সসেজ তৈরীর দুটি যন্ত্রের গল্প বলি। একদা কুশল হাতের তৈরী দুটি উৎকৃষ্ট যন্ত্র ছিল, যাদের কাজ ছিল শূকর মাংস থেকে সুস্বাদু সসেজ তৈরী করা। এদের একটি যন্ত্র সসেজ তৈরীতে খুবই উৎসাহী ছিল এবং প্রচুর পরিমাণে তৈরী করত। অন্য যন্ত্রটি বলল, “শুকর মাংসে আমার কী হবে, আমার নিজের কাজ ওর চেয়ে অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক এবং বিস্ময়কর।” সে এরপর শূকর মাংস নিতে অস্বীকার করে নিজের ভিতরকার সব কিছু পরীক্ষা করতে আরম্ভ করল, এইভাবে স্বাভাবিক খাদ্য বিহীনতায় তার ভিতরের সব কলকজা অকেজো হয়ে পড়ল এবং যতই সে তা নিয়ে সমীক্ষা করতে লাগল ততই তা তার কাছে শূন্য এবং তুচ্ছ মনে হতে লাগল। এই উৎকৃষ্ট যন্ত্রটার শুকর-মাংসের লোভনীয় রূপান্তর ঘটাবার যে দারুণ ক্ষমতা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেল, সে জানতেই পারল না তার ক্ষতির পরিমাণ। যে ব্যক্তি তার জীবনের উদ্দীপনা হারিয়েছেন তার সাথে তুলনা করে চলে এই দ্বিতীয় সসেজ-যন্ত্রটির আর যিনি তা ধরে রেখেছেন তার সাথে তুলনা চলে প্রথম যন্ত্রটির। মানুষের মন এক অদ্ভুত যন্ত্র। যেসব পদার্থ তাকে দেওয়া হয়, অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে সে তাদের সংযুক্ত করে দেয়, কিন্তু বাইরের পৃথিবী থেকে উপকরণ না পেলে সে শক্তিহীন হয়ে যায়। তবে মনকে তার প্রয়োজনীয় উপকরণ নিজেকেই সগ্রহ করে নিতে হয়, সসেজ-যন্ত্রকে যা করতে হয় না। ঘটনার প্রতি আমাদের যে আগ্রহ, তার মাধ্যমেই তারা অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়। যদি তারা আমাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে না পারে তাহলে তারা আমাদের কাজে লাগে না। যে মানুষের মনোযোগ অন্তর্মুখী তিনি দৃষ্টিকে আকর্ষণ করার মতো কিছু দেখতে পান না, পক্ষান্তরে যার মনোযোগ বহির্মুখী, নিজের ভিতর তিনি খুঁজে পান, সেইসব দুর্লভ মুহূর্তে বিচিত্র রকমের সব উপকরণ খণ্ডিত হয়ে আবার মিশে গিয়ে, দর্শনীয় এবং শিক্ষণীয় কত নতুন নতুন রূপে ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপনার রকম অসংখ্য। শারলক হোমসের(১) কথা মনে করুন। তিনি পথ থেকে একটা টুপি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, তিনি এই টুপির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, এই টুপির মালিক মদ্য পানের ফলে অধঃপতন ডেকে এনেছে এবং তার পত্নী আর আগের মতো তাকে ভালবাসে না। এইভাবে হঠাৎ পাওয়া কোনও বস্তু যার মনে এত গভীর উৎসাহ সৃষ্টি করতে পারে তার কাছে জীবন কখনো বিরক্তিকর হতে পারে না। গ্রামাঞ্চলে ভ্রমণ করার সময় কত রকমের জিনিস লক্ষ্য করা যেতে পারে একবার চিন্তা করে দেখুন। কেউ হয়তো পাখিদের বিষয়ে উৎসাহী, কেউ গাছপালায়, কেউ ভূতত্ত্বে, কেউ কৃষিতে, কেউবা অন্য কিছুতে। এর মধ্যে যে বিষয়ে আপনার আগ্রহ তাই আপনাকে আনন্দ দেবে, অন্য সব কিছু যদি সমান হয় এবং এর একটিতে যদি আগ্রহী হয়ে থাকেন তিনি, তাহলে সবদিকে আগ্রহহীন ব্যক্তির চেয়ে তিনি এই বিশ্বের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পক্ষে উপযুক্ত।
বিভিন্ন মানুষের সহচরদের প্রতি আচরণ কত বিচিত্র রকমভাবে আলাদা, দীর্ঘ রেলভ্রমণে একজন যাত্রী তার সহযাত্রীদের একজনকেও লক্ষ্য করলেন না। অথচ অন্য একজন তাদের সবার সম্পর্কে একটা ধারণা গঠন করে নিলেন, তাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলেন, তাদের কার কেমন অবস্থা তা নিয়েও অনুমান তৈরী করে। নিলেন, এমন কী তাদের অনেকের গোপন কথাও, মনে হয় তিনি জেনে নিলেন। অন্যদের সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যক্তির আচরণের মধ্যে যতটুকু পার্থক্য, অন্যদের ব্যাপারে ধারণা-গঠনেও ততটুকু পার্থক্য। কারো কারো কাছে আবার প্রত্যেক মানুষই বিরক্তিকর, অন্যেরা কারো সাথে পরিচিত হলে খুব সহজেই এবং স্বল্প সময়ে তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করে নেন, যদি তাকে অন্যরকম ভাবার নিশ্চিত কোনও কারণ না থাকে। আবার একই বিষয় ভ্রমণের কথা ধরা যাক। কিছু মানুষ আছেন যারা দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণ করেন, সবসময় সেরা হোটেলে ওঠেন, বাড়িতে যেমন খাবার খান ঠিক তেমন খান। দেশে যেমন অলস ধনীদের সাথে আড্ডা দিতেন, সেখানেও তাই করেন। বাড়িতে নিজেদের ডিনার-টেবিলে যে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন সেখানেও সেই একই বিষয়ে চর্বিত-চর্বন করেন। যখন তারা ফিরে আসেন অনেক ব্যয়বহুল ভ্রমণের একঘেয়েমি যে শেষ হল, সেটাই হয় তাদের কাছে একমাত্র আরামের অনুভূতি। অন্য এক ধরনের লোক তারা যেখানেই যান, সেখানকার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন; স্থানীয় লোকদের সাথে ভাব জমান, স্থানীয়ভাবে সামাজিক বা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ দেখে নেন, সেখানকার বিশেষ খাওয়া খান, সেখানকার রীতিনীতি এবং স্থানীয় ভাষা শিখে নেন এবং যখন বাড়ি ফিরে আসেন তখন বয়ে আনেন সুখকর নতুন কিছু ভাবনা যা উপভোগ করবেন দীর্ঘ শীতের সন্ধ্যায়।
এইসব আলাদা আলাদা পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তির জীবনে ভোগের উদ্দীপনা আছে, তার সুবিধা যার নেই তার চেয়ে বেশি। এমনকি অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাও তার কাজে লাগে। আমি খুব খুশী যে চীনের জনতা এবং সিসিলির একটি গ্রামের ঘ্রাণ আমি পেয়েছি, যদিও আমি বলছি না যে সে সময় আমার তা অত ভাল লেগেছিল। দুঃসাহসী লোক জাহাজডুবি, বিদ্রোহ, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এবং সবরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা উপভোগ করে যতক্ষণ তা স্বাস্থ্য হানির সীমা ছাড়িয়ে না যায়। ভূমিকম্প হলে তারা নিজেকে হয়তো বলে : ‘এই হল ভূমিকম্প! তারা খুশি হয় এই নতুন একটি বিষয়ে পৃথিবী সম্বন্ধে জ্ঞান সমৃদ্ধ হল বলে। এইরকম লোক যে ভাগ্যের হাতে বিড়ম্বিত হন না, একথা বললে সত্য বলা হবে না, কারণ তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাদের উদ্দীপনাও কমে যেত, যদিও নিশ্চিতভাবে সে কথা বলা যায় না। এমন এমন লোকদের জানি যাদের বছরের পর বছর ধীরে ধীরে যন্ত্রণা দেওয়ার ফলে তাদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা উদ্দীপনা হারান নি। কোনও কোনও রোগ উদ্দীপনা নষ্ট করে দেয়, অন্যগুলি করে না। আমি জানি না জৈব রসায়নবিদরা এই দুয়ের মধ্যে যে পার্থক্য তার সন্ধান পেয়েছেন কিনা, সম্ভবত জৈব রসায়নবিদ্যা আরো উন্নত হলে এমন ট্যাবলেট আবিষ্কৃত হবে যা খেলে প্রত্যেকটি জিনিসে নিশ্চিতরূপে আমাদের আগ্রহ জন্মাবে। কিন্তু সেদিন না আসা পর্যন্ত কিছু লোক সব বিষয়ে আগ্রহী হন কেন এবং কিছু লোক কোনও বিষয়েই আগ্রহী নন কেন, সে ব্যাপারে আমাদের সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রাপ্ত অনুমানের ওপরেই নির্ভর করে থাকতে হবে।
