অন্যান্য ভয়ের মতো জনমতের মতো ভয় যন্ত্রণাদায়ক এবং বিনাশের পথে বাধাস্বরূপ। এ রকম ভয় প্রবল হলে কোনও বড় কিছু করাই সম্ভব নয় এবং যে চিত্তস্বাধীনতায় আসল সুখ পাওয়া যায়, তা অসম্ভব হয়ে ওঠে। কারণ আমাদের স্বতোৎসারিত চিত্তবৃত্তি থেকে যে জীবনধারা গড়ে ওঠে তাই হল সুখের মূল উৎস। আমাদের প্রতিবেশী বা আপনজনদের কাছ থেকে পাওয়া আকস্মিক কোনও পছন্দ বা ইচ্ছা থেকে আহরিত জীবনধারা নয়। নিকটতম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ভয় নানা কারণে আগের তুলনায় কমে গেছে সেটা ঠিক, কিন্তু নতুন এক ভয়ের কারণ দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে সংবাদপত্র কী বলবে সেই মতামত নিয়ে ভয়। মধ্যযুগের ডাইনি-শিকারের মতো ভয়ংকর ভয়ের ঘটনার সাথেই শুধু এর তুলনা করা যায়। যখন কোনও সংবাদপত্র কোনও নিরীহ লোককে অন্যের দোষের ভারবাহী ব্যক্তি হিসাবে বেছে নেয় তার পরিণাম হয় ভয়ংকর। সৌভাগ্যক্রমে অধিকাংশ মানুষ অখ্যাত হওয়ার জন্যে এই পরিণাম এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু প্রচার রীতি যতই আরো নিখুঁত হতে থাকবে, এই ব্যাপারে ততই সামাজিক নির্যাতনের এই অভিনব কৌশলটির সাহায্যে আরও বেশি বিপদের কারণ হয়ে উঠবে। যিনি একবার এর হাতে বলি হয়েছেন, তার পক্ষে কোনভাবেই এই গুরুতর বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া চলে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্বপক্ষে যত কথাই বলা হোক, আমি মনে করি, বর্তমান মানহানির আইনে যেভাবে রয়েছে সেই সীমারেখা তার চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে টানা উচিত এবং নিরীহ মানুষদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে এমন যে কোনও বিষয় সংবাদপত্রে প্রকাশ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এমন কী তারা এমন কিছু যদি করে থাকে বা বলে থাকে, যা বিদ্বেষপূর্ণভাবে প্রকাশ করলে তাদের জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তারও প্রকাশ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এই অন্যায়ের একমাত্র চূড়ান্ত প্রতিকার হচ্ছে জনগণের দিক থেকে আরও বেশি সহনশীল হতে অভ্যস্ত হওয়া। সুখের সন্ধানে সহনশীলতা বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ পথ হচ্ছে সুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ানো যাতে তারা তাদের সহচরদের বেদনাহত করাকেই জীবনের প্রধান সুখ বলে মনে না করে।
———-
১. ফ্রন্টি ভগ্নিরা, Bronte Sisters। ভিক্টোরীয় যুগের ব্ৰন্টি ভগ্নিরা হলেন ঔপন্যাসিক এমিলি ব্ৰন্টি (১৮১৮-৪৮), শার্লেট ব্ৰন্টি (১৮২৬-৫৫) এবং এ্যান ব্ৰন্টি (১৯২০-৪৯)। স্বল্প জীবনের অধিকারিণী এই তিন ভগ্নির উপন্যাসে বিক্ষুব্ধ, নির্যাতিত আশার বিদ্রোহ ঘোষণা এবং নারীসমাজের পূর্ণতর জীবনের অধিকারের প্রশ্ন প্রখরভাবে ফুটে উঠেছে।
২. ব্লেক, William Blake, (১৭৫৭-১৮২৭)। ইংরেজ কবি ও চিত্রকর, যোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন মৃত্যুর পর।
৩. গ্যালিলিও, Galileo, (১৫৬৪-১৬৪২)। ইতালির বিখ্যাত গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তাঁর বিপজ্জনক মতবাদ হল, ‘Eppar si move’– পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। এই মতবাদ বাইবেল-বিরোধী। সেজন্যে বৃদ্ধবয়সে তাঁকে নির্যাতিত হতে হয়, ভোগ করতে হয় কারাদণ্ড। ১৯৯৪ সালে তার মৃত্যুর ৩৫২ বছর পর ভ্যাটিকান চার্চ তাঁর মতবাদ মেনে নেয়।
৪. কেপলার, Johaunes Kepler (১৫৭১-১৬৩০), জার্মান গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রকৃতি-দার্শনিক।
১০. সুখলাভ কি তবু সম্ভব?
এ পর্যন্ত আমরা অসুখী মানুষদের সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এখন আমরা সুখী মানুষদের নিয়ে আরো মনোরম আলোচনা করব। আমরা কয়েকজন বন্ধুর সাথে মত বিনিময় করে এবং তাঁদের বই পড়ে আমাকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়েছে যে, বর্তমান পৃথিবীতে সুখলাভ অসম্ভব ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমি গভীরভাবে চিন্তা করে, বিদেশে ভ্রমণ করে এবং উদ্যানপালকের সাথে আলোচনা করে অন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখেছি এই ধারণার কোনও অস্তিত্ব নেই। এর আগের একটি অধ্যায়ে আমার সাহিত্যিক বন্ধুদের নিয়ে আমি কিছু বলেছি। এই অধ্যায়ে আমি জীবনে যে সব সুখী লোকের সংস্পর্শে এসেছি তাদের নিয়ে সমীক্ষা করব।
সুখ দু’রকমের, যদিও এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে বেশ কটা পর্যায় রয়েছে। যে দু’রকমের সুখের কথা বলছি, তা হচ্ছে রূপহীন এবং রূপময় অথবা দৈহিক এবং আত্মিক অথবা হৃদয়-উৎসারিত এবং মস্তিষ্ক-জাত। এতসব বিকল্পের সংজ্ঞা নির্ণয় করা নির্ভর করবে কী প্রমাণ করতে চাওয়া হচ্ছে তার ওপর। আমি কোনও পূর্বপরিকল্পিত বিশ্বাস প্রমাণ করতে যাচ্ছি না, আমি শুধু বলে যাব। দু’রকমের সুখের পার্থক্য বর্ণনার সহজতম উপায় হচ্ছে একটি যে কোন ব্যক্তি লাভ করতে পারেন, অন্যটি শুধু যারা লিখতে পড়তে পারেন তাদের জন্যেই এই কথাটি বলা। আমি যখন বালক ছিলাম, তখন আমি আনন্দে ভরপুর একটি লোককে জানতাম যার কাজ ছিল কূপ খনন করা। অতি দীর্ঘ দেহ, অবিশ্বাস্য রকম পুষ্ট পেশী, সে পড়তে বা লিখতে জানত না। ১৮৮৫ সালে যখন সে পার্লামেন্টের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পেল তখন প্রথম জানতে পারল এই ধরণের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা। তার সুখ মস্তিষ্ক উৎসারিত কোন কিছুর ওপর নির্ভরশীল ছিল না। এই সুখ, প্রকৃতির আইন অথবা প্রাণীজগতের প্রজাতিদের পূর্ণতা প্রাপ্তির সম্ভাবনা অথবা সাধারণের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ স্বত্ব অথবা যীশুখ্রিস্টের পুনরাবির্ভাবে বিশ্বাসীদের জয়, অথবা বুদ্ধিজীবীদের কাছে জীবনকে উপভোগ করতে অন্য যেসব মতবাদ প্রয়োজন তার কোনওটার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়নি। তার সুখের ভিত্তি ছিল দৈহিক শক্তি, পর্যাপ্ত কাজ এবং পাথরের অলঙঘনীয় বাধাকে পরাজিত করা। আমার উদ্যানপালকের সুখের প্রজাতি একই। ছোট জাতের খরগোশের সাথে তার নিত্যদিনের সগ্রাম, আর তাদের সম্বন্ধে সে বলশেভিকদের সম্পর্কে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দারা যেভাবে বলে সেও ঠিক সেভাবেই বলে। সে মনে করে ঐ খরগোশগুলি কুটিল, চতুর এবং হিংস্র এবং তার মতে ওদের সমান ধূর্ততা না থাকলে ওদের সাথে পেরে ওঠা কঠিন। নরওয়ের উপকথায় বর্ণিত ভ্যানথালার নায়কেরা প্রতিদিন একটি বিশেষ বন্যবরাহ শিকার করত এবং প্রতি সন্ধ্যায় তাকে হত্যা করত। কিন্তু কোনও অলৌকিক কারণে সে প্রতিদিন সকালে প্রাণ ফিরে পেত। আমার উদ্যানপালকও ঠিক একইভাবে একদিন তার শত্রুকে বধ করতে পারে নির্ভয়ে কারণ পরদিন সে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবে এমন ভয় তার নেই। তার বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে তবু সে সারাদিন কাজ করে এবং এই কাজের জন্যে সাইকেলে ষোল মাইল পাহাড়ি পথ প্রতিদিন তাকে আসা-যাওয়া করতে হয়। কিন্তু তার আনন্দের উৎস নিঃশেষ হয় না কখনো, আর তা যোগান দেয় ঐ খরগোশ।
