বয়োবৃদ্ধরা তরুণদের সব ইচ্ছাকে সম্মান দেখাবেন এটা অবশ্যই কামনীয়, কিন্তু তরুণরা বয়োবৃদ্ধদের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাবে, সেটা অবশ্য কামনীয় নয়। এর কারণ খুব সহজ। উভয় ক্ষেত্রেই তা তরুণদের জীবনের ব্যাপার, বয়োবৃদ্ধদের নয়। তরুণরা যখন বৃদ্ধদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে, যেমন বিধবা বা বিপত্নীক মা-বাবার পুনর্বিবাহে আপত্তি জানায়, তাহলে তারা ততটুকু অন্যায় করে, বড়রা ঠিক ছোটদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে যতটুকু অন্যায় করেন। বড় হোক কিংবা ছোট বিচারশক্তি অর্জন করার বয়সে পৌঁছে গেলে তাদের নিজেদের পছন্দে চলার অধিকার স্বীকার করতে হবে। এমন কী অন্যায় করা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তুমি একজন তরুণ, তোমার ইচ্ছা নাট্যমঞ্চে যোগ দেওয়ার; কিন্তু তোমার বাবা-মার এতে আপত্তি, এই কারণে যে, তারা এটাকে অনৈতিক বা নিচুস্তরের সামাজিক কাজ বলে মনে করেন। তারা যতদূর সম্ভব তোমার ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন, হয়তো বলবেন তাদের কথা না শুনলে তারা তোমাকে পরিত্যাগ করবেন, বলবেন এমন কাজ করলে তুমি কিছুদিনের ভিতর অনুতাপে দগ্ধ হবে, যতরকম খারাপ হবে সব একে একে তোমাকে বলবেন এবং বোঝাবেন তুমি যা করতে চাও তা করে বহু তরুণের সর্বনাশ হয়েছে। তারা হয়তো ঠিকই মনে করেছেন, তোমার পক্ষে নাট্যমঞ্চ উপযুক্ত নয়। হতে পারে তোমার তেমন অভিনয় দক্ষতা নেই অথবা তোমার কণ্ঠস্বর খুব খারাপ। যদি তাই হয় সে কথা তুমি অল্পদিনের মধ্যেই জানতে পারবে থিয়েটার শিল্পীদের কাছ থেকে। তারপরও অন্য একটা পেশা নির্বাচন করার যথেষ্ট সময় তুমি পাবে । বাবা-মার যুক্তি তোমার চেষ্টা থেকে দূরে থাকার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। তাদের এত সব যুক্তি সত্ত্বেও তুমি নিজের ইচ্ছায় দৃঢ় থাক, তাহলে তারা অল্পদিনের মধ্যেই শান্ত হয়ে যাবেন। এমন কী, তোমার বা তাদের অনুমানের অনেক আগেই। অন্যদিক যদি পেশাদারদের অভিজ্ঞ মতামত তোমাকে নিরুৎসাহিত করে তো আলাদা ব্যাপার। কারণ পেশাদারদের অভিমত সূচনাকারীদের মেনে নেওয়া উচিত।
আমার মনে হয়, সাধারণভাবে, বিশেষজ্ঞদের মতামত না ধরে যে কোনও বিষয়ে ছোট বা বড় যাই হোক, অন্যদের মতামতের ওপর একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। জনমতকে ততটাই সম্মান জানানো উচিত যতটা নিয়মসংগত, যা অনাহার এড়ানো বা কারাগারের বাইরে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয়। কিন্তু তা অতিক্রম করে গেলে এটা হবে অহেতুক নির্যাতনের কাছে মাথা নত করা এবং সুখের সব রকম পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। খরচের ব্যাপার ধরা যেতে পারে। অনেক লোককে দেখা যায়, তারা নিজেদের পছন্দ যা অনুমোদন করেন, তা থেকে ভিন্ন বিষয়ে অর্থ খরচ করেন, কারণ তাদের ধারণা ভাল একটা গাড়ি থাকলে অথবা সুন্দর নৈশভোজ খাওয়াবার ক্ষমতা থাকলেই তারা প্রতিবেশীদের সম্মান অর্জন করতে পারবেন। বাস্তব ব্যাপার হল, যে কোনও ব্যক্তি, যার গাড়ি কেনার ক্ষমতা আছে অথচ মনের দিক থেকে দেশভ্রমণ বা একটি ভাল গ্রন্থাগার পছন্দ করেন, শেষ পর্যন্ত অন্যেরা যেভাবে চলতে চান সেভাবে না চলেন, তাহলে অনেক বেশি মর্যাদা পাবেন। অবশ্য জোর করে জনমতকে অস্বীকার করার মধ্যে কোনও কৃতিত্ত্ব নেই, সেটাও জনমতের আধিপত্য মেনে নেওয়ার মত, যদিও একটু ঘুরপথে। কিন্তু যদি আন্তরিকভাবে তার প্রতি নিস্পৃহ থাকা যায় তা শক্তির পরিচায়ক এবং সুখের উৎস হয়ে উঠবে। যে সমাজে নারীপুরুষ সকলেই একই ধরনের আচরণ করে, তার চেয়ে যে সমাজে তারা প্রচলিত প্রথার কাছে খুব বেশি মাথা নোয়ায় না, সেই সমাজ অনেক বেশি মনোহর। যেখানে প্রতিটি মানুষের চরিত্র ব্যক্তিগতভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়, সেখানেই মানুষের স্বভাবের বৈচিত্র্য রক্ষিত হয় এবং নতুন মানুষের সাথে দেখা হওয়াটা উপকারী হয়। কারণ তারা যাদের সাথে একবার দেখা হয়েছে তাদের পদমর্যাদা তাদের জন্মের ওপর নির্ভরশীল, তারা নিজের খেয়ালখুশী মতো ব্যবহারের সুযোগ পায়। আধুনিক বিশ্বে আমরা সামাজিক স্বাধীনতার উৎসটি হারাতে চলেছি। সুতরাং সবকিছু একাকার হয়ে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে সুচিন্তিত ধারণা কামনীয়। আমি বলতে চাই না মানুষ ইচ্ছা করে খামখেয়ালি হয়ে উঠুক, কারণ তা রীতি মেনে চলার মতোই অপ্রীতিকর । আমি বলতে চাই মানুষ স্বাভাবিক হোক এবং তাদের স্বাধীন ইচ্ছামূলক পছন্দ অনুসরণ করে চলুক যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে অভিজাতদের মতো না হয়। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত চলাচল ব্যবস্থার সুযোগে মানুষ আর আগের মতো নিকটতম ভৌগোলিক প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভরশীল নয়। যাদের গাড়ি আছে তারা বিশ মাইলের ভিতর বাস করে এমন যে কোনও লোককে প্রতিবেশি মনে করতে পারেন। তাই তাদের সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষমতাও আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। যে কোন জনাকীর্ণ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যে মানুষ বিশ মাইলের মধ্যে মনের সঙ্গী খুঁজে পায় না, তাকে নিশ্চিতভাবেই হতভাগ্য বলা যায়। নিকট প্রতিবেশীদের সাথে পরিচিত হওয়া উচিত, এই ধারণা ঘনবসতিপূর্ণ নগরে আর বেঁচে নেই, কিন্তু ছোট শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে এখনো রয়ে গেছে। সামাজিকতার জন্যে নিকটতম প্রতিবেশীদের ওপর নির্ভরশীলতা যখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে, তখন এই ধারণাও অর্থহীন হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র কাছে থাকা লোকের মধ্যে সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার পরিবর্তে মনের মতো সঙ্গী নির্বাচন করার সুবিধা বেড়ে গেছে। সমজাতীয় পছন্দ ও সমমতের মানুষের সঙ্গলাভ সুখ বাড়িয়ে তোলে। এই পথেই সামাজিক সম্পর্ক নানাভাবে গড়ে উঠবে এটা আশা করা যায় এবং এই পথেই যে নিঃসঙ্গতা এখনো বহু মানুষকে বেদনায় ভরে তুলছে তা কমে যাবে বলে আশা করা যায় এবং তা প্রায় শূন্যেই অন্তর্লীন হবে। এতে সন্দেহাতীতভাবে তাদের সুখ বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত পথে চলা লোকদের কাছে পেয়ে তারা যে বর্বর আনন্দ উপভোগ করে তার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যাবে। আমি মনে করি না এটা এমন কোনও আনন্দ নয় যাকে রক্ষা করার জন্যে কোনওরূপ ভাবনার প্রয়োজন আছে।
