সম্মানবোধ সম্বন্ধে ভুল ধারণার জন্যে নারীদের মধ্যে উদ্দীপনা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। নারীরা পুরুষদের বিষয়ে আগ্রহী হবে, অথবা জনসমক্ষে প্রফুল্লতা প্রকাশ করবে এটা অবাঞ্ছিত ছিল। পুরুষদের বিষয়ে তারা আগ্রহী হবে না এই শিক্ষা থেকে তারা সব বিষয়েই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে শুধুমাত্র এক বিশেষ ধরনের বিশুদ্ধ আচরণ ছাড়া। নিষ্ক্রিয়তার মনোভাব তৈরীর শিক্ষা এবং জীবন থেকে পালানোর মনোভাব উদ্দীপনার প্রবল বিরোধী এবং নারীদের আত্মমগ্ন হতে উৎসাহিত করা, যা মহা সম্মানিত নারীদের বৈশিষ্ট্য বিশেষ করে যদি তারা শিক্ষাহীন হয়। সাধারণ পুরুষদের খেলাধুলায় যে উৎসাহ থাকে তা তাদের থাকে না। তারা রাজনীতি নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। পুরুষদের প্রতি তাদের মনোভাব প্রথাগত নিস্পৃহতা, অন্য নারীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন বৈরীভাবাপন্ন এবং তার কারণ অন্যেরা তাদের চেয়ে কম সম্মানিতা, এই বোধ থেকে। তাদের অহংকার তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে থাকে অর্থাৎ তাদের সহনারীদের প্রতি আগ্রহহীনতাকে তারা গুণ বলে মনে করে, অবশ্য এর জন্যে তাদের দোষ দেওয়া যায় না। নারীদের সম্পর্কে হাজার হাজার বছর ধরে যে নৈতিকতার শিক্ষা প্রচলিত, তাই শুধু তারা মেনে চলে। তারা একটি অবদমন নীতির কাছে নিজেদের উৎসর্গ করেছে যার ভিতরের অন্যায়টি তারা বুঝতে পারেনি বলেই করুণার পাত্রী হতে হয়েছে। এইসব নারীদের কাছে যা অনুদার তাই ভাল মনে হয় এবং যা উদার তা মনে হয় খারাপ। তারা নিজেদের সামাজিক চক্রের মধ্যে আনন্দকে হত্যা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়। তারা রাজনীতিতে নির্যাতনমূলক আইনকে ভালবাসে। সৌভাগ্যবশত এই ধরনের নারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যদিও যারা চিন্তার জগতে মুক্তিলাভ করেছে। তারা সেইসব নারীর সংখ্যা যতটা কমেছে বলে ভাবছেন, তার চেয়ে এখনও সেই সংখ্যা অনেক বেশি। কেউ যদি
আমার কথায় সন্দেহ প্রকাশ করেন, তবে বলি, তিনি যেন একবার বাসাবাড়িগুলিতে একটা থাকার জায়গা খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন এবং যেসব গৃহকত্রীর সাথে তার দেখা হবে তাদের আচরণ লক্ষ্য করেন, তা হলে তিনি দেখতে পাবেন তারা এমন একটা নারীসুলভ উৎকর্ষতার ধারণা নিয়ে বাস করছে, যা জীবনের সকল উদ্দীপনাকে ধ্বংস করার একটি প্রয়োজনীয় অংশ। তার ফলেই তাদের মন এবং হৃদয় সংকীর্ণ এবং বৃদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যায়। নারী এবং পুরুষের উৎকর্ষের মধ্যে যথার্থভাবে ধারণা করলে কোনও পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, অন্ততপক্ষে প্রচলিত ধারণায় যে পার্থক্য তা নেই। নারীর পক্ষে যেমন পুরুষের পক্ষেও তেমন, উদ্দীপনাই হচ্ছে সুখ এবং মঙ্গলের জন্যে গোপন মন্ত্র।
———-
১. শার্লক হোমস, Sherlock Homes। আর্থার কোনান ডয়েল, Sir Arthur Conan Doyle (১৮৫৯-১৯৩০) রহস্য উপন্যাসের জন্যে বিশ্ববিখ্যাত, পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। লন্ডনের ২২১, বেকার স্ট্রীট ছিল গোয়েন্দা শারলক হেমসের ঠিকানা (১৮৮১-১৯০৪)।
২. রোমানি রাই, Romany Rye, ঔপন্যাসিক জর্জ বরো, George Borrow (১৮০৫ ১৮৮১) এর বিখ্যাত উপন্যাস, রচিত হয় ১৮৫৭-তে। এই উপন্যাস লেখকের আত্মজৈবনিক বলে মনে করা হয়। শুধু উপন্যাস নয় জর্জ বরো ইংরেজি সাহিত্যে ভ্রমণ কাহিনী রচনার জন্যেও বিখ্যাত। সেসব কাহিনীতে চিত্রিত হয়ে আছে পথ চলার বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং যাযাবর জীবনের ভিন্ন সুর।
৩. হবস,Thomas Hobbes (১৫৮৮-১৬৭৯)। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক এবং রাষ্ট্রনীতিবিদ। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন সংক্রান্ত কাজের জন্যে এখনো তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
৪. সম্রাজ্ঞী জোসেফিন, Empress Josephine (১৭৬০-১৮১৪), অভিজাত বংশে জন্ম, অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন। ১৮০৪-এ সম্রাজ্ঞী হন ফ্রান্সের। ফরাসী বিপ্লবের সময় সম্রাটসহ কারারুদ্ধ হন। স্বামীর গিললাটিনে মৃত্যু হলেও, তিনি মুক্তি পান। দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বিশ্ববিখ্যাত নেপোলিয়নকে। যিনি পরে ফ্রান্সের সম্রাট হন। নেপোলিয়ন তাঁকে যে ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন সেটি ‘Empress Josephine Clock’ নামে বিখ্যাত।
৫. টলস্টয়, Leo Tolstoy (১৮২৮-১৯১০)। রাশিয়ার বিশ্বনন্দিত সাহিত্যিক। তাঁর ‘ওয়ার অ্যান্ড পীস’, ‘আনা করোনিনা’ এবং ‘রেজারেকসন’ বিশ্ব সাহিত্যে অমর সৃষ্টি। এক বিশাল পটভূমিকায় বিরচিত “ওয়ার অ্যান্ড পীস”-কে বলা হয় গদ্যে মহাকাব্য।
১২. স্নেহ-ভালবাসা
উদ্দীপনাহীনতার একটি প্রধান কারণ হল, আমাকে কেউ ভালবাসে না এই অনুভূতি। পক্ষান্তরে বিপরীতভাবে, সকলেই আমাকে ভালবাসে এই অনুভূতি উদ্দীপনা বাড়াতে যত সাহায্য করে, অন্য কোনও কিছু তা করে না। কেউ তাকে ভালবাসে না, এই অনুভূতির বিভিন্ন রকমের কারণ থাকতে পারে। তিনি নিজেকে এমন ভয়ংকর একটি মানুষ ভাবতে পারেন, যার জন্যে কারো পক্ষে তাকে ভালবাসা সম্ভব নয়। শৈশবে তিনি হয়তো অন্যান্য শিশুদের তুলনায় কম স্নেহ পেয়েছেন অথবা তিনি এমন লোক যাকে সত্যিই কেউ ভালবাসেন না। এইসব ক্ষেত্রে কিন্তু প্রথম জীবনের দুর্ভাগ্যের জন্যে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলাও এর কারণ হতে পারে। ভালবাসা না পাওয়ার অনুভূতি থেকে নানারকম মনোভাবের উদ্ভব হতে পারে। এরকম লোক হয়তো মরিয়া হয়ে ভালবাসা পাওয়ার জন্যে নানা অসাধারণ দয়াশীলতার কাজ করতে পারেন। কিন্তু এমন হলে তার কাজে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ যারা তার দয়াশীলতায় উপকৃত হবেন তারা সহজেই তার উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারবেন। মানুষের প্রকৃতি এমনভাবে গঠিত যে, যারা ভালবাসা দাবি করেন না বলে মনে হয়, তাদেরই তা সহজে দেয়। তাই যে মানুষ কল্যাণকর কাজ করে ভালবাসা কিনতে চান, তিনি মানুষের অকৃতজ্ঞতার অভিজ্ঞতা থেকে মোহমুক্ত হন, তার কখনো মনে হয় না যে ভালবাসা তিনি কিনতে চান তার মূল্য, তার জন্যে যে বস্তুগত সুবিধা তিনি দান করছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। তবুও তার অনুভূতি তা মেনে নিতে পারে না। অন্য একজন মানুষ, অন্যেরা তাকে ভালবাসে না, এটা জেনে যুদ্ধ বাধিয়ে অথবা বিদ্রোহ সৃষ্টি করে অথবা ডীন সুইফটের(১) মতো বিষে কলম ডুবিয়ে পৃথিবীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারে। দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে এই হল বীরের প্রতিক্রিয়া, এতে পৃথিবীর সকলের বিরুদ্ধে একা দাঁড়াবার মতো চরিত্রবল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এই উচ্চতায় উঠতে কজন সক্ষম হন? নারী বা পুরুষের অধিকাংশই যদি নিজেদের ভালবাসার ক্ষেত্রে বঞ্চিত মনে করেন, তাহলে তারা এক ভীরু নৈরাশ্যের মধ্যে ডুবে যান, যেখানে শুধুই অন্ধকার আর সেখানে মাঝে মাঝে ঈর্ষা আর বিদ্বেষের ঝলক ছাড়া আর কিছু জ্বলে ওঠে না। নিয়মানুযায়ী এই ধরণের লোকের জীবন অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং ভালবাসার অভাব থেকে তাদের মনে নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নেয় আর তাকে মুক্তি পেতে তারা অভ্যাসের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পন করেন। যারা বৈচিত্র্যহীন কর্মধারার দাসত্ব স্বীকার করেন তাদের এই কাজের প্রেরণা আসে বাইরের শীতল পৃথিবীর ভয় থেকে এবং তারা মনে করে, পূর্বের চলা পথেই যদি তারা আবার চলে তা হলে তারা আর আঘাত পাবেন না।
