আমাদের তৃতীয় সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্যের কাছ থেকে বেশি আশা না করা। আগে এটাই রীতি ছিল কোনও মহিলা দীর্ঘকাল রোগে শয্যাশায়ী থাকলে তিনি আশা করতেন অন্তত তার একটি কন্যা তার সেবাশুশ্রূষায় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পিত করবে। তার জন্যে যদি মেয়েটিকে অবিবাহিতা থাকতে হয়, তবুও। অন্যের কাছ থেকে এই ধরনের পরার্থপরতা কামনা করা যুক্তি বিরোধী। কারণ পরার্থবাদীর কাছে এই প্রত্যাশা যত ক্ষতির অহংবাদীর কাছে ততটাই লাভের। অন্যের সাথে বিশেষ করে নিকটজন এবং প্রিয়জনদের সাথে ব্যবহারে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, যদিও কথাটি সব সময় মনে রাখা কঠিন, তারা জীবনকে দেখে তাদের নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে যা তাদের অহংবোধকে অন্যের জন্যে নিজের জীবনের মূল পথ পরিবর্তন করবে। এতটা আশা তাদের কাছে প্রত্যাশা করা অনুচিত। এমন একটা সময় আসে যখন স্নেহের আকর্ষণ এত তীব্র হয় যে চরম আত্মত্যাগও স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু আত্মত্যাগ যদি স্বাভবিক না হয় তা করা উচিত নয় এবং তা না করার জন্যে নিন্দিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। লোকে প্রায়ই অন্যের যে আচরণের নিন্দা করে তা যথাযথ সীমা অতিক্রম করা সর্বগ্রাসী অহংবোধের বিরুদ্ধে তা অন্যের স্বাভাবিক অহংবোধের সুস্থ প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি নয়।
আমাদের উল্লেখিত সাধারণ নীতি হচ্ছে আমরা নিজেদের বিষয়ে চিন্তা করতে যত সময় নষ্ট করি, অন্যেরা আমাদের বিষয়ে চিন্তা করতে অনেক কম সময় নষ্ট করে, এই সত্যি কথাটা বুঝতে পারা। নির্যাতন-বাতিকে যে উন্মাদ হয়ে গেছে সে কল্পনা করে সব ধরণের লোক, যাদের প্রকৃতপক্ষে অনেক কাজ এবং সমস্যা রয়েছে তারা ঐ ভাগ্যহত উন্মাদের ক্ষতি সাধনের জন্যে সকাল-দুপুর-রাত্রি নিজেদের ব্যস্ত করে রেখেছে। অনুরূপভাবে যে নির্যাতন বাতিকগ্রস্ত তুলনামূলকভাবে একটু ভাল সে সবরকম কাজকেই নিজের সম্পর্ক থেকে দেখে অথচ তা নয়। প্রকৃপক্ষে তার কোনও অস্তিত্বই নেই। অবশ্য এই ধারণা তার আত্মশ্লাঘাকে পরিতৃপ্ত করে। অনেক বছর ধরে ব্রিটিশ সরকার প্রধানত নেপোলিয়নকে পরাস্ত করার কাজে ব্যাপৃত ছিল। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি, যার কোনও গুরুত্ব নেই কল্পনা করে অন্যেরা সর্বক্ষণ তার কথা ভাবছে তখন বুঝতে হবে সে ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ধরা যাক, কোনও নৈশভোজসভায় আপনি একটি ভাষণ দিয়েছেন। সচিত্র কাগজসমূহে অন্যান্য বক্তাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু আপনার কোনও ছবি নেই। এর কারণ কীভাবে দেখা হবে? আপনার মনে হবে অন্যান্য বক্তারা আপনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ার কারণে নয়, এর কারণ নিশ্চয়ই পত্রিকার সম্পাদকেরা আপনাকে অগ্রাহ্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কেন তারা এমন নির্দেশ দেবেন? এর কারণ নিশ্চয়ই তারা আপনার মহান গুরুত্বকে ভয় পান। এইভাবে আপনার ছবির অপ্রকাশ, আপনার মনে হবে, আপনাকে অবহেলা করার বদলে সূক্ষ্মভাবে আপনাকে অভিনন্দন জানানো। কিন্তু এই ধরণের আত্মপ্রতারণা নির্দোষ আনন্দ দিতে পারে না। আপনার মনের পিছনে যে মন আছে, সে জানতে পারছে প্রকৃত ঘটনা এর বিপরীত এবং তা নিজের কাছে যথাসম্ভব গোপন রাখার জন্যে ক্রমে ক্রমে আপনাকেই নানা ধরনের উদ্ভট হেতু উদ্ভাবন করতে হবে। এসব বিশ্বাস করার চেষ্টা থেকে শেষ পর্যন্ত মনের ওপর যে চাপ পড়বে তা অত্যন্ত বেশি। তা ছাড়া এই বিশ্বাসের সাথে জড়িত হয়ে যাবে যে আপনি ব্যাপক শত্রুতার লক্ষ্যবস্তু যা আপনার মনে অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে অনুভূতি জাগিয়ে রাখবে তা হচ্ছে পৃথিবীর সাথে আপনার সদ্ভাব নেই। আর এই অনুভূতি আপনার আত্মমর্যাদাবোধকে বাঁচিয়ে রাখবে। যে তৃপ্তির ভিত্তি আত্মপ্রতারণা, তা দৃঢ় নয়। সত্য যতই অতৃপ্তিকর তোক প্রথমবারেই তার সাথে সমতা রেখে জীবনকে গঠন করার দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।
০৯. জনতের ভয়
খুব কম লোকই সুখী হতে পারে, যদি সামগ্রিকভাবে তাদের জীবনধারা ও পৃথিবী নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী, যাদের সাথে তাদের সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বিশেষভাবে যেসব প্রতিবেশীদের সাথে বাস করতে হয়, তারা অনুমোদন না করে। বর্তমান সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং তাদের নৈতিকতাবোধ ও বিশ্বাসও পরস্পর থেকে ভিন্নতর। এই অবস্থা শুরু হয়েছে যোড়শ শতকের পোপবিরোধী ধর্ম বিপ্লবের সময় থেকে সম্ভবত বলা উচিত বেঁনেসার সময় থেকে এবং ক্রমেই প্রবলতর হয়ে উঠছে। প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিকদের কথা বলা যায়, তারা যে শুধু ধর্মতত্ত্বে আলাদা তাই নয়, অনেক বৈষয়িক ব্যাপারেও তারা আলাদা। অনেকগুলি কাজ অভিজাত শ্রেণীর অনুমোদিত ছিল, যা সহ্য করত না মধ্যবিত্ত শ্রেণী (বুর্জোয়া)। তারপর আগমন ঘটল উদারপন্থী এবং স্বাধীন চিন্তার সমর্থকদের। তারা ধর্মীয় কর্তব্য পালন স্বীকার করতেন না। আমাদের নিজেদের কালে ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে লোকেরা খুব বেশি রকমভাবে ভাগ হয়ে গেছে সমাজতন্ত্রী এবং অন্যান্য দলে, যেখানে শুধু রাজনীতি নেই, রয়েছে জীবনের সকল বিভাগ। ইংরেজি ভাষাভাষি দেশসমূহে এই বিভক্তি অসংখ্য। কিছু দল চিত্রশিল্পকে নন্দিত করে। কিছু দল মনে করে ওটা শয়তানের চিন্তা, অন্তত আধুনিক হলে তো কথাই নেই। কারো কারো মতে সাম্রাজ্যে আনুগত্য একটি মহৎ গুণ, কারো মতে এটি পাপ, আবার কারো মতে এটা এক ধরনের বুদ্ধিহীনতা। সাধারণ নৈতিকতায় বিশ্বাসী মানুষ ব্যভিচার একটি ঘৃণ্যতর অপরাধ বলে মনে করে। আবার এক বিপুল সংখ্যক লোক একে প্রশংসাযোগ্য মনে না করলেও ক্ষমাযোগ্য অপরাধ বলে মনে করে। ক্যাথলিকদের বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কিন্তু অধিকাংশ অ-ক্যাথলিক একে বৈবাহিক চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয় অপনোদক বলে গ্রহণ করে।
