এই উদাহরণগুলি থেকে চারটি সাধারণ নীতির পরিচয় পাওয়া যাবে, যদি তার সত্যতা ভালভাবে উপলব্ধি করা যায় তাহলে নির্যাতন-বাতিকের নিরাময় সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা দেবে। প্রথমটি হল : আপনার উদ্দেশ্য আপনার কাছে যতটা পরার্থবাদী বলে মনে হচ্ছে সবসময় ততটা নয়, সে কথা অবশ্যই মনে রাখবেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে : নিজের যেগ্যেতা সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারনা পোষণ করবেন না। তৃতীয়টি হচ্ছ : নিজের সম্পর্কে আপনার যে পরিমাণ উৎসাহ অন্যের কাছ থেকে ততটা আশা করবেন না। এবং চতুর্থটি হচ্ছে : আপনাকে নির্যাতন করার জন্যে অধিকাংশ লোক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এমন কল্পনা করবেন না। আমি পরপর এইসব সাধারণ নীতি সম্পর্কে কিছু বলছি।
পরকল্যাণব্রতী এবং নির্বাহিকদের পক্ষে তাদের অভিপ্রায় নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা প্রয়োজন। এই ধরণের ব্যক্তিদের কল্পনায় পৃথিবী বা তার অংশবিশেষ কী রকমের হওয়া উচিত তার একটা দৃশ্য থাকে এবং তারা কখনো সঠিকভাবে, কখনো বা ভুলভাবে মনে করেন যে, সেই কল্প-দৃশ্য বাস্তবে রূপায়িত করলে সমগ্র মানবসমাজ অথবা তার কোনও অংশের পরম মঙ্গল হবে। কিন্তু তারা একথাটা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারেন না যে, যারা তাদের কাজের ফলে উপকৃত হবেন তাদের প্রত্যেকেরই, কে কেমন পৃথিবী চায়, সে সম্পর্কে তাদের নিজস্ব মতো প্রকাশের সমান অধিকার রয়েছে। নির্বাহী ব্যক্তিদের প্রত্যেকের নিশ্চিত ধারণা যে তাঁদের কল্পিত দৃশ্যই যথার্থ এবং তার সঙ্গে যার অমিল হবে সে ভুল। কিন্তু তার কল্পিতচিত্র যে নিশ্চয়তা দিচ্ছে বাস্তবে তা যথার্থ কিনা তার কোনও প্রমাণ নেই। তা ছাড়া বিশ্বাস হচ্ছে প্রায় সময় দেখা যায় শুধুমাত্র আনন্দ লাভের ছদ্মবেশ যা উঠে এসেছে যেসব পরিবর্তন তিনি ঘটাতে চান সেখান থেকে, যেখানে তিনি নিজেই তার কারণ। ক্ষমতাপ্রিয়তা ছাড়াও আরো একটি উদ্দেশ্য দেখা যায় তা হল দম্ভ, যে এসব ব্যাপারে প্রবলভাবে ক্রিয়া করে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি পার্লামেন্টের সদস্যপদ প্রার্থী মহৎ, আদর্শবাদী যখন দেখেন যে ভোটদাতারা ধরেই নিয়েছে যে তিনি নামের শেষে ‘এম. পি’ অক্ষর দুটি লেখার গৌরব অর্জন করার জন্যেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তখন তিনি তাদের বিশ্বনিন্দুকতার ভাব দেখে বিস্মিত হন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর যখন তিনি চিন্তা করার সময় পান, তখন তার মনে হয় হয়তো বিশ্বনিন্দুক ভোটদাতারাই সঠিক, আদর্শবাদ সাধারণ উদ্দেশ্যকেও একরকম অদ্ভুত ছদ্মবেশ পরিয়ে দেয়। সুতরাং আমাদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে কিছু প্রকৃতনিন্দা অপ্রীতিকর হয় না। চলিত নৈতিকতা যতটা জনকল্যাণ লোকের মনে জাগে, তারা অধিকাংশ মানুষের সাধ্যের অতীত এবং যারা নিজেদের মহৎ গুণের জন্যে গর্বিত তারা প্রায় সময়েই কল্পনা করেন যে সেই দুর্লভ আদর্শে তাঁরা পৌঁছে গেছেন। মহৎ ব্যক্তিদের বিভিন্ন কার্যধারার মধ্যেও আত্ম-স্বার্থের উদ্দেশ্য থাকে, তবে তার জন্যে দুঃখপ্রকাশের কোনও প্রয়োজন নেই, কেন না ব্যাপারটা অন্যরকম হলে মানুষ জাতি হিসাবে বেঁচে থাকতে পারত না। যে মানুষ অন্যেরা খেল কিনা শুধু তাই দেখতে সময় নষ্ট করে এবং নিজের খাওয়ার কথা ভুলে যায়, তার বিনাশ অবধারিত। অবশ্য শক্তির বিরুদ্ধে পুনরায় সংগ্রাম করার জন্যেই শুধু সে কিছু খেয়ে নিতে পারে। এই কারণে কিছু খেলে তা সম্পূর্ণ হজম হয় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ এতে পরিপাকের যে রস নিঃসরণ হওয়ার কথা তা যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষরিত হয় না, তাই কাজের কথা হচ্ছে খাওয়ার প্রয়োজনেই তার তা করা উচিত এবং ভোজনের সময় জনকল্যাণের ইচ্ছায় আপুত থাকা উচিত নয়।
এবং আহার সম্বন্ধে যা সত্যি, অন্য সব ব্যাপারেও তা সমান সত্যি। যা কিছু করতে হবে তা প্রচুর পরিমাণে করতে হলে কোনও উদ্দীপনার সাহায্য প্রয়োজন এবং স্বার্থ জড়িত না থাকলে উদ্দীপনা আসে না। এদিক থেকে দেখতে গেলে আমি স্বার্থের উদ্দেশ্যের সাথে আরো কিছু যুক্ত করতে চাই এবং তা হচ্ছে জৈব-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের স্বার্থ। যেমন শত্রুর বিরুদ্ধে স্ত্রী এবং সন্তানদের রক্ষা করার সহজ প্রবৃত্তি। এই মাত্রার পরার্থবাদ মানুষের সাধারণ প্রকৃতির অংশ কিন্তু যে মাত্রা সাধারণ নৈতিকতা দাবি করে তা খুব কম ক্ষেত্রেই খাঁটিভারে পাওয়া যায়। যেসব ব্যক্তি নিজেদের নৈতিক উৎকর্ষতা নিয়ে উচ্চ প্রশংসা পেতে চান, তারা যে মাত্রায় আত্মস্বার্থহীনতা লাভ করেছেন কিনা সন্দেহ। তা তারা অর্জন করেছেন বলে বিশ্বাস করেন। এবং এই কারণেই সতোর মর্যাদালাভের চেষ্টার সাথে এক ধরনের আত্মপ্রতারণা যুক্ত হয়, আর তা থেকেই অতি সহজেই জন্ম নেয় নির্যাতন-বাতিক।
আমার চারটি সাধারণ নীতির দ্বিতীয়টিতে বলা হয়েছে, নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়, তার নীতি সম্পর্কিত অংশে এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু নৈতিক যোগ্যতা ছাড়া অন্য যোগ্যতা সম্পর্কেও অতিরিক্ত ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। যে নাট্যকারের কোনও নাটকই সাফল্য লাভ করেনি তার শান্তভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত সেগুলি ভাল নাটক নয়। এই ধারণা সমর্থনযোগ্য নয় বলে সাথে সাথে বাতিল করে দেওয়া ঠিক নয়। যদি দেখা যায় ধারণার সাথে বাস্তবের সঙ্গতি আছে, তা হলে একজন পরিচয়দায়ক দার্শনিকের মতো তিনি তা গ্রহণ করবেন। একথা সত্যি যে যোগ্যতা স্বীকৃতি পায়নি এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে রয়েছে। কিন্তু স্বীকৃতি পেয়েছে এমন দৃষ্টান্ত তার চেয়ে অনেক বেশি। যদি কোনও প্রতিভা সমকালে মূল্য না পেয়ে থাকেন, তা হলেও যে পথে তিনি এগিয়েছেন তা থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিত নয়, স্বীকৃতি না পাওয়া সত্ত্বেও। পক্ষান্তরে তিনি যদি অহংসর্বস্ব প্রতিভাহীন ব্যক্তি হন, তিনি পথ থেকে দূরে সরে দাঁড়ালেই ভাল করবেন। এই দুইজনের মধ্যে কে কোন দলের মধ্যে পড়েন তা জানবার কোনও উপায় নেই যদি একজন তার শ্রেষ্ঠ কর্ম অস্বীকৃত হওয়ার জন্যে বেদনায় আহত হয়ে থাকেন। আপনি যদি প্রথম দলে পড়েন তাহলে আপনার অধ্যবসায়কে বলব বীরোচিত। যদি দ্বিতীয় দলের হন তাহলে বলব হাস্যকর। আপনার মৃত্যুর শতবর্ষ পরে জানা যাবে আপনি কোন্ দলভুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে একটি পরীক্ষা করা যেতে পারে, যদিও তা অব্যর্থ সে কথা বলা যায় না, যদি নিজেকে আপনি একজন প্রতিভাবান মনে করেন কিন্তু প্রকাশকালে আপনি কী জরুরী তাগিদ অনুভব করেন কোনও ধারণা বা অনুভূতি তুলে ধরার জন্যে অথবা আপনি প্রশংসা অর্জনের ইচ্ছা থেকে তাড়িত হন? প্রকৃত শিল্পী তার শিল্পকর্ম শেষ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং আশা করেন যে তাঁর কাজ প্রশংসিত হবে। কিন্তু কেউ যদি প্রশংসা নাও করেন তাহলেও তিনি তাঁর শিল্পরীতি পরিবর্তন করবেন না। কিন্তু যার কাছে অন্যের প্রশংসা লাভ করাই মুখ্য, তার নিজের মধ্যে কোনও জোর নেই নিজস্ব কোনও শিল্পরীতি গঠনের। শিল্পকর্ম প্রশংসা না পেলে এমন ধরনের শিল্পীর সেই কাজ ছেড়ে দেওয়া উচিত। আরো সাধারণভাবে বলতে গেলে বলা যায়, জীবনে যে শাখাই আপনি বেছে নিন, যদি দেখেন যে আপনার পারদর্শিতা সম্বন্ধে আপনি যতটা উচ্চ ধারণা পোষণ করেন, অন্যেরা তা করছেন না, তাহলে নিশ্চিত মনে ভাববেনও না তারাই ভুল করছেন। আপনি যদি এইভাবে ভাবতে থাকেন, তাহলে সহজেই এই বিশ্বাসের শিকার হবেন যে, আপনার যোগ্যতা যাতে স্বীকৃতি না পায় তার জন্যে একটি ষড়যন্ত্র চলছে আর এই বিশ্বাসই, নিশ্চিত থাকুন যে আপনার জীবনে সুখের অন্তরায় হয়ে উঠবে। আপনার যোগ্যতা যতটা আপনি আশা করেছিলেন ততটা নয়। একথা মেনে নিতে মুহূর্তের জন্যে আপনি ব্যথাতুর হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু এই ব্যথাও একসময় শেষ হবে, তার পরেও আবার সুখী জীবন ফিরে আসা সম্ভব।
