উদ্দীপনা কখনো সাধারণ, কখনো বৈশিষ্ট্য সুচক। এটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণও হতে পারে। বরো লিখিত ‘রোমানি রাই’(২) উপন্যাসের একটি চরিত্রের কথা পাঠকদের মনে থাকতে পারে। তিনি স্ত্রীকে হারানোর পর, যার প্রতি ছিল তার অবিচল নিষ্ঠা, সাময়িকভাবে তার মনে হয়েছিল জীবন যেন শূন্য হয়ে গেছে। কিন্তু ক্রমে আগ্রহী হয়ে উঠলেন চায়ের পাত্রে এবং চায়ের বাক্সে লেখা চীনা লিপিতে এবং একটি ফরাসী-চীন ব্যাকরণের সাহায্যে এবং সেই উদ্দেশ্যে ফরাসী ভাষা শিখে ধীরে ধীরে তার পাঠোদ্ধার করতে সমর্থ হলেন। এর ফলে জীবনের প্রতি তার একটা নতুন উৎসাহ জন্মাল, যদিও তিনি এই চীনা ভাষার জ্ঞান অন্য কোনও কাজে ব্যবহার করেন নি। আমি এমন লোকদের জানি যারা খ্রিস্টান অতীন্দ্রিয়বাদীদের প্রচলিত মতো সম্পর্কে যা কিছু জানবার তা নিয়ে নিবিষ্ট থাকতে এবং অন্যদের দেখেছি হবস(৩)-এর গ্রন্থাবলীর প্রথম দিককার সংস্করণ এবং পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ এবং সেগুলি মিলিয়ে দেখা নিয়ে নিবিষ্ট থাকতো কোথায়, কীসে কোন্ মানুষের আকর্ষণ তা আগে বলা অসম্ভব। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কোনও কোনও বিষয়ে অতি আগ্রহী হতে পারে এবং একবার যদি তেমন কোনও আগ্রহ জাগে তা হলে তাদের জীবন একঘেয়েমির কবল থেকে মুক্তি পেতে পারে। বিশেষ কোনও বিষয়ের ওপর আগ্রহ, জীবনের সাধারণ উদ্দীপনার চেয়ে কম তৃপ্তিদায়ক সুখের উৎস, কারণ তা মানুষের সময়ের সবটুকু পূর্ণ করতে পারে না। তাছাড়া যে বিশেষ বিষয়ে তার উৎসাহ, সে বিষয়ে সব জানতে পারার বিপদও আছে।
নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে ভোজের ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন ধরনের যেসব মানুষের কথা উল্লেখ করেছিলাম তার মধ্যে পেটুকও ছিল, কিন্তু আমরা তার প্রশংসা করতে পারিনি। পাঠক ভাবতে পারেন যে সব উদ্দীপ্ত লোককে প্রশংসা করা হয়েছে তাদের সাথে পেটুকের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট নয়। কিন্তু আরো নির্দিষ্টভাবে দু’ধরনের মানুষের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরার সময় এখন এসেছে।
প্রত্যেকেই জানেন প্রাচীনরা সংযমকে চরিত্রের একটা আবশ্যকীয় গুণ বলে মনে করতেন। রোমান্টিকতা এবং ফরাসী বিপ্লবের প্রভাবে অনেকে এই ধারণা পরিত্যাগ করেন এবং প্রবল প্রবৃত্তি উৎসারিত সব আবেগকে প্রশংসা করেন, এমন কী যদি তারা বায়রনের নায়কদের মতো ধ্বংসাত্মক এবং সমাজবিরোধী হন তবুও। প্রাচীনদের মতো স্পষ্টভাবে উদ্ধৃষ্টও সৎ জীবনে বিভিন্ন কাজের মধ্যে একটা সমন্বয় থাকা খুব প্রয়োজন এবং এসবের মধ্যে কোনও একটাকে এত দূরে টেনে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যাতে অন্যসব কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পেটুক লোক ভোজনের কাছে আর সব আনন্দকে বিসর্জন দিয়েছে আর তার ফলে জীবনের সমগ্র আনন্দকে কমিয়ে দিয়েছে। ভোজনের মতো অন্যান্য প্রবৃত্তিও চরমের দিকে টেনে নিয়ে যায়। পোশাকের ব্যাপারে সম্রাজ্ঞী জোসেফিন ছিলেন পেটুকদের মত, প্রথমদিকে নেপোলিয়ন জোসেফিনের পোশাক তৈরীর বিল নিজে মিটিয়ে দিতেন, যদিও ক্রমাগত প্রতিবাদের মাত্রা বাড়িয়ে চলতেন। অবশেষে তিনি জোসেফিনকে বললেন, তাঁর সংযম-শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত এবং ভবিষ্যতে বিলের অংক যুক্তিসংগত মনে হলে তবেই তিনি তা পরিশোধ করবেন। যখন তার পরবর্তী পোশাক তৈরীর বিল আসে, তখন কিছু সময়ের জন্যে তিনি বোধের শেষপ্রান্তে চলে যান, কিন্তু পরক্ষণেই মনে মনে একটা পরিকল্পনা তৈরী করে নেন। তিনি যুদ্ধমন্ত্রীর কাছে গিয়ে দাবি জানালেন যুদ্ধের তহবিল থেকে তার পোশাকের বিল পরিশোধ করতে হবে। মন্ত্রী জানতেন তাকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা তার রয়েছে, সুতরাং তিনি তাই করলেন। এরই ফলে জেনোয়া ফরাসীদের হাতছাড়া হয়ে যায়। কোনও কোনও বইতে আমি এরকম পড়েছি তবে এই কাহিনী কতটুকু সত্যি তা আমি বলতে পারব না। সত্যি হোক বা অতিরঞ্জিত
হোক, আমাদের উদ্দেশ্যসাধনের পক্ষে দুই-ই সমান উপযোগী, কারণ এই কাহিনী আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে কোনও নারীর পোশাকের প্রতি আসক্তি তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে যদি তার সুযোগ থাকে তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার। পানাসক্ত পুরুষ এবং কামাসক্ত নারীকে একই জিনিসের উদাহরণরূপে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এইসব ব্যাপারে মুল নীতি খুবই স্পষ্ট। আমাদের আলাদা সব রুচি এবং বাসনা জীবনের সাধারণ কাঠামোর মধ্যে মানিয়ে নেয়। এরা যদি সুখের উৎস হতে চায়, তবে তাদের, আমাদের স্বাস্থ্যের সাথে, আমাদের প্রিয়জনদের স্নেহের সাথে এবং যে সমাজে আমরা বাস করি তার শ্রদ্ধার সাথে সুসঙ্গত হতেই হবে। কোনও কোনও প্রবৃত্তিকে এইসব সীমা অতিক্রম না করিয়েও অনেক দূর পর্যন্ত টেনে নেওয়া চলে, অন্যদের নয়। কোনও ব্যক্তি, ধরা যাক দাবা খেলা পছন্দ করেন, তিনি যদি অবিবাহিত হন এবং পরনির্ভরশীল না হন, তা হলে তার প্রবৃত্তিকে কোনও বিশেষ সীমায় বেঁধে রাখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি তার স্ত্রী এবং সন্তান থাকে এবং স্বাধীন আয়ের উৎস না থাকে তাহলে এই প্রবৃত্তিকে তাকেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকলেও পানাসক্ত এবং পেটুককে নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে বিবেচনা করলে বুদ্ধিহীন বলা যেতে পারে, কারণ তাদের অসংযম স্বাস্থ্যের ক্ষতিকারী এবং তারা কয়েক মিনিটের আনন্দের বিনিময়ে কয়েক ঘণ্টার দুঃখ ভোগ করে। কতকগুলি নির্দিষ্ট জিনিস দিয়ে যে কাঠামোটা তৈরী, বেদনার কারণ হতে দিতে না চাইলে যে কোনও বিশেষ প্রবৃত্তিকে সেই কাঠামোর মধ্যেই থাকতে হবে। সেই জিনিসগুলি হচ্ছে স্বাস্থ্য, মানসিক ও দৈহিক কর্মক্ষমতার সাধারণ অধিকার, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য উপযুক্ত উপার্জন এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সামাজিক কর্তব্য যেমন স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতিপালন। দাবা খেলার জন্যে যে ব্যক্তি এইসব পরিত্যাগ করেন তিনি নিশ্চিতভাবেই পানাসক্তের মতো নিন্দনীয়। আমাদের এমন লোকের অপরাধ চোখে পড়ে না তার কারণ এমন লোক সংখ্যায় খুব কম এবং অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী না হলে দাবা খেলার মতো বুদ্ধিমত্তার খেলায় সহজে কেউ ডুবে থাকবেন না। সংযমের জন্যে গ্রীকদের যে অনুমোদিত বিধি রয়েছে এই ধরনের আচরণ তার মধ্যেই পড়ে। দাবাকে যথেষ্ট ভালবেসে যে তোক দিনে কাজ করতে করতে সন্ধ্যায় দাবা খেলার জন্যে অধীর আগ্রহ অপেক্ষা করে থাকেন তিনি। ভাগ্যবান। কিন্তু যে লোক সারাদিন দাবা খেলার জন্যে কাজ বন্ধ রাখেন তিনি সংযমের মতো গুণ হারিয়ে ফেলেন। টলস্টয় সম্পর্কে জানা যায়, তিনি যখন তরুণ ছিলেন, তাঁর খ্যাতির পূর্বের যুগে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের জন্যে তাঁকে সামরিক ক্রস পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুরস্কার গ্রহণের দিন তিনি দাবা খেলায় এমনই ডুবে ছিলেন যে খেলা ছেড়ে পুরস্কার গ্রহণ করা হয়নি। সে বিষয়ে টলস্টয়কে তেমন দোষ দেওয়া যায় না। কেননা সামরিক পদক লাভ করলেন কী করলেন না তাঁর মতো ব্যক্তির পক্ষে উদাসীন থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অন্য কোনও লোকের পক্ষে এ কাজ করা অবশ্যই নির্বুদ্ধিতা হত।
