এই ধরনের বিচিত্র সব দৃষ্টিভঙ্গীর জন্যে কোনও নির্দিষ্ট রুচি ও বিশ্বাসযুক্ত মানুষ এক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেকে সমাজচ্যুত মনে করবে, কিন্তু অন্য গোষ্ঠীর কাছে তিনি সম্পূর্ণ সাধারণ এবং স্বাভাবিক মানুষ বলে গৃহীত হবেন। এইভাবে অনেক অসন্তুষ্টি জন্ম নেয় বিশেষভাবে তরুণদের মধ্যে, কোনও তরুণ বা তরুণীর মনে কোনওভাবে যেসব ধারণা জন্ম নেয়, তা যেন বাতাস থেকে ধরা। কিন্তু তারা দেখতে পায় যে বিশেষ সামাজিক পরিবেশে তারা বাস করছে সেখানে এইসব ধারণা (খ্রিস্টান) ধর্মমন্দির থেকে পাওয়া অভিশাপ যেন। তাই তরুণ সমাজের মনে সহজেই এটা মনে হতে পারে, তারা যে সামাজিক পরিবেশের সাথে পরিচিত তা সমগ্র বিশ্বের মধ্যে প্রতিনিধি স্থানীয়। তারা বিশ্বাস করতেই চাইবে না, যেসব মতো তারা ধৃষ্টতা বলে বিবেচিত হতে পারে মনে করে এখানে প্রকাশ করতে ভয় পায়, সেইসব অন্য জায়গায় ভিন্ন পরিবেশে এ যুগের অত্যন্ত সাধারণরূপে বিবেচিত হবে। দেখা যায়, পৃথিবী সম্বন্ধে অজ্ঞতার কারণে নানা ধরনের অনেক অনাবশ্যক দুঃখ ভোগ করে কখনো শুধুমাত্র তরুণ বয়সে, কখনো জীবনভর। এই অন্তরণ শুধু যে বেদনার উৎস, তা নয়, এতে বিপরীত পরিবেশের বিরুদ্ধে মানসিক স্বাধীনতা রক্ষার অপ্রয়োজনীয় কাজে শক্তির অনর্থক অপচয় হয় এবং একশটির মধ্যে নিরানব্বইটি ক্ষেত্রে ধারণাসমূহের যুক্তিপূর্ণ পরিণতির পক্ষে পরিচালিত করতে এক ধরনের ভয়ের সঞ্চার হয়। ব্ৰন্টি ভগ্নিরা(১) তাদের বই প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোনও সহানুভূতিশীল লোকের দেখা পাননি। এসব এমিলিকে স্পর্শ করেনি। তিনি তেজস্বিনী ছিলেন এবং তাতে দীপ্তি ছিল। কিন্তু শারলেট এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কারণ, প্রতিভা থাকলেও তার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল একজন গৃহশিক্ষিকার। এমিলি ব্রন্টির মতো ব্লেকও(২) মনের দিক থেকে সম্পূর্ণ অন্তরীণ ছিলেন। কিন্তু তিনি এমিলির মতোই নিজের ভুল দিকটাকে শুধরে নিতে পেরেছিলেন। তিনি যে নির্ভুল ছিলেন এবং তাঁর সমালোচকরাই ভুল ছিলেন সে বিষয়ে তার মনে কোনও দ্বিধা ছিল না। জনমত বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গী নিচের কটি চরণে প্রকাশিত হয়েছে :
একমাত্র লোক যে আমার পরিচিত
যে আমার বমন-উদ্রেক কোনও রকমে
বন্ধ করেছিল, তার নাম ফুঞ্জেলি–
তিনি ছিলেন একসাথে তুর্কি এবং ইহুদি।
সুতরাং প্রিয় খ্রিস্টান বন্ধুগণ
তোমরা কি করছো?
কিন্তু অন্তৰ্জীবনে এমন শক্তি ধারণ করেন তেমন লোকের সংখ্যা বেশি নয়। প্রায় প্রত্যেকের পক্ষেই সহানুভুতিশীল পরিবেশ সুখের জন্যে প্রয়োজন। অবশ্য অধিকাংশ লোকই নিজেদের চারপাশে যে পরিবেশ খুঁজে পায় তা সহানুভূতি ভরা। তারা তরুণ বয়সে প্রচলিত সব কুসংস্কার আত্মভূত করে নেয় এবং চতুর্পাশে যেসব বিশ্বাস এবং রীতিনীতির সন্ধান পায় তার সাথে সহজভাবে মানিয়ে নেয়। কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক লোকের পক্ষে, যাদের কোনও রকম বুদ্ধিবৃত্তিক বা শৈল্পিক দক্ষতা রয়েছে এই ধরনের সব কিছু নির্বিবাদে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কোনও লোক যদি ছোট মফঃস্বল শহরে জন্মান, তবে শৈশব থেকেই তার মানসিক উৎকর্ষের জন্যে যা কিছু প্রয়োজন তার প্রত্যেকটির বিরোধিতার দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত দেখবে। যদি তার গভীর কোনও বই পড়তে ইচ্ছা করে, অন্য ছেলেরা তাকে অবজ্ঞা করবে। শিক্ষকেরা বলবেন এই ধরনের বই মনকে বিক্ষিপ্ত করে। যদি তার শিল্পের প্রতি আকর্ষণ দেখে তাহলে সমবয়সীরা তাকে ভাববে পৌরুষহীন আর গুরুজনরা মনে করবে অনৈতিক। যদি সে কোন সম্মানজনক পেশা গ্রহণ করতে চায়, যা তার নিজের সম্প্রদায়ের লোকদের কাছেই অসাধারণ মনে হয় তাহলে তারা বলবে সে নিজেকে সম্প্রদায়ের ওপরে তুলতে চায়। আরও বলবে যা তার বাপ-দাদার জন্যে ভাল তার জন্যেও মঙ্গল। যদি সে তার বাবা মায়ের ধর্মীয় মতবাদ বা রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে সমালোচনার প্রবণতা দেখায়, তা হলে সে নিজের জন্যে সমূহ বিপদ ডেকে আনবে। এইসব কারণে বিশেষ যোগ্যতার অধিকারী অধিকাংশ তরুণ-তরুণীর বিকাশশীল বয়ঃসন্ধিকালটা খুব দুঃখের সময়। তাদের যেসব সঙ্গী খুব সাধারণ মানের তাদের জন্যে এই সময়টা আনন্দ এবং উপভোগের কারণ হতে পারে, কিন্তু যারা নিজেরাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে চায় এবং ঘটনাচক্রে তার যে পরিবেশে তারা জন্মেছে সেখানে বড়দের মধ্যেও পায় না। সমবয়সীদের মধ্যেও পায় না।
এইরকম তরুণ-তরুণীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে তখন তারা মনে হয় মনের সঙ্গী পেয়ে যায় এবং কয়েক বছর আনন্দে কাটায়। যদি তারা ভাগ্যবান হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করার পরেও এমন কাজ পেয়ে যেতে পারে যেখানে মনের সঙ্গী পাওয়া তখনো হয়তো সম্ভব। লন্ডন বা নিউইয়র্কের মতো মহানগরে বাস করছে এমন বুদ্ধিমান ব্যক্তি সাধারণত যাদের সাথে মনের মিল হয় তেমন একদল সঙ্গী পেতে পারে। যেখানে তাদের কোনও লুকোচুরি বা ভণ্ডামির প্রয়োজন তাদের হবে না। কিন্তু কাজের স্বার্থে তারা যদি ছোট কোনও জায়গায় থাকতে বাধ্য হয়, বিশেষভাবে যেখানে সাধারণ লোকের শ্রদ্ধা ধরে রাখার প্রয়োজন হয়, যেমন দরকার হয় চিকিৎসক বা আইনজীবীব, তাহলে তাদের জীবনভর নিজের আসল ধারণা ও বিশ্বাসকে নিত্যদিন সংস্পর্শে আসা অধিকাংশ লোকদের কাছ থেকে অবশ্যই গোপন রাখতে হবে। বিশাল দেশ হওয়ার কারণে, আমেরিকার পক্ষে এটা বিশেষ করে সত্যি। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে অভাবিত সব জায়গার নিঃসঙ্গ লোকদের দেখা মিলবে। যারা বইয়ে এমন সব জায়গার কথা পড়েছে, যেখানে যেতে পারলে তাদের একাকীত্ব ঘুচতে পারে, কিন্তু সেখানে বাস করার সুযোগ তারা পায় না। তারা যেখানে থাকে সেখানে মন খুলে কথা বলার ন্যূনতম সুযোগ পর্যন্ত নেই। যারা ব্লেক ও এমিলি ব্রন্টির মতো উচ্চমার্গের লোক নন, তাদের পক্ষে এমন পরিবেশে প্রকৃত সুখ লাভ করা অসম্ভব। এটি সম্ভব করতে হলে এমন কোনও পথ খুঁজে নিতে হবে, যার সাহায্যে জনমতের পীড়ন হয় কমানো, না হয় এড়ানো যেতে পারে এবং যার দ্বারা বুদ্ধিমান সংখ্যালগুর দল নিজেদের জানতে পারবে এবং পরস্পরের সমাজকে উপভোগ করতে পারবে।
