কিন্তু আপনারা বলতে পারেন, আমাদের মতো উচ্চপর্যায়ের মানুষের জন্যে এইরূপ সহজ আনন্দ উন্মুক্ত নয়। খরগোশের মতো একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমরা আর কতটুকু আনন্দ পেতে পারি? আমি মনে করি এটা খুব দুর্বল যুক্তি। পীত জ্বরের জীবাণু থেকে খরগোশ অনেক বড় কিন্তু তবুও উচ্চস্তরের লোক তার সাথে যুদ্ধ করে আনন্দ পেতে পারে। আনন্দের মধ্যে আবেগের যে উপাদান, সেখানে আমার উদ্যানপালক এবং একজন উচ্চশিক্ষিতের যে আনন্দ তা আলাদা করা যায় না। যেসব কাজের ভিতর দিয়ে আনন্দ পাওয়া যায় শিক্ষা শুধু সেখানে পার্থক্য তৈরী করে। কোনও কিছুতে সার্থকতা লাভের আনন্দ এমনই যে, আগে সাফল্য অনিশ্চিত বলে মনে হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত তাতে সফলতা লাভ হয়। এই কারণে সম্ভবত নিজের ক্ষমতার ব্যাপারে অতিরিক্ত ধারণা পোষণ না করাই সুখের একটি উৎস। যে মানুষ নিজের ক্ষমতাকে কম করে দেখে সে সবসময় সাফল্যে অবাক হয়, আর যে তার ক্ষমতাকে বেশি করে দেখে, সে সবসময় ব্যর্থতায় অবাক হয়। প্রথম রকমের অবাক হওয়া আনন্দের, পরেরটি বেদনার। তাই নিজের সম্বন্ধে অহংকার পোষণ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, যদিও নিচু ধারণা পোষণ করে উৎসাহহীন হওয়াও উচিত নয়।
সমাজের উচ্চশিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে বর্তমানে যে বিজ্ঞানসেবকরা সবচেয়ে সুখী, তাঁদের মধ্যে যারা অতি বিখ্যাত তাঁদের অনেকেই আবেগের দিক থেকে খুব সরল । তাঁরা তাঁদের কাজের ভিতর যে তৃপ্তি পান, তা এতই গভীর যে, ভোজনে এমন কী বিবাহ থেকেও আনন্দ লাভ করতে পারেন। শিল্পী এবং সাহিত্যিকরা বিবাহে অসুখী হওয়াকে পালনীয় কর্তব্য বলে ভাবেন। কিন্তু বিজ্ঞানসেবীরা প্রায়ই পুরানো প্রথার গৃহী জীবনে পরম সুখ লাভ করেন। এর কারণ হচ্ছে তাদের বুদ্ধিমত্তার শ্রেষ্ঠ অংশ তাঁদের নির্দিষ্ট কাজে নিমগ্ন থাকে এবং যেখানে তার কোনও কাজ নেই, সেখানে তাকে অনধিকার প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। কারণ আধুনিক পৃথিবীতে বিজ্ঞান প্রগতিশীল এবং ক্ষমতাশীল। এবং তার গুরুত্বে তাঁরা অথবা সাধারণ লোক, কারো সন্দেহ নেই। সুতরাং তাঁদের কাছে জটিল আবেগের কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই, কারণ সরল আবেগ কোনও পথেই বাধা পায় না। আবেগের জটিলতা নদীর জলের ফেনার মত। ফেনার জন্ম হয় নদীর চলমান স্রোতধারা বাধা পেলে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত মূল শক্তি অব্যাহত থাকে ততক্ষণ উপরিভাগে কোনও আলোড়ন থাকে না এবং অনভ্যস্ত দৃষ্টিতে যে শক্তি ধরাও পড়ে না।
বিজ্ঞানীর জীবনে সুখের সকল শর্তই পাওয়া যায়। তার কাজেই তাঁর পূর্ণশক্তি ব্যবহৃত হয় এবং তিনি যে সাফল্য অর্জন করেন তার গুরুত্ব শুধু তাঁর নিজের কাছেই নয়, জনসাধারণের কাছেও গৃহীত হয়। এমনকী তাদের কাছে তা বিন্দুমাত্র বোঝার মতো না হলেও। এক্ষেত্রে তিনি শিল্পী অপেক্ষা বেশি ভাগ্যবান। জনসাধারণ যখন কোনও ছবি বা কবিতা বুঝতে না পারে, তখন তারা ধরেই নেয় যে ছবিটি খারাপ বা কবিতাটি ভাল নয়। যখন তারা বিজ্ঞানের আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব বুঝতে না পারে, তখন তা মনে করে (ঠিকই করে) যে তাদের শিক্ষা অপ্রতুল। কাজেই আইনস্টাইন(১) সম্মানিত হন এবং শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা ছাদের চিলেকোঠায় অনাহারে, অবহেলায় পড়ে থাকেন এবং সেজন্যে বিজ্ঞানীরা সুখী এবং চিত্রশিল্পীরা অসুখী। খুব কম মানুষই যথার্থ সুখী যাকে অবিরাম জনসাধারণের সংশয়বাদের বিরুদ্ধে নিজের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সংগ্রাম করতে হয়। যদি না তিনি নিজেকে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ করে বাইরের জগতের শীতলতাকে ভুলে থাকতে পারেন। বিজ্ঞানীদের এই ধরনের দল গঠনের প্রয়োজন হয় না কারণ তাঁর সহকর্মী ছাড়া আর সকলেই তাকে সম্মান করেন। অপরদিকে, চিত্রশিল্পী নিন্দিত হবেন না নিন্দার্য হবেন, এই দুইয়ের মাঝখানে এক বেদনাময় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে থাকেন। তার ক্ষমতা যদি প্রথম শ্রেণীর হয়, তা হলে তাঁকে এটা বা অপরটা যে কোনও একটা দুর্ভাগ্যে ভুগতেই হবে। যদি তিনি তার ক্ষমতা ব্যবহার করেন তা হলে নিন্দিত হবেন এবং যদি না করেন তা হলে নিন্দাহ হবেন। অবশ্য সবসময় সব জায়গায় এরকম ঘটেনি।
এমন সময় ছিল যখন গুণী শিল্পীরা তাদের তরুণ বয়সে পর্যন্ত প্রশংসা পেয়েছেন। দ্বিতীয় জুলিয়াস(২) মাইকেল এঞ্জেলোর(৩) প্রতি দুর্ব্যবহার করলেও তিনি যে দক্ষ শিল্পী নন, তা কখনো ভাবেন নি। বর্তমান যুগের ধনপতিরা প্রধান শিল্পীদের তাদের সৃজন ক্ষমতা চলে গেলে তাঁদের প্রচুর অর্থ দান করতে পারেন, কিন্তু কখনো তাদের সৃষ্টিকে নিজের চেয়ে বড় বলে ভাবেন না। সম্ভবত শিল্পীরা গড়ে বিজ্ঞানীদের চেয়ে যে কম সুখী তার পিছনে এইসব ঘটনার অবদানও রয়েছে।
আমার নিশ্চিত ধারণা, পশ্চিমের স্বদেশের তরুণরা তাদের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতার উপযুক্ত প্রয়োগক্ষেত্র না পাওয়ার কারণে অসন্তোষে ভুগছে। পূর্বদেশসমূহে অবস্থা কিন্তু এরকম নয়। বর্তমানে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় সম্ভবত রাশিয়াতে তরুণরা বেশি সুখী। সেখানে তারা এক নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করছে এবং তা করার জন্যে তাদের রয়েছে এক উদ্দীনাময় বিশ্বাস। প্রাচীনদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, অনাহারে রাখা হয়েছে, নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে অথবা অন্য কোনওভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে যাতে প্রত্যেক পশ্চিম দেশে তারা তরুণদের ক্ষতি করার অথবা কিছু করার মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বাধ্য করে, তেমন কিছু করতে না পারে। জ্ঞানাভিমানী পাশ্চাত্যবাসীদের কাছে তরুণ রাশিয়ানদের বিশ্বাস অমার্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু এর বিরুদ্ধেই বা বলবার কী আছে? সে সত্যি নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করছে, তার মনের মতো পৃথিবী। যখন তার কাজ শেষ হবে, তখন রাশিয়ার মানুষ বেশি সুখী হবে। পশ্চিমের অভিজাত বুদ্ধিজীবীরা এই নতুন পৃথিবীতে সুখী না হতে পারেন, কিন্তু তাদের তো সেখানে বাস করতে হবে না, তাই যে কোনও বাস্তবধর্মী বিচারে তরুণ রাশিয়ানদের বিশ্বাসকে সমর্থন করা যায় এবং তত্ত্বভিত্তিক কারণ ছাড়া একে অমার্জিত বলে নিন্দা করাকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না।
