খেয়াল এবং শখ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবত অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৌল আনন্দের উৎস নয়, কিন্তু শুধু বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর একটা উপায়। কোনও কোনও কঠিন বেদনার মুখোমুখি হওয়াকে মুহূর্তের জন্যে ভুলে থাকা, মৌল আনন্দ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল যার ওপর, যাকে বলা হয় মানুষ এবং বস্তুর ওপর। সৌহার্দ্যপূর্ণ কৌতূহল।
মানুষের বিষয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ কৌতূহল স্নেহময় আবেগের একটি ধরণ। কিন্তু এই রূপে নয়, যার মধ্যে কর্তৃত্ব বা অধিকারের ভাব থাকে অথবা কাছ থেকে জোর সাড়া পাওয়ার প্রত্যাশা। শেষোক্ত ধরণটি প্রায় ক্ষেত্রে দুঃখের কারণ হয়। যে ধরণটি সুখের কারণ ঘটায় তা হচ্ছে মানুষকে গভীরভাবে লক্ষ্য করা, তা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যে আনন্দ পাওয়া, যারা সংস্পর্শে আসবে তাদের কৌতূহল বা আনন্দ প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা, তাদের ওপর প্রভাব খাটাতে না চাওয়া অথবা তাদের কাছ থেকে উৎসাহজনক প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করা। যে ব্যক্তি অন্যদের সম্পর্কে আন্তরিকভাবে এইরকম ভাবেন তিনি যেমন অন্যদের কাছে আনন্দের উৎস, বিপরীতভাবে তারাও তার কাছে মমতার গ্রাহক। তার সাথে অন্যদের সম্পর্ক হালকা অথবা গভীর হোক তার কৌতূহল এবং মমতা দুয়েরই জন্যে তৃপ্তিকর, অকৃতজ্ঞতায় বিষময় নয়। কারণ অকৃতজ্ঞতা তিনি পাবেন না এবং পেলে তা খুব কম লক্ষ্য করবেন যে মেজাজ-বৈশিষ্ট্য অন্য লোকের স্নায়ুর ওপর চাপ দিয়ে তাকে প্রায় ক্রুদ্ধ করে তোলে, সেই একই মেজাজ-বৈশিষ্ট্যতার কাছে মৃদু আমোদের উৎস হয়ে উঠবে। অন্য লোক কঠিন পরিশ্রম করেও যা পান না, তা তিনি বিনা শ্রমে পেয়ে যাবেন। নিজেকে নিয়েই নিজে সুখী থাকাতে তিনি একজন মনোরম সঙ্গী হবেন এবং এতে তাঁর সুখ আরো বেড়ে যাবে। কিন্তু এর সবই যেন নির্ভেজাল হয়,এসব যেন কর্তব্যবোধের তাগিদ থেকে এক ধরণের আত্মত্যাগের ধারণা থেকে না আসে। কর্তব্যবোধ কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কে আক্রমণাত্মক, মানুষ অন্যের কাছে পছন্দের হতে চায়, করুণার পাত্র হতে চায় না, অনেক লোককে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং চেষ্টাবিহীন পছন্দ করা মনে হয় ব্যক্তিগত আনন্দের সব উৎসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
পূর্ব অনুচ্ছেদে আমি বিভিন্ন জিনিসে সৌহার্দ্যপূর্ণ কৌতূহলের কথা বলেছি। কথাটি আরোপিত মনে হতে পারে। কোনও জিনিসের বন্ধুত্বপূর্ণ অনুভব করা অসম্ভব মনে হতে পারে, কিন্তু ভূতত্ত্ববিদ পাথর নিয়ে, পুরাতত্ত্ববিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন কীর্তি নিয়ে যে বন্ধুত্বভাব ধারণ করেন তা ঐ কৌতূহলের অনুরূপ। আর এই কৌতূহল ব্যক্তি বা সমাজের যে মনোভাব তারই একটি উপাদান হতে পারে। কোনও জিনিস যদি বন্ধুভাবাপন্ন না হয়ে শত্রু ভাবাপন্ন হয়, তাহলে তার প্রতিও কৌতূহল বজায় রাখা সম্ভব। কোনও মানুষ মাকড়সার স্বাভাবিক বাসস্থান বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন কারণ তিনি মাকড়সাকে ঘৃণা করেন এবং সেখানেই বাস করতে চান যেখানে তারা সংখ্যায় কম। এই কৌতূহল সে তৃপ্তি দেবে না, যা লাভ করেন ভূতত্ত্ববিদ পাথর থেকে। আমাদের চতুষ্পর্শ্বের অবস্থানরত জীবদের চেয়ে অব্যক্তিগত জিনিসে কৌতূহল দৈনন্দিন সুখের উপকরণ হিসাবে সম্ভবত কম মূল্যবান, তবুও এর গুরুত্ব কম নয়। পৃথিবীর বিস্তৃতির যেন সীমা নেই কিন্তু আমাদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। যদি আমাদের সুখ ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে আবদ্ধ রাখা যায়, তাহলে জীবন যেটুকু দিতে পারে তার থেকে বেশি না করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। এবং বেশি দাবি করার অর্থই হল যা পাওয়া সম্ভব তার চেয়ে কম পাওয়া। যে মানুষ নিজের দুঃখ ভুলে থাকতে পারেন, খ্রিস্টিয়ে ট্রেন্টের কাউন্সিল বা নক্ষত্রের জন্ম ইতিহাস নিয়ে খাঁটি কৌতূহলের কারণে, তিনি যখন নৈর্ব্যক্তিক পৃথিবী-পরিক্রমণ শেষে নিজের পরিবেশে ফিরে আসেন তখন তিনি দেখতে পান এমন একটি ভারসাম্য ও প্রশান্তি তিনি লাভ করেছেন যাতে সব দুঃখকে জয় করা সহজতম পথেই সম্ভব হয়েছে এবং এর মধ্যেই নশ্বর হলেও তিনি এক নির্ভেজাল আনন্দ লাভ করেছেন।
সুখলাভের গোপন সূত্রটি হচ্ছে এই আপনার কৌতূহলকে ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর সীমায় ছড়িয়ে দিন। আপনার যেসব ব্যক্তি বা বিষয়ে কৌতূহল তাদের প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া বৈরীভাবাপন্ন না হয়, বন্ধুসুলভ হোক। পরবর্তী অধ্যায়সমূহে সুখলাভের সম্ভাব্য উপায়গুলির এই প্রাথমিক সমীক্ষাটি আরো বিস্তারিত করা হবে এবং তার সাথে দুঃখের মনস্তাত্ত্বিক উৎসসমূহের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় এবং সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।
——
১. আইনস্টাইন, Albert Einstein (১৮৭৯-১৯৫৫)। অপেক্ষিকতাবাদের (Theory of relativity) জনক। দক্ষিণ জার্মানীতে জন্ম। তার তত্ত্ব প্রভাবিত করেছে আধুনিক দর্শন ও বিজ্ঞানের সব শাখাকে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাথে ‘বোস-আইনস্টাইন’ সংজ্ঞার উদগ্যাতা। তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রিয় মানুষ ছিলেন, শান্তি আন্দোলনে তার অবদান অসামান্য। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল দ্বিধাহীন ও সুস্পষ্ট। এই বিজ্ঞান সাধক বলেছিলেন, ‘The most beautiful thing we can experience is teh mysterious.’
