা শুধু যেসব জিনিস তাদের উৎসাহ সৃষ্টি করে শুধু তার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে চায়। পশুরা, যখন তারা বয়স্ক হয়, যদি সুস্থ থাকে উদ্দীপনা ধরে রাখে। কোনও বিড়াল অপরিচিত ঘরে থাকলেও চুপ করে থাকবে না। সে চারিদিকে শুঁকে শুঁকে দেখবে যদি হঠাৎ করে কোনও উঁদুরের সন্ধান পাওয়া যায়। কোনও মানুষ যদি তার জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ না হন, তাহলে তিনি বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে স্বাভাবিক উৎসাহ বজায় রাখতে পারেন এবং যতকাল তা বজায় রাখবেন ততকাল জীবন তার কাছে আনন্দময় হয়ে থাকবে যদি না অন্যায়ভাবে তার স্বাধীনতা খর্ব করা হয় যা আমাদের জীবনপথে চলতে প্রয়োজনীয়। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই সভ্য সমাজের উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যায়। আদিম মানুষ যখন ক্ষুধার্ত হয় তখন সে শিকার করে এবং এই কাজে সে প্রত্যক্ষ প্রেরণাকেই মান্য করে। যে লোক প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে কাজে যায়, সেও মৌলভাবে একই প্রেরণা থেকে তা করে যেমন তার স্থায়ী জীবিকার তাগিদ থেকে। কিন্তু তার বেলায় প্রেরণা প্রত্যক্ষভাবে কাজ থেকে আসেনা এবং যখন তা অনুভূত হয় তখনো নয়। এই প্রেরণা কাজ করে গৌণভাবে বিমূর্ততা, বিশ্বাস এবং ইচ্ছার মাধ্যমে। যে সময় লোকটি কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে সে ক্ষুধার্ত থাকে না, কারণ সে কিছুক্ষণ আগে মাত্র তার প্রাতঃরাশ খেয়ে নিয়েছে। সে জানে আবার তার ক্ষুধা পাবে এবং কাজে যাওয়ার অর্থ ভবিষ্যৎ ক্ষুধা-নিবৃত্তির একটি উপায়মাত্র। প্রেরণা অনিয়মিত, কিন্তু সভ্য সমাজে অভ্যাসকে নিয়মিত হতেই হয়। আদিম মানুষদের মধ্যে দলবদ্ধ কাজও যতটুকুই রয়েছে, তা স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রেরণাসঞ্চারী। যখন তারা দলবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করতে যায়, তখন ঢোলের বাজনা তাদের মনে যুদ্ধের উদ্দীপনা জাগায় এবং তারা যখন উত্তেজিত হয়ে ওঠে তখন দলের প্রত্যেকটি মানুষ যুদ্ধের কাজে অনুপ্রাণিত হয়। বর্তমানের কোনও উদ্যোগ এইভাবে পরিচালিত করা যায় না। যখন রেলগাড়িকে কোনও নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা করতে হবে, তখন মোটরবাহকদের অথবা ইঞ্চিনচালকদের অথবা সিগন্যালম্যানদের আদিম সমাজের সঙ্গীত শুনিয়ে অনুপ্রাণিত করা অসম্ভব, এ কাজ তাদের করতে হবেই বলে তারা সকলে নিজের নিজের কাজ করবে। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য গৌণ। এই কাজে তাদের প্রেরণা স্বতঃস্ফূর্ত নয়। কিন্তু এই কাজের জন্যে তারা যে মূল্য পাবে তার জন্যেই শুধু প্রেরণা আছে। সামাজিক জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ভুল দেখা যায়। লোকেরা পরস্পর যে আলাপ করে তার মধ্যে তাদের কোনও ইচ্ছার প্রতিফলন থাকে না। তারা তা করে সেই আশায়, পরে এই আলাপ থেকে তাদের কোনও উপকার হলেও হতে পারে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রেরণার সীমাবদ্ধতা সভ্য মানুষকে জড়িয়ে রেখেছে। মনে খুব আনন্দ হলে সে প্রকাশ্য পথে নাচতে অথবা গান করতে পারে না, আবার দুঃখ পেলেও পথের পাশে বসে কাঁদতে পারে না। কেননা তাতে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। প্রথম বয়সে স্কুলে তাদের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবরে যতক্ষণ কাজ,ততক্ষণের জন্যে তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত। এইসব কারণে উদ্দীপনাকে বাঁচিয়ে রাখা বেশ কঠিন, কারণ এর অবিরাম নিয়ন্ত্রণ থেকেই জন্ম নেয় ক্লান্তি এবং একঘেয়েমির বিরক্তি। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও স্বতঃস্ফুর্ত প্রেরণা সুবিবেচনার সাথে নিয়ন্ত্রণ না করলে সভ্য সমাজ অস্তিত্ব সংকটে পৌঁছে যায়। কারণ এই প্রেরণা সরলতম সামাজিক সহযোগিতামূলক কাজের জন্ম দিতে পারলেও কিন্তু সেসব অতি জটিল কাজ করতে পারে না, যা আধুনিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দাবী করে। উদ্দীপনাকে এতসব বাধার ওপরে তুলতে হলে একজন লোকের প্রয়োজন সুন্দর স্বাস্থ্য এবং অফুরন্ত প্রাণশক্তি অথবা তার ভাগ্য যদি প্রসন্ন থাকে তাহলে সে এমন কাজ পাবে যা তার নিজের পক্ষেই আগ্ৰহজনক। স্বাস্থ্য, যা পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে বিগত শতবর্ষে সব সভ্য দেশেই জনস্বাস্থ্য ক্রমশ উন্নত হচ্ছে, কিন্তু শক্তিকে মাপা কঠিন কাজ। স্বাস্থ্য উন্নত হলেও দৈহিক শক্তি পূর্বে যা ছিল তেমনটাই রয়েছে, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। সমস্যা এখানে অতিমাত্রায় সামাজিক, তাই স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়ে এই গ্রন্থে আমি কোনোও আলোচনায় যাব না। কিন্তু এই সমস্যার একটা ব্যক্তিগত এবং মনস্তত্ত্বমূলক দিক রয়েছে, যে বিষয়ে আমি পূর্বে অবসাদ নিয়ে আলোচনার সময় করেছি। সভ্য সমাজের শত বাধার মুখেও কোনও কোনও ব্যক্তি উদ্দীপনা বজায় রাখতে সক্ষম হয়, আরো অনেকে তা করতে পারত যদি তারা অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত থাকতে পারত যেখানে তাদের শক্তির অনেক অংশ ব্যয় হয়ে যায়। কাজের জন্যে যতটুকু শক্তি দরকার, উদ্দীপনা তার চেয়ে অতিরিক্ত দাবি করে এবং ফলে মননযন্ত্রটি যাতে বাধাহীনভাবে চলে সেই দাবি উঠে আসে। যেসব কারণে এই চলা মসৃণতর হয় সে বিষয়ে আমি পরের অধ্যায়গুলিতে আরও কিছু বলব।
