অনেক ক্ষেত্রেই অকারণ ভীরুতা অনাবশ্যকভাবে ঝামেলা বাড়িয়ে দেয়। জনমতকে যারা ভয় করে, জনমত তাদেরই ওপর বেশি অত্যাচার করে, যারা ভয় করে না তাদের কিছুই করে না। যারা কুকুর দেখে ভয় পায় কুকুর তাদের দেখে বেশি ঘেউ ঘেউ করে এবং তাদের কামড়াতে তৎপর হয়। কিন্তু যারা কুকুরকে উপেক্ষা করে তাদের সে কিছু করে না। মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্যও অনেকটা এইরকম। যদি তাদের দেখে আপনি ভয় পান তাহলে তারা বুঝবে আপনি তাদের ভাল শিকার, আর আপনি যদি নির্লিপ্ততা দেখান তাহলে তারা নিজেদের ক্ষমতার বিষয়ে সন্দিহান হবে এবং আপনাকে ছেড়ে দেওয়াই ভাল বলে মনে করবে। আমি অবশ্য চরম অবজ্ঞা প্রকাশের কথা চিন্তা করছি না, আপনি যদি রাশিয়ার প্রচলিত মতবাদ কেনসিংটনে ধরে রাখেন অথবা কেনসিংটনে প্রচলিত মতবাদ রাশিয়ায় বসে ধারণ করেন, তবে তার পরিণাম অবশ্যই আপনাকে মেনে নিতে হবে। আমি এরকম চরম অবস্থার কথা ভাবছি না। আমি ভাবছি প্ৰচলিত রীতিনীতি থেকে সামান্য বিচ্যুতি, যেমন যথাযথভাবে পোশাক না পরা কিংবা কোনও গীর্জার সাথে সম্পর্ক না রাখা অথবা বুদ্ধিদীপ্ত বই পড়া থেকে বিরত থাকা। এসব ত্রুটি যদি খেলার ছলে এবং উদাসীনতার কারণে ঘটে, কোনও জেদ থেকে নয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা হলে খুব রক্ষণশীল সমাজেও তা সহ্য করা হবে। ক্রমে সর্বজনস্বীকৃতভাবে পাগলের পদলাভও সম্ভব হয়ে উঠতে পারে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে যা সহ্য করা হয় না তার ক্ষেত্রে সে ধরনের কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে। এটি এক বিশেষ ধরনের ভাল প্রকৃতি এবং সৌহার্দ্যের বিষয়। রক্ষণশীল লোকেরা প্রচলিত রীতিনীতির ব্যতিক্রম দেখলে ক্রুদ্ধ হয় প্রধানত এই কারণে যে এটা তাদের কাছে নিজেদের সমালোচনা বলে মনে হয়। চলিত রীতিনীতির অনেক স্খলনকে তারা ক্ষমা করতে পারে যদি দেখে সেই লোক প্রফুল্ল মেজাজে এবং বন্ধুত্বের সাথে নির্বোধতম লোকটিকেও বুঝিয়ে দিতে পারে যে সে তাদের সমালোচনা করবে না।
কিন্তু যাদের পছন্দ এবং মতো দলের লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, তাদের ভর্ৎসনা এড়িয়ে চলার এই রীতি অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাদের সহানুভূতিহীনতা তাদের জন্যে অস্বস্তির কারণ হয় এবং বাইরে বড় ধরনের ঝামেলা সামলে নিতে কিংবা এড়াতে পারলেও তাদের মনে কলঙ্কপ্রিয়তা জাগিয়ে তোলে। যেসব লোক নিজের গোষ্ঠীর সাথে রীতিনীতির ব্যাপারে মানিয়ে চলতে পারে না তাদের মনে খোঁচা লাগে এবং অস্বস্তি হয় এবং তাদের বিস্তৃত সরস মনোভাব থাকে না। এই একই লোক যদি আর এক দলে রপ্তানী হয়, যেখানে তার মতকে কেউ অদ্ভুত মনে করবে না, তাহলে মনে হবে যেন তার সম্পূর্ণ চরিত্রই বদলে গেছে। আগে ছিল গম্ভীর, সংকুচিত এবং নিভৃতচারী; এখন প্রফুল্লময় এবং আত্মবিশ্বাসী। আগে ছিল কৌণিকতাযুক্ত, এখন সরল ও মসৃণ, আগে ছিল আত্মকেন্দ্রিক, এখন সামাজিক এবং বহির্মুখী।
সুতরাং যেখানেই সম্ভব, তরুণেরা, যারা নিজেদের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছে না, তাদের এমন পেশা বেছে নিতে চেষ্টা করা উচিত, যা তাদের সুযোগ দেবে মনের মতো পরিবেশ পেতে। এতে যদি উপার্জনের দিক থেকে অনেকটা ক্ষতি হয়, তবুও, অনেক সময় এরা জানেই না এরকম সম্ভব। কারণ বিশ্ব সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুবই সীমিত এবং তারা সহজেই মনে করতে পারে তারা বাড়িতে যেসব কুসংস্কারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে তা ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। এ বিষয়ে বয়স্ক লোকেরা তরুণদের অনেক সহায়তা দিতে পারেন, কারণ এতে মানুষ সম্পর্কে বিশদ অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।
যখন কোনও তরুণ তার পরিবেশে বেমানান হয়, তখন মনস্তাত্ত্বিক গণ্ডগোলই যে তার কারণ এটা অনুমান করা বর্তমান সময়ের মনোবিশ্লেষণ রীতি। আমার মনে হয় এটা সম্পূর্ণরূপে ভুল। ধরা যাক, কোনও তরুণের বাবা-মা বিবর্তনবাদকে মনে করে অগ্রহণযোগ্য মতবাদ। অন্য কিছু নয় শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তাই এই ধরনের ঘটনায় প্রয়োজন হয় তরুণটির সাথে তার বাবা-মার সহানুভূতির বন্ধন ছিন্ন করতে। নিজের পারিপার্শ্বিকতার সাথে মানিয়ে নিতে পারা অবশ্যই দুর্ভাগ্যের। কিন্তু তা এমন দুর্ভাগ্য নয় যে, যে কোনও মূল্যে তাকে এড়াতে হবে। পরিবেশ যেখানে বুদ্ধিহীন, পক্ষপাতমূলক সংস্কারাচ্ছন্ন অথবা নিষ্ঠুর, যেখানে তাকে মেনে নিতে না পারা যোগ্যতারই পরিচয়বাহী। প্রায় প্রত্যেক পরিবেশেই কিছু পরিমাণে হলেও এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গ্যালিলিও(৩) এবং কেপলারের(৪) ছিল “বিপদজনক মতবাদ” (জাপানে যেমন বলা হয়)। আজকের দিনেও তেমন ব্যক্তি রয়েছেন। এ রকম বরেণ্য ব্যক্তি তাঁদের মতবাদের জন্যে সামাজিক শত্রুতার মুখে পড়বেন যাকে তাদের বিরুদ্ধ মতবাদীরা প্ররোচিত করে। সামাজিক বোধ এই মাত্রায় বেড়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। যেটা কামনীয় তা হচ্ছে এই ধরনের শত্রুতা যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলা এবং অকার্যকর করার পথ খুঁজে বের করা।
বর্তমান বিশ্বে এই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি উদয় হয় তরুণ বয়সে। কোনও ব্যক্তি যদি একবার উপযুক্ত পরিবেশে উপযুক্ত পেশাটি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে সামাজিক অত্যাচার প্রায়ক্ষেত্রেই এড়িয়ে চলতে পারে। কিন্তু তার যখন বয়স কম এবং যোগ্যতাও পরীক্ষিত হয় নি, তখন তার ভাগ্য সম্পূর্ণ অজ্ঞ লোকের হাতে গিয়ে পড়তে পারে। যারা তাদের অজানা বিষয়ে মতামত দেওয়ারও যোগ্য বলে মনে করে নিজেদের এবং বিশ্ব সম্বন্ধে এত বিপুল অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাদের চেয়ে বয়সে অনেক কম এক তরুণ তাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী, এই রকম কোনও ধারণায় নিজেদের চূড়ান্ত অপমানিত মনে করে। অনেকে যারা শেষ পর্যন্ত অজ্ঞতার অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়েছে তাদের এমন কঠিন যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং দীর্ঘদিন অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তাদের মন তিক্ত হয়ে উঠেছে এবং তাদের শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। একটি সহজ মতবাদ রয়েছে যে, প্রতিভা তার পথ খুঁজে নেবেই আর এই মতবাদকে বিশ্বাস করে অনেকেই মনে করে তরুণ প্রতিভা নির্যাতিত হলেও তার খুব বেশি ক্ষতি হয় না। এই মতবাদকে স্বীকার করে নেওয়ার তেমন কোনও যুক্তি নেই। খুন জানাজানি হবেই’ অনেকটা এই মতবাদের তুল্য। মনে হয়, আমরা যতগুলি খবর জানতে পারি, তা সবই ধরা পড়ার পর। কিন্তু আমরা জানি না এমন আরো কত খুনের কথা, যাদের খবর আমাদের কানেও আসেনি। এইভাবে যাদের কথা আমরা শুনেছি, সেসব প্রতিভা প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করেই দীপ্ত হয়েছেন, কিন্তু তাতে একথা অনুমান করার কোনও কারণ নেই যে, অনেক প্রতিভা মুকুলিতই হতে পারেনি। অধিকন্তু এই কথা প্রতিভাবানদের বেলায় নয়, সাধারণ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বেলায়ও বলা চলে। কারণ তারাও সমাজের পক্ষে সমভাবে প্রয়োজনীয়। এটা কোনও ভাবে নির্যাতন থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপার নয়। অতিক্ত মন এবং অক্ষতিগ্রস্ত শক্তি নিয়েও বেরিয়ে আসার ব্যাপার। এইসব কারণেই তরুণদের চলার পথ অতি দুর্গম করে তোলা উচিত নয়।
