ভারত, চীন এবং জাপানে রাজনৈতিক অবস্থার ওপর বাইরের প্রভাব তরুণ শিক্ষিতদের সুখে অন্তরায় হয়, কিন্তু সেখানে ভিতরের কোনও বাধা নেই যা রয়েছে পশ্চিমের দেশে। এমন অনেক কাজ রয়েছে যা তরুণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এবং এইসব যতটা সফল হয় ততটাই তারা সুখী হয়। তারা মনে করে জাতীয় জীবনে তাদের একটা গুরুত্ববহ ভূমিকা রয়েছে এবং এমন সব লক্ষ্য রয়েছে যা অনুসরণ করা কঠিন হলেও তা অর্জন করা অসম্ভব নয়। পাশ্চাত্যের উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এক ধরনের বিশ্বনিন্দুকতা বোধ দেখা যায়, যার সৃষ্টি আরাম এবং ক্ষমতাহীনতার যোগফল থেকে। ক্ষমতাহীনতা মানুষকে অনুভব করতে শেখায় যে, কোনও কিছুই কাজের নয় এবং আরাম এইসব বেদনাদায়ক অনুভূতিকে কোনওভাবে সহনশীলতার মধ্যে ধরে রাখে। প্রাচ্য দেশসমূহে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জনমতের ওপর আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করার আশা করে, কিন্তু পাশ্চাত্য দেশের ছাত্ররা তা পারে না। কিন্তু পাশ্চাত্যের ছাত্রের মতো প্রচুর উপার্জন করার সুযোগ তাদের অনেক কম। ক্ষমতাহীন অথবা অসচ্ছল হওয়ার কারণে সে হয় সংস্কারক অথবা বিপ্লবী, কিন্তু বিশ্বনিন্দুক হয় না। জনগণের ব্যাপার কোন পথে চলবে তার ওপর সংস্কারক অথবা বিপ্লবীর আনন্দ নির্ভর করে। কিন্তু সম্ভবত সে যখন ফাঁসির দড়ি পরতে চলেছে, তখন একজন স্বাচ্ছন্দ্যভোগী বিশ্বনিন্দুকের চেয়ে বেশি বাস্তব আনন্দ অনুভব করে। এক চীনা যুবকের কথা মনে পড়ছে আমার যে আমার স্কুল দেখতে এসেছিল। সে চীনের প্রগতিবিরোধী অঞ্চলে এইরকম একটি স্কুল স্থাপন করবে বলে দেশে ফিরে যাচ্ছে। সে জানে এর ফলে তার হয়তো শিরচ্ছেদ হবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে এমন এক শান্ত আনন্দ অনুভব করছিল যার জন্যে আমি তাকে ঈর্ষা করি।
আমি এমন মন্তব্য করতে চাই না যে এ ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ সুখই হচ্ছে সম্ভাব্য একমাত্র সুখ। বাস্তবে এই সুখের পথ যাদের জন্যে খোলা, তারা হচ্ছে সংখ্যালঘু কারণ তার জন্যে প্রয়োজন এক ধরণের বিশেষ দক্ষতা এবং স্বার্থের প্রসারতা, যা খুব সাধারণ নয়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানীরাই শুধু তাদের কাজে আনন্দ পেতে পারেন তা নয়। নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রনেতারাও যে শুধু কোনও মতকে সমর্থনের ভিতর আনন্দ পেতে পারেন তাও নয়। কাজের আনন্দ যে কোনও মানুষের জন্যে উন্মুক্ত, যদি তিনি বিশেষ দক্ষতার অধিকারী হন, যদি না তিনি সাধারণের প্রশংসা পাওয়ার জন্যে তা করেন তাহলে তিনি তার দক্ষতা প্রয়োগের মধ্যেই তৃপ্তি পেতে পারেন। আমি একজনকে জানতাম, যিনি শৈশবেই দুই পায়ের ব্যবহার-ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু তবু তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবন অবিচলিত সুখে অতিবাহিত করেছেন। এই সুখ তিনি লাভ করেছিলেন পাঁচ খণ্ডে সম্পূর্ণ একটা গ্রন্থ রচনা করে, যার বিষয়বস্তু ছিল গোলাপের কীট। এই বিষয়ে সবসময় তাঁকেই আমি প্রধান বিশেষজ্ঞ বলে মনে করি। অনেক সংখ্যক শখ-বিজ্ঞানীর সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আমি পাইনি। কিন্তু যাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, তাদের কাছে সব সময় শুনেছি যারা শঙ্খ বিষয়ে গবেষণা করেন তাঁরা এর মধ্যে একধরণের পরিতৃপ্তি খুঁজে পান। একসময় আমি একজনকে জানতাম প্রেসের কম্পোজিটর হিসাবে পৃথিবীতে তাঁর তুলনীয় কেউ ছিল না এবং যারা সুন্দর সুন্দর হরফ তৈরী করতেন তারা তাঁর সাহায্য চাইতেন। তিনি সবার কাছ থেকে আন্তরিক শ্রদ্ধা পেতেন। যাদের শ্রদ্ধাকে কখনো কোনও ভাবে লঘু করে দেখা যায় না। কিন্তু তিনি যে আনন্দ লাভ করতেন তা সেই শ্রদ্ধালাভ থেকে ততটা নয়, যতটা পেতেন তার নিজের নৈপুণ্য প্রয়োগ থেকে এবং এই সেই আনন্দ যা লাভ করেন একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী তার নৃত্য থেকে, যার সাথেই শুধু তুলনীয় তা কাজ থেকে পাওয়া আনন্দ। আমি আরো অনেক কম্পোজিটরকে জানি যারা গণিতবিদ্যার বিভিন্ন হরফ, প্রাচীন নেস্টেরিয়ান হরফ অথবা কিউনিফর্ম হরফ এবং যা কিছু ভিন্নধর্মী এবং কঠিন তা সাজিয়ে দিতে পারদর্শী ছিলেন। তাদের পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত জীবন সুখের ছিল কিনা তা আমি জানতে পারিনি। কিন্তু কাজের সময় তাদের সৃজনদক্ষতা পূর্ণ চরিতার্থতা লাভ করত।
এটা বলা একটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে পুর্বে শিল্পীরা তাদের কাজের দক্ষতায় যে আনন্দ পেতেন আমাদের এই যন্ত্র-যুগে শিল্পীরা সেই আনন্দ পাবেন তেমন সুযোগ নেই। একথা সত্য যে মধ্যযুগের শিল্পীমহল যে ধরনের কাজ করতেন, বর্তমানের কারিগরদের কাজের ক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু যান্ত্রিকযুগের অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্ব এবং প্রয়োজন রয়েছে। একদল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং সূক্ষ্ম কলকজা তৈরী করে, একদল নকসা তৈরী করে, একদল বিমান যান্ত্রিকের কাজ করে, একদল গাড়ি চালায় এবং আরো নানা ধরনের কাজে বহু কারিগর নিয়োজিত। যাদের ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রকাশ একেবারেই সীমিত। অপেক্ষাকৃত প্রাচীন যুগে ফসলের মাঠে মজুর এবং কৃষক, যতদূর আমি দেখেছি, মোটরচালক অথবা ইঞ্জিন চালকের মতো সুখী নয়। তবে একথা সত্যি যে কৃষক নিজের জমি আবাদ করে, তার কাজে বৈচিত্র্য আছে। সে নিজে চাষ করে, বীজ বোনে, ফসল কাটে, কিন্তু সে প্রকৃতির অধীন এবং এ বিষয়ে সে সচেতন। অন্যদিকে যে মানুষ আধুনিক যন্ত্র চালায় সে নিজের শক্তি সম্বন্ধে সচেতন, সে জানে মানুষই হল প্রকৃতির প্রভু, দাস নয়। তবে একথাও অবশ্য সত্যি যে শুধুমাত্র যারা যান্ত্রিক মনের, যারা দিনের পর দিন বৈচিত্র্যহীন একই যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে তাদের কাজে কোনও স্বাদ নেই এবং সেই কাজ যতই স্বাদহীন হোক, ততই তা যন্ত্রের সাহায্যে করা যাবে। যান্ত্রিক উৎপাদনের চরম লক্ষ্য, এ কথা সত্যি যা থেকে আমরা অনেক দূরে, সেটা হচ্ছে একটা পদ্ধতি যাতে প্রত্যেকটি অনাকর্ষণীয় কাজ যন্ত্রের সাহায্যে করা যাবে। আর সেখানে যে কাজে বৈচিত্র্য এবং প্রেরণা আছে সে কাজের জন্যে মানুষকে আলাদা করা যেতে পারে। এইরকম পৃথিবীতে কাজে একঘেয়েমি কম হবে এবং অবসাদও কমে যাবে যা কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকে কখনো হয়নি। চাষব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষ অনাহারের কবল থেকে বাঁচার জন্যে একঘেয়েমি ও ক্লান্তিকে মেনে নিয়েছে। যখন শিকারের সাহায্যে মানুষ খাদ্য সগ্রহ করত এবং তখন কাজই ছিল তার কাছে আনন্দ। তার প্রমাণ ধনবানরা এখনও আনন্দ উপভোগের জন্যে পূর্বপুরুষদের এই শিকার বৃত্তিকে অনুসরণ করে চলেছে। কিন্তু কৃষিকাজ প্রবর্তনের পর থেকে মানুষ নীচতা, দুর্ভোগ এবং উন্মত্ততার এক সুদীর্ঘ যুগে প্রবেশ করেছে। যা থেকে মাত্র এখন তারা মুক্ত হয়ে যন্ত্রের কল্যাণময় কাজের সাথে যুক্ত হতে চলেছে। মাটির স্পর্শের যে অনুভূতি তা শুনতে ভাল লাগে অনুভূতিপ্রবণদের মুখে, ভাল লাগে হার্ডির(৪) সৃষ্টি, দার্শনিক কৃষকদের পক্ক জ্ঞানের কথা, কিন্তু গ্রামাঞ্চলের প্রত্যেকটি তরুণের একমাত্র কামনা শহরে কাজ পাওয়া, যেখানে সে মুক্তি পাবে জল-হাওয়ার দাসত্ব এবং আলোহীন দীর্ঘ শীতের সন্ধ্যার একাকীত্ব থেকে এবং কলকারখানা এবং প্রেক্ষাগৃহের মানবিক পরিবেশে প্রবেশ করতে পারবে। সাধারণ মানুষের সুখের প্রথম উপাদান হল সাহচর্য এবং সহযোগিতা এবং তা কৃষি থেকে শিল্পে অনেক পূর্ণতার সাথে পাওয়া যায়। আমি শুধু নির্যাতিত দেশসমূহের বিপ্লবী, সমাজতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদীদের কথা বলছি না, আমি অনেক অবনমিত ধরণের বিশ্বাসের কথাও চিন্তা করছি। আমি এমন কয়েকজন লোককে জানি যারা বিশ্বাস করতেন ইংরেজরা ইফ্রেইম ও মানাস(৫) উপজাতির বংশধর, তাদেরও আনন্দের কোনও সীমা নেই। আমি এই কথা বলছি না যে পাঠক এইসব ধারণা বিশ্বাস করুন, কারণ যে বিশ্বাসের কোনও ভিত্তি নেই, যা আমার কাছে ভুল বিশ্বাস বলে মনে হয় তা থেকে সুখ লাভ করতে। এই একই কারণে আমি পাঠককে এই কথা বিশ্বাস করতে জোর দিচ্ছি না যে, মানুষ একমাত্র বাদামের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকুক। যদিও যতদূর পর্যন্ত আমার পর্যবেক্ষণ পৌঁছায়, আমি দেখেছি এই ধরণের বিশ্বাসে নিশ্চিন্ত আনন্দ লাভ হয়, যা বিশুদ্ধ। সুখের জন্যে কোনও কোনও বিশ্বাসে যাদের উৎসাহ যথার্থ, তারা এর মধ্যেই তাদের অবসর সময়ের একটা কাজ পেয়ে যান এবং জীবনটা শূন্য– এই যাদের অনুভূতি তারাও তাদের মনোরোগের এক পূর্ণ প্রতিকার পেয়ে যান। কোনও একটা শখে ডুবে থাকা, অজ্ঞাত বিশ্বাসে আনুগত্য পোষণ করা থেকে খুব দূরে নয়। একজন প্রখ্যাত জীবিত গণিতবিদ তাঁর সময়কে গণিত চর্চা এবং ডাকটিকিট সংগ্রহ এই দুই কাজের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। আমি মনে করি প্রথমটাতে যখন তিনি অগ্রসর হতে পারেন না, সেইসব মূহুর্তে দ্বিতীয়টার মধ্যে তিনি সান্ত্বনা পেতেন। গণিতের প্রতিপাদ্য প্রমাণে দূরূহতা একমাত্র দুঃখ নয়, যা ডাকটিকিট সংগ্রহ দূর করতে পারে অথবা ডাকটিকিটই একমাত্র জিনিস নয় যা সগ্রহ করা যায়। একবার বিবেচনা করে দেখুন, পুরোনো চিনেমাটির জিনিস, নস্যির কৌটো, রোমান মুদ্রা, তীরের ফলা, প্রস্তরযুগের যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কল্পনার ভিতর কী বিশাল উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে মানসপটে। একথা সত্যি যে আমাদের মধ্যে অনেকেই এত উচ্চস্তরের যে এইসব সরল আনন্দে কোনও মূল্য পায় না। এসব আনন্দ আমরা সকলেই ছোটবেলায় উপভোগ করেছি, কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক এসবকে এখন বয়স্কদের জন্যে অনুপযুক্ত মনে করছি। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, অপরের পক্ষে অনিষ্টকর নয়, এমন যে কোনও আনন্দকেই মর্যাদা দেওয়া। উচিত। আমি নিজে নদীর তথ্য সগ্রহ করি। ভলগা নদীর ভাটি এবং ইয়াংসি নদীর উজান বেয়ে চলার পথে আনন্দ পেয়েছি এবং আমাজন ও ওরিনোকো নদী কখনো দেখিনি বলে আমার খুব দুঃখ। এই ধরণের সব আনন্দের অনুভূতি খুব সরল। আমি তার জন্যে লজ্জিত নই। অথবা বেসবল খেলায় উৎসাহীদের কথা বিবেচনা করুন, প্রবল আগ্রহের সাথে তারা সংবাদপত্র পড়েন আর রেডিওর ধারা বর্ণনা তাদের মনে দারুণ রোমাঞ্চ জাগায়। আমেরিকার এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তাঁর বই পড়ে আমার মনে হয়েছিল তার মন বিষাদময়তায় ভরা, কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই সময়ে রেডিওতে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বেসবল খেলার ফল ঘোষিত হচ্ছিল। তিনি সেই মুহূর্তে আমার কথা ভুলে গেলেন, ভুলে গেলেন সাহিত্য এবং আমাদের জাগতিক জীবনের সব দুঃখ-যন্ত্রণা। তাঁর প্রিয় দলের জয়লাভে তিনি আনন্দে চিৎকার করতে লাগলেন। এই ঘটনার পর থেকে তাঁর বই পড়ার সময়, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের দুর্ভাগ্যে আর কষ্ট পাইনি।
